অনভিপ্রেত ও দুর্ভাগ্যজনক

আপডেট : ২৮ মার্চ ২০১৪, ২১:২৩
মন্তব্যটি হাসিয়া উড়াইয়া দেওয়া যাইত। বোধবুদ্ধিসম্পন্ন কোনো মানুষ ইহা লইয়া মাথাও ঘামাইত না। কিন্তু ৪৪তম স্বাধীনতা দিবসের আগের দিন, গত ২৫শে মার্চ লণ্ডনের একটি সভায় প্রথম যিনি মন্তব্যটি করিয়াছিলেন তিনি দেশের অন্যতম প্রধান দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তাহা সত্ত্বেও অনেকে বিষয়টিকে হালকাভাবে নিয়াছিলেন। ভাবিয়াছিলেন যে, ইহা হয়তো তাত্ক্ষণিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ মাত্র। কিন্তু মাত্র একদিনের ব্যবধানে দলটির মূল নেত্রীর কণ্ঠেও একই মন্তব্য শুনিয়া তাহারা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হইয়া পড়িয়াছেন। গত ২৭শে মার্চ রাজধানীর এক দলীয় সভায় দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে তিনি বলিয়াছেন যে, জিয়াউর রহমানই দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। লক্ষণীয় যে, স্বাধীনতার ৪৩ বত্সর পর এই অদভুত মন্তব্যটি যিনি করিয়াছেন তিনি শুধু দলীয় প্রধানই নহেন, দীর্ঘ সময় ধরিয়া দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করিয়াছেন। পরে দলটির পক্ষ হইতে প্রবীণ একজন নেতা ইহার যেই ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করিয়াছেন, তাহাও উপর্যুক্ত মন্তব্যেরই প্রতিধ্বনি মাত্র। দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে রাজনীতিকদের নিকট দায়িত্বশীল ও যৌক্তিক আচরণের প্রত্যাশা যখন প্রবল হইতে প্রবলতর হইতেছে, ঠিক সেই মুহূর্তে এই ধরনের একটি বক্তব্য অনভিপ্রেত শুধু নহে, দুর্ভাগ্যজনকও বটে। সীমালঙ্ঘন সর্বত্রই নিন্দিত। ইহার পরিণতি সম্পর্কে কঠোর সতর্কবার্তার বিষয়টিও সুবিদিত। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হইতেছে যে, আমাদের কতিপয় রাজনীতিক সজ্ঞানে সকল সীমাই লঙ্ঘন করিয়া যাইতেছেন। বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি কে ছিলেন এবং কীভাবে, কাহার নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হইয়াছে—তাহা কোনো কষ্ট-কল্পনার বিষয় নহে। এই বিষয়ে গাদা গাদা দলিল-দস্তাবেজ আছে, দেশি-বিদেশি গবেষণা গ্রন্থ আছে; আছে সংবিধান। সর্বোপরি, জাতির সেই গৌরবময় ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী হিসাবে এমন অনেকেই এখনও বাঁচিয়া আছেন যাহারা সেই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশও বটে। অতএব, কাহারও এইসব বিষয়ে কোনো প্রকার সংশয় থাকিলে তাহারা ইহাদের যে কোনো একটি বা একাধিক সূত্রের সহায়তা গ্রহণ করিতে পারিতেন। আর এমন একটি মীমাংসিত বিষয়ে সংশয় থাকিবেই বা কেন? জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই যে দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি; আমাদের ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে’ই তাহার সুস্পষ্ট উল্লেখ রহিয়াছে। ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল মুজিবনগরে ঘোষিত ও গৃহীত এবং ১৯৭২ সালের ২৩শে মে বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় প্রকাশিত সেই ঘোষণাপত্রটি ইতিমধ্যে পরিশিষ্ট আকারে আমাদের সংবিধানের অন্তর্গত করা হইয়াছে। সেইখানে বলা আছে, ‘সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি থাকিবেন এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রজাতন্ত্রের উপ-রাষ্ট্রপতি থাকিবেন’। ইহাও উল্লিখিত আছে যে, ‘কোন কারণে রাষ্ট্রপতি না থাকা বা রাষ্ট্রপতি তাঁহার কার্যভার গ্রহণ করিতে অসমর্থ হওয়া বা তাঁহার ক্ষমতা প্রয়োগ করিতে অসমর্থ হওয়ার ক্ষেত্রে, রাষ্ট্রপতির উপর এতদ্বারা অর্পিত সমুদয় ক্ষমতা, কর্তব্য ও দায়িত্ব উপ-রাষ্ট্রপতির থাকিবে এবং তিনি উহা প্রয়োগ ও পালন করিবেন’। বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় কার্যতঃ তাহাই হইয়াছে। উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করিয়াছেন। এই প্রবাসী সরকারের নেতৃত্বেই পরিচালিত হইয়াছে মুক্তিযুদ্ধ। আর ইহার পূর্ববর্তী ইতিহাস তো সর্বজনবিদিত। ইহাও বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দেশে প্রত্যাবর্তনের পর বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করিলেও পঁচাত্তরের নৃশংস হত্যাযজ্ঞ যখন সংঘটিত হয় তখনও তিনিই ছিলেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। ইহা অনস্বীকার্য যে, অতীতেও তাঁহাকে বিতর্কিত বা খাটো করিবার কোনো অপচেষ্টা যেমন সফল হয় নাই, তেমনি ভবিষ্যতেও হইবে না। একইভাবে যাঁহার যাহা প্রাপ্য তাহা প্রদানে কার্পণ্য করাও সমীচীন নহে। আমাদের আত্মঘাতী রাজনীতিকরা যত তাড়াতাড়ি এই বাস্তবতা উপলব্ধি করিবেন, ততই মঙ্গল।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন