ফিলিপাইনে ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০১৪, ২২:০১
ফিলিপাইনের সর্ববৃহত্ মুসলিম স্বাধীনতাকামী গেরিলা সংগঠনের সহিত ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করিয়াছে দেশটির সরকার। দেশটির মুসলিম অধ্যুষিত দক্ষিণাঞ্চলীয় মিন্দানাও দ্বীপের মোরো জনগোষ্ঠী স্বাধীনতা কিংবা স্বায়ত্তশাসনের জন্য কয়েক দশক ধরিয়া সংগ্রাম করিয়া আসিতেছিল। মালয়েশিয়ার মধ্যস্থতায় গত বৃহস্পতিবার সর্ববৃহত্ স্বাধীনতাকামী সংগঠন মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্টের (এমআইএলএফ) সহিত রাজধানী ম্যানিলায় প্রেসিডেন্ট বেনিগনো একুইনো সরকারের এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী নিজস্ব বাজেট ও পুলিশ বাহিনী লইয়া বাংসামরো স্বায়ত্তশাসিত সরকার গঠিত হইবে। একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসনও গঠন করা হইবে স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনার জন্য। কথা রহিয়াছে, এই নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হইবে ২০১৬ সন নাগাদ। মিন্দানাওর ইতিহাসের পরিক্রমা নানা মাত্রায় বর্ণিল হইয়া আছে। অশান্তির কারণ বুঝিতে সেই পরিক্রমা একটু বুঝিয়া দেখা যাইতে পারে। ছয়টি প্রশাসনিক ও ২৫টি প্রদেশে বিভক্ত মিন্দানাও, যাহা অসংখ্য দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত, ফিলিপাইনের অন্যতম পশ্চাত্পদ এলাকা। অথচ অঞ্চলটি খনিজ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদে বিপুলভাবে সমৃদ্ধ। অথচ আধিপত্যবাদী শাসন ও শোষণ মিন্দানাওবাসীকে শতকের পর শতক ধরিয়া পশ্চাত্পদ করিয়া রাখিয়াছে। প্রাপ্ত তথ্য মতে, ত্রয়োদশ শতকের দিকে আরব বণিকদের মাধ্যমে এই অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলির মধ্যে ইসলামের প্রসার ঘটে। ষোড়শ শতকে স্পেন হইতে রোমান ক্যাথলিকরা ফিলিপাইনে আসিয়া বসতি স্থাপনের পর ইহা স্প্যানিশ কলোনিতে পরিণত হয়। ঊনিশ শতকের দিকে দেশটিতে ক্যাথলিক খ্রিস্টানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হইয়া ওঠে। তবে ম্যানিলা, সিবু ও দাভাওয়ের মতো বড় শহরগুলিতে মুসলমানদের প্রভাব রহিয়াই যায়। এবং দ্বন্দ্ব শুরু হয় জাতিগত বৈষম্য হইতে। সেই বৈষম্যের অবসান ঘটাইতে ম্যানিলা সরকারের সহিত মিন্দানাওয়ের মুসলমানদের লড়াই চলাকালে গত অর্ধশতকে অসংখ্য মুসলমান ভাগ্যন্বেষণে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাইসহ বিভিন্ন দেশে বসতি স্থাপন করে। ১৮৯৮ সালে স্প্যানিশরা মিন্দানাওসহ ফিলিপাইনের দ্বীপগুলি যুক্তরাষ্ট্রের নিকট বিক্রয় করিয়া দেয় এবং মূলত ইহার পরই মিন্দানাওয়ের উপর ম্যানিলার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। মার্কিন নিয়ন্ত্রণে ফিলিপাইনের দ্বীপগুলিতে ব্যাপক হারে বসতি স্থাপনের কাজ চলিতে থাকে। ১৯৭২ সনে ফিলিপাইনে সামরিক আইন জারির পর ম্যানিলা সরকার মিন্দানাও অঞ্চলে ব্যাপক দমনাভিযান শুরু করে। ইহাতে হাজার হাজার মুসলমান প্রাণ হারান ও কয়েক লাখ গৃহহীন হইয়া পড়েন। মিন্দানাওয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭৬ সনে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলিতে ওআইসির উদ্যোগে এমএনএলএফ ও ম্যানিলা সরকারের মধ্যে একটি কাঠামোগত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়— যাহা ত্রিপোলি চুক্তি হিসাবে পরিচিত। কিন্তু ইহার কিছুদিন পর উভয়পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ ও পারস্পরিক আস্থার অভাবে চলিতে থাকে বিক্ষিপ্ত সংঘাত। অতঃপর এই চুক্তি নিয়ে মতবিরোধ দেখা দিলে ১৯৮৪ সনের দিকে মোরো ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট (এমএনএলএফ)-এর একটি অংশ আলাদা হইয়া মোরো ইসলামিক লিবারেশন ফ্রন্ট (এমআইএলএফ) গঠন করে। ১৯৯৭ সন থেকে অস্ত্রবিরতি চুক্তির পর ২০০১ সনে উভয়পক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু হইলেও শান্তি যেন অধরাই থাকিয়া যাইতেছিল। কেননা, প্রায় ১৭ বত্সর ধরিয়া এই শান্তি চুক্তি হয় হয় করিয়াও অনেকবারই পিছাইয়া গিয়াছে। গত বত্সর অক্টোবরে প্রায় নিশ্চিত হইয়া গিয়াছিল যে, কয়েক মাসও বিলম্ব হইবে না এই শান্তি চুক্তি সম্পন্ন হইতে। তাহার পরও চুক্তিটি আলোর মুখ দেখিতে অর্ধ-বত্সর পার হইয়া যায়। যুদ্ধ বা সংগ্রামে যেমন শান্তি ও মানবতার কণ্ঠ রুদ্ধ করা হয়, তেমনি বহু ক্ষেত্রে শান্তি ও মানবতা প্রতিষ্ঠিতও হয় যুদ্ধ ও সংগ্রামের মধ্য দিয়াই। আশা করা যাইতেছে, এই সকল শান্তি ও সমঝোতা চুক্তির মধ্য দিয়াই শান্তি ও স্থিতিশীলতায় আসীন হইবে প্রায় সাত হাজার দ্বীপ দ্বারা গঠিত এই দেশ।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন