রাজনৈতিক কৌশল যুগে যুগে, দেশে দেশে স্বীকৃত একটি ব্যবস্থার নাম। কিন্তু সেই কৌশলের নামে অনেক দেশেই চলছে রাজনৈতিক অপকৌশল। বাংলাদেশে গত কয়েক দশক ধরেই চলছে রাজনৈতিক অপকৌশলের হোলিখেলা। যে যেভাবে পারছে, সেভাবেই অপকৌশলকে রাজনৈতিক কৌশল হিসাবে চালিয়ে দিতে চেষ্টা করছে। অপকৌশলের ধনুকটি একদিকে যেমন সরকার এবং সরকারি দল ব্যবহার করছে, তেমনি বিরোধী দলগুলোও ব্যবহার করছে। জনগণ অনেক ক্ষেত্রেই খেই হারিয়ে ফেলছে এটা নির্ধারণ করতে যে, কোনটা রাজনৈতিক কৌশল আর কোনটা রাজনৈতিক অপকৌশল। কৌশল আর অপকৌশলের ডামাডোলে বাংলাদেশের রাজনীতি আজ একটি সংকটময় ক্রান্তি পার করছে। বলা যায়, একরকম রাজনৈতিক দুঃসময় অতিক্রম করছে বাংলাদেশের রাজনীতি। আর সেই রাজনীতির দুঃসময়টি শুধু রাজনীতিকেই নয়, পুরো দেশ ও দেশের মানুষকেও একটি অস্বাভাবিক অবস্থা উপহার দিচ্ছে।
কয়েকটি বিষয় একেবারেই সুস্পষ্ট হওয়া বাঞ্ছনীয়। রাজনীতি থাকবে রাজনীতির জায়গায়। রাজনীতির বাইরেও আছে দেশের অনেক কিছু। বিচার ব্যবস্থায় কোনো রাজনীতির স্থান নেই। বিচার পরিচালনা করতে দেশের সাধারণ মানুষ এবং রাজনীতিবিদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আদালতের কার্যপ্রণালীতে এবং বিচার ব্যবস্থায় রাজনীতি প্রবেশ করবে না। বিচারকের নিয়োগ রাজনৈতিক বিবেচনায় হলেও বিচারক নিযুক্ত হওয়ার পর তার বিবেচনায় আর কোনো রাজনীতির চিহ্ন পাওয়া যাবে না। আদালতের দরজায় সকল মানুষই পাবে সম সম্ভাষণ। এই নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত আইন এবং আদালতের প্রতি পূর্ণ সম্মান আর গ্রহণযোগ্যতা প্রদর্শন করবে রাজনীতির সকল মহল। সবাইকে এটুকু গ্রহণ করতে হবে যে, সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ আনতে পারে কিন্তু তা হবে আদালতে যাওয়া পর্যন্ত; আদালতে যাওয়ার পর আর কোনো রাজনৈতিক অজুহাত দেখানোর সুযোগ কারও নেই। নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সাংবিধানিক সংস্থাগুলোও সম্পূর্ণভাবে রাজনীতিমুক্ত থাকবে। দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত এবং প্রণয়নের ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন একেবারেই রাজনীতিমুক্ত এবং স্বাধীন থাকবে। কোনো পক্ষই এই সংস্থাগুলোর কাজকে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে আনবে না। দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত কোনো রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন থেকে বিচার প্রণালীর ক্ষেত্র পর্যন্ত সর্বত্রই রাজনীতিমুক্ত একটি আবহাওয়া বিরাজ করবে। এসবই নীতির কথা, প্রত্যাশার কথা। কিন্তু বাংলাদেশে প্রত্যাশা আর বাস্তবতার মধ্যে রয়েছে বিস্তর দূরত্ব। বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস-মাটি রাজনীতির কাছে আশাহত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, তার দুই ছেলে তারেক রহমান এবং আরাফাত রহমান কোকোর বিরুদ্ধে ২৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এদের মধ্যে ৭টি মামলা বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রুজু করা হয়েছে। অবশিষ্ট মামলাগুলো গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় করা। অধিকাংশই দুদক কর্তৃক রুজু করা মামলা। এর মধ্যে দু’টি উল্লেখ্যযোগ্য মামলা জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট এবং অরফানেজ ট্রাষ্টের দুর্নীতি মামলার চার্জ গ্রহণ করে ২১ এপ্রিল বিচারের দিন ধার্য করা হয়। ১৭টি মামলা মাথায় নিয়ে জনাব তারেক রহমান দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর দেশের বাইরে আছেন। তারেক রহমান বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও আরাফাত রহমান কোকো কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নন। একটি মামলায় ইতিমধ্যে কোকোকে ছয় বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করে রায় প্রকাশিত হয়। এরই মধ্যে সিঙ্গাপুর থেকে কোকোর পাচার করা অর্থের একটি অংশ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। বর্তমান সরকারের সময়ে বিএনপির অনেক নেতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা প্রদান করা হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকসহ অনেক নেতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সময় গাড়ি ভাংচুর ও পোড়ানোর অভিযোগ জড়ানো হয়েছে। আমাদের দেশের সকলেরই বুঝতে হবে যে, দুর্নীতির অভিযোগ এবং রাজনৈতিক আন্দোলনে গাড়ি ভাংচুরের অভিযোগ এক নয়। দুদকের মামলাগুলো ব্যক্তিবিশেষের আইনী প্রক্রিয়ায় মোকাবেলা করতে হবে। দুর্নীতির মামলা মোকাবেলায় কোনো রাজনীতি করা যাবে না। কিন্তু বিএনপি বক্তব্য দিচ্ছে, দুদকের মামলা করা হয়েছে রাজনৈতিক বিবেচনায়। বিএনপি বিচারিক আদালতের কার্যপ্রণালী নিয়ে প্রশ্ন তুলে সাংবাদিক সম্মেলন করছে, মিছিল-মিটিং করছে। বিএনপি হয়তো ভুলে গিয়েছে এই মামলা বিএনপির বিরুদ্ধে নয়, ব্যক্তি বেগম খালেদা জিয়া আর তারেক জিয়ার বিরুদ্ধে। দুর্নীতি মামলায় দুদকের বিরুদ্ধে এবং আদালতের বিরুদ্ধে কোনো বক্তব্য ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আমরা রাজনৈতিক কৌশল বলতে পারব না। কেননা এটি অপকৌশল। জনগণ আজ অথৈ সাগরে পতিত। কিছুতেই বুঝতে পারছে না, দুদক সরকারের রাজনৈতিক অপকৌশলের শিকার হচ্ছে, না বিরোধী দল দুদকের দায়েরকৃত মামলার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অপকৌশল প্রয়োগ করছে। কে কখন কোন অপকৌশল প্রয়োগ করছে তা ভাবতে ভাবতেই জনগণ দিশেহারা থাকছে। রাজনীতিকে এই অপকৌশলের হাত থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব্ব রাজনীতিবিদদেরই। তা না হলে রাজনৈতিক কৌশল আর অপকৌশল নিয়ে বিতর্কের মধ্যে পড়ে জনগণ রাজনীতিরই বিপক্ষে চলে যেতে পারে একদিন।
লেখক:সাবেক সেনা কর্মকর্তা
[email protected]
