মাদকের ভয়াবহতা রোধে চাই আইনের কঠোর প্রয়োগ

আপডেট : ২৯ মার্চ ২০১৪, ২২:০১
“কারাগারে মাদক ব্যবসা”। এইতো সেদিনের জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম এটি। এমন সংবাদ আমরা পত্রিকার পাতায় অহরহই দেখতে পাই। দেশের কারাগার অভ্যন্তরে মাদক মিলে এ আর নতুন কি সংবাদ? কারাগারের ভেতরেই মাদক ব্যবসা এটা কি ভাবা যায়? আমাদের ভাবনায় এটা থাক আর নাই থাক তাতো হচ্ছে আমাদের কারাগারগুলোতে। এটা নি:সন্দেহে উদ্বেগজনক খবর! কারাগার যখন মাদক বিক্রির জায়গা, তখন কারাগার কি তা আগে জানতে হবে। এজন্য কারাগারের প্রবেশ মুখে কি লেখা আছে তা জেনেনি। “রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ”। কারাগার অভ্যন্তরে একজন আসামি নিরাপদ থাকবে, অন্ধকার পথ থেকে তাকে ফিরিয়ে আনা হবে আলোর পথে। কারাগারে সবধরনের আসামিদের রাখা হয়। এখানে বিচারাধীন এবং সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা থাকেন। বিচারাধীন আসামি অর্থই সকলে অপরাধী নয়। কেউ অপরাধ সংঘটিত করলে, কারো বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করলে তারা সাজাভোগ এবং সংশোধনের জাগাই কারাগার। এখানে বিচারের আগে এবং বিচার সম্পন্ন হওয়ার পর আসামিদের রাখা হয়। এখানে থাকা সবধরনের আসামিদের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব কারাকর্তৃপক্ষের। একজন আসামিকে সংশোধন করা, তার নিরাপত্তা বিধান করা যদি কারা কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব হয় তবে কারাঅভ্যন্তরে মাদক কেন? ছোট্ট একটা কারাগার যেটা কিনা কঠিন নিরাপত্তা চাদরে ঢাকা; সর্বক্ষণ যেখানে রাষ্ট্রের বাহিনী স্বতন্ত্র পাহারা দিচ্ছে, সেখানে মাদক বিক্রি হয় কি করে? প্রশ্ন হলো কারা কর্তৃপক্ষের অজান্তেই কি মাদক বিক্রি হচ্ছে? মোটেও তা নয়। কারাগার অভ্যন্তরে প্রবেশের অভিজ্ঞতা আমার রয়েছে। আসামি হিসেবে নয়; পরিদর্শক হিসেবে। যারতার ঢোকবার অনুমতি নেই কারা অভ্যন্তরে। যারা অনুমতি পান তারা বহু কাঠখড়ি পুড়িয়ে তবেই কারাগারে যান। যারা কারাপরিদর্শক তারাও নানা তল্লাশী এবং আইন-কানুন মাড়িয়ে ঢোকেন কারাগারে। এমন কঠিন নিরাপত্তার বেষ্টনি পেরিয়ে যেখানে যেতে হয় সেখানে মাদক আসে কোত্থেকে? কারাঅভ্যন্তরে কারা মাদক আনে? কারাইবা মাদক বিক্রি করে? আর যারা মাদক কিনছেন, মাদক সেবন করছেন তারা এমন গন্ডির ভেতরে তা করেন কি করে? সকলের চোখ ফাঁকি দিয়ে তা কি করে সম্ভব? দেশ থেকে কেন মাদক নিয়ন্ত্রণ হয় না, বা হওয়ানো হয় না? যারা মাদক নিয়ন্ত্রণ করবেন কি করছেন তারা? মাদক পাচার, ব্যবসা ও ব্যবহারকারীর ক্রমপ্রসার রোধকল্পে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে নানারকম কার্যক্রম দেখা গেলেও তেমন কোনো ইতিবাচক ফল মিলছে না। মাদক শুধু একজন ব্যক্তি কিংবা একটি পরিবারের জন্যই অভিশাপ বয়ে আনে না, দেশ-জাতির জন্যও ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনছে। নানারকম প্রাণঘাতী রোগব্যাধি বিস্তারের পাশাপাশি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও খারাপ করে তুলছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতায় দেশের অভ্যন্তরে মাদকের বিকিকিনি এবং বিভিন্ন সীমান্ত পথে দেশের অভ্যন্তরে মাদকের অনুপ্রবেশ নিয়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও দীর্ঘদিনের। এবার পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে মাদক ব্যবসার অত্যন্ত নিরাপদ স্থানগুলোর একটি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার। কারারক্ষীদের সতর্ক পাহারা থাকতেও যদি কারাগারে মাদক ঢুকতে পারে তাহলে সারাদেশের অবস্থা যে কী তা সহজেই অনুমান করা যায়। মাদক ব্যবসায়ীদের প্রধান টার্গেট হচ্ছে তরুণ সমাজ। দেশের তরুণ সমাজ মাদকের ভয়াবহ প্রভাবে বিপথগামী হচ্ছে। মাদকের নীল ছোবলে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে আমাদের আগামী প্রজন্ম। যা একটি দেশের ভবিষ্যতের জন্য ভয়াবহ দুঃসংবাদ বই নয়। সত্য যে, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতার প্রকট রূপের পেছনে মাদক অন্যতম বড় একটি উপসর্গ হয়ে দেখা দিয়েছে। হত্যাকাণ্ড, ইভটিজিং, ছিনতাই, ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধের ধরন বিশ্লেষণে নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর দায়িত্বশীলরাও চমকে যাচ্ছেন। উদ্বেগের বিষয় হলো, নেশার জগতে নিত্য যোগ হচ্ছে নতুন নতুন মুখ। মাদকের কারণেই গত বছর পুলিশের এক বড় কর্মকর্তা সস্ত্রীক খুন হন মেয়ের হাতে। এরপরও মাদকের বিস্তার রোধে আইনি সাফল্য যে খুব একটা নেই তা মনে করার যৌক্তিকতা রয়েছে। আশির দশকে বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার শুরু হয় মর্মে বিভিন্ন তথ্য মেলে। এ সময় লুকিয়ে-চুরিয়ে, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে মাদক বিক্রি করা হতো। মাদক বিক্রি এখন আর অতটা গোপনে নেই বলেই প্রতীয়মান হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, রাজধানীতে ডিজে পার্টির নামে বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় মাদকের রমরমা আসর বসে। এখানে সাধারণত ধনী পরিবারের তরুণ-তরুণীদের যাতায়াত। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গামী তরুণ-তরুণীরাই মূলত মাদকের নেশায় বুঁদ। মাদক এখন আর অলিতে-গলিতে নয় এর বিস্তার ঘটেছে ভদ্র সমাজে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে। এমনকি রাষ্টের সুরক্ষিত নিরাপত্তাবলয়ে বেষ্টিত কারাগার অভ্যন্তরেও মাদকের বেচা-কেনা চলে। কারাবেষ্টনিতে মাদকের নিরাপদ বিস্তারের ঘটনাকে শর্ষের মধ্যে ভূত বলেই অভিহিত করা যায়। সুতরাং আমরা মনে করি মাদক সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের ব্যাপারেই আইন প্রয়োগে সরকারকে কঠোরতা দেখাতে হবে। কারাগারে মাদক ব্যবসার মতো লজ্জাজনক ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারারক্ষীসহ অন্যদের কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বোপরি আইনের কঠোর প্রয়োগই মাদকের ভয়াবহতা রোধে সহায়ক হতে পারে। লেখক :সাংবাদিক ই-মেইল[email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন