[ রা জ নী তি ]

‘ভোট অনুপাতে আসন’ পদ্ধতিতে নির্বাচন

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০১৪, ২২:০০
নির্বাচন ব্যবস্থা বস্তুত ‘প্রহসন’ হয়ে উঠেছে। গত দশম সংসদ নির্বাচন ও সামপ্রতিক উপজেলা নির্বাচন— পরপর অনুষ্ঠিত এই দুটি নির্বাচনের হালচাল দেখে জনগণ নির্বাচনের ওপর আস্থা প্রায় হারিয়েই ফেলেছে। দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যত্ ও জাতির অস্তিত্বের জন্য এই অবস্থা মারাত্মক বিপজ্জনক। নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনাটা এখন একটি অগ্রগণ্য কর্তব্য হয়ে উঠেছে। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে অবাধ-নিরপেক্ষ অর্থবহ নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে এবং সেজন্য প্রচলিত নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার সাধন করতে হবে। অবাধ, নিরপেক্ষ, অর্থবহ নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো বর্তমানে দেশে কনস্টিটুয়েন্সির ভিত্তিতে ‘অনেক প্রার্থীর মধ্যে যিনি সবচেয়ে এগিয়ে থাকবেন, তিনি জয়ী হবেন’ (First Past The Post-FPTP) এই যে ব্যবস্থা চালু রয়েছে তা বদল করতে হবে। তার জায়গায় ‘সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক’ (Proportional Representation-PR) ব্যবস্থা অর্থাত্ ‘প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে আসন সংখ্যা নির্ধারণ’ পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন। জাতীয় সংসদের মূল কাজ হলো দু’টি। এক. জাতীয় নীতি-নির্ধারণ ও আইন প্রণয়ন করা এবং দুই. রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় প্রশাসনের কাজ-কর্ম তদারক করা। স্থানীয় বিষয়ক কোনো কাজ-কর্ম সম্পর্কে জাতীয় সংসদের কোনো দায়িত্ব থাকার কথা না। (এসব কাজের সমুদয় দায়িত্ব স্বশাসিত নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের উপর যথা- ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ইত্যাদি সংস্থার উপর ন্যস্ত থাকাই বাঞ্ছনীয়)। সংখ্যানুপাতিক তথা ‘ভোট অনুপাতে আসন’ ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদের নিজস্ব এখতিয়ারভুক্ত কাজ-কর্ম সম্পর্কে প্রস্তাবনা-পরিকল্পনা-কর্মসূচি-নীতি বর্ণনা করে রাজনৈতিক দলগুলো দেশবাসীর সামনে নিজ নিজ ইশতেহার উপস্থিত করবে। এসবের মধ্যে দেশবাসী যে দলের ইশতেহারে বিশ্বাসযোগ্য রূপে তার ইচ্ছার প্রতিফলন দেখতে পাবে, সেই দলের মার্কায় ভোট দেবে। যে দল যত শতাংশ ভোট পাবে সেই দল জাতীয় সংসদে ততো শতাংশ সংখ্যক প্রতিনিধি পাঠাবে। অর্থাত্ ৩০০ আসনের সংসদে কোনো দল ৫০% ভোট পেলে ১৫০ আসন পাবে, কোনো দল ৫% ভোট পেলে ১৫টি আসন পাবে ইত্যাদি। ‘ভোট অনুপাতে আসন’ ব্যবস্থায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল তার নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণার পাশাপাশি, সংসদে আসন নেয়ার জন্য তাদের দলের প্রতিনিধিদের তালিকা অগ্রাধিকারক্রম অনুসারে নির্বাচনের আগেই দেশবাসীকে জানিয়ে দেবে। নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোট অনুসারে যে কয়টি আসন সেই দলের প্রাপ্য, তালিকার ক্রমানুসারে সেই কয়জন ব্যক্তি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত বলে গণ্য হবেন। এক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীদের পৃথক দু’টি তালিকা থাকবে। যদি কোনো দলের প্রাপ্য আসন সংখ্যা ৫০ হয় এবং বিধান থাকে যে, সংসদে পুরুষ ও নারীর সংখ্যা হবে সমান-সমান, তাহলে দুই তালিকা থেকে ২৫ জন করে অগ্রাধিকারক্রম অনুযায়ী ব্যক্তিগণ নির্বাচিত বলে গণ্য হবেন। এই ব্যবস্থায় সংসদ সদস্য হিসাবে অন্তর্ভুক্তির কাজে দলীয় প্রধানের ডিক্টেটরশিপ প্রতিষ্ঠার আশঙ্কা রয়েছে। সেই আশঙ্কা রোধ করার জন্য দলের অভ্যন্তরে গণতন্ত্রের চর্চা বিধিবদ্ধভাবে বাধ্যতামূলক করতে হবে। স্বাধীন নির্বাচন কমিশনকে তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পালন করতে হবে। ‘ভোট অনুপাতে আসন’ PR ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন কাজ, প্রশাসনিক কাজ অথবা অন্য কোনো কাজের সাথে জড়িত থাকবেন না। তারা শুধু জাতীয় নীতি-নির্ধারণ, আইন প্রণয়ন, কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের কাজ-কর্ম তদারক করা ইত্যাদিতে জড়িত থাকবেন। স্থানীয় সব উন্নয়নমূলক ও প্রশাসনিক কাজ-কর্ম সেই এলাকার নির্বাচিত স্বশাসিত স্থানীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হবে। এই ব্যবস্থার ফলে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও প্রশাসনের গণতান্ত্রিক বিকেন্দ্রীকরণ, স্থানীয় সরকারের প্রকৃত ক্ষমতায়ন এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তৃণমূলে জনগণের কার্যকর ক্ষমতায়ন গভীরতর করা সহজ হবে। বর্তমানে নির্বাচন যেভাবে ‘টাকার খেলা’ হয়ে উঠেছে, ‘ভোট অনুপাতে আসন’ ব্যবস্থা চালু হলে তা অনেক কমে যাবে। এর প্রধান কারণ হলো, জাতীয় নির্বাচন তখন আর প্রধানত ব্যক্তিকেন্দ্রিক ও এলাকাভিত্তিক হবে না। এ কারণে, এখন যেভাবে নানা সুযোগ-সুবিধার প্রত্যাশায় এমপি জিতিয়ে আনার জন্য নির্বাচনে এক ধরনের ‘পুঁজি বিনিয়োগ’ ঘটে থাকে, সেই অবস্থা খর্ব করা সহজতর হবে। বর্তমানে প্রচলিত ‘আসন ভিত্তিক FPTP’ ব্যবস্থায় সংসদে প্রাপ্ত আসনের সাথে মোট প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতের কোনো সামঞ্জস্য থাকে না। ২০০১ সালের নির্বাচনের ফলাফলের দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যায় যে, ৪০.২১% ভোট পেয়েও আওয়ামী লীগ পেয়েছিল মাত্র ৬২টি আসন অর্থাত্ ২১% আসন। আর বিএনপি-জামায়াত জোট ৪৫.১৫% ভোট পেয়ে আসন পেয়েছিল ২০৮টি অর্থাত্ ৬৯% আসন। অর্থাত্ তারা মাত্র ৪.৯৪% বেশি ভোট পেয়ে আসন পেয়েছিল আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত আসনের চেয়ে ১৪৬টি বেশি অর্থাত্ ২৩৫% বেশি আসন। জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটানোর বিচারে তা ছিল আওয়ামী লীগের প্রকৃত শক্তির সঠিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার প্রতিকূলে। ২০০৭ সালের নির্বাচনেও একই রকম অসামঞ্জস্যপূর্ণ ফলাফল ঘটেছিল। এবার তা ছিল বিএনপির প্রতিকূলে। এটা খুবই স্পষ্ট যে ‘আসন ভিত্তিক FPTP’ ব্যবস্থা প্রকৃত জনমতকে সঠিকভাবে প্রতিফলিত করে না। ‘আসন ভিত্তিক FPTP’ ব্যবস্থায় একটি নির্দিষ্ট নির্বাচনী আসনের ক্ষেত্রেও প্রকৃত জনমতের এ ধরনের অন্যায্য প্রতিফলন ঘটতে পারে। যেমন ধরা যাক যে, একটি আসনে ৫ জন প্রার্থীর মধ্যে যদি তারা যথাক্রমে ২৭%, ২৬%, ২১%, ১৭% ও ৯% করে ভোট পায় তাহলে যিনি মাত্র ২৭% ভোট পেয়েছেন, তিনিই নির্বাচিত হয়ে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের প্রতিনিধি’ হিসাবে গণ্য হবেন (যদিও সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভোট তিনি মোটেও পাননি)। এসব থেকে স্পষ্ট যে, বর্তমান ব্যবস্থার চেয়ে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা প্রকৃত জনমতকে অনেক বেশি ন্যায্যভাবে প্রতিফলিত করতে সক্ষম হবে। বর্তমান ‘আসনভিত্তিক FPTP’ ব্যবস্থার স্বাভাবিক প্রবণতাটা হলো দেশে একটি কার্যত (de-fecto) দ্বি-দলীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা আমরা এখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপিভিত্তিক প্রধান দুই রাজনৈতিক মেরুকরণের বাস্তবতার মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। ইতিহাসের কোনো এক মুহূর্তে কোনোভাবে একবার প্রধান দু’টি প্রতিদ্বন্দ্বী দলের মধ্যে একটি হয়ে উঠতে পারলে সে দু’টি দলই পরবর্তীতে নানাভাবে প্রাধান্য করার মতো অটোমেটিক কতগুলো সুবিধা পেতে থাকে। এই ব্যবস্থা দেশি-বিদেশি শোষক শ্রেণির জন্য খুবই সুবিধাজনক। কারণ তারা তুলনামূলকভাবে সহজে উভয় ‘প্রধান দলকে’ নানাভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসে এমন একটা স্থায়ী এরেঞ্জমেন্ট দাঁড় করিয়ে ফেলতে সক্ষম হয় যাতে, ‘সরকার’ ও ‘বিরোধী দল’ উভয়কেই তারা তাদের প্রভাবের মধ্যে রাখতে পারে। ফলে ‘গদি বদল’ ঘটলেও সে কারণে ‘ব্যবস্থার বদল’ ঘটার আশঙ্কা থাকে না। এভাবে দেশি-বিদেশি লুটেরা ধনিকদের গড়ে তোলা শোষণ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার স্বপক্ষে একটি ‘স্থিতাবস্থা’ স্থাপন করার জন্য শাসক শ্রেণি চেষ্টা করে থাকে। ‘ভোট অনুপাতে আসন’ভিত্তিক PR ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলে বড় দলগুলো এসব বহুবিধ অন্যায্য সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত হবে। এই ব্যবস্থা ছোট ও বিকাশমান দলগুলোকে সমান সুযোগ ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে সক্ষম করবে। তাত্ত্বিকভাবে বিবেচনা করলে, বর্তমান ‘আসনভিত্তিক FPTP’ ব্যবস্থায় একটি দল ৩০০টি আসনে প্রার্থী দিয়ে প্রত্যেকটিতে ২০% করে ভোট পেয়েও (অর্থাত্ মোট ভোটের ২০% পেয়েও) একটি সিটও না পেতে পারে। কিন্তু প্রধান দু’টি দল গড়ে ৪১% ও ৩৯% করে (দু’দল মিলে ৮০% ভোট) ভোট পেয়ে সবগুলো আসন নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতে সক্ষম হতে পারে। এরূপ অবস্থা মোটেও জনমতের প্রকৃত প্রতিফলন নিশ্চিত করে না। ‘ভোট অনুপাতে আসন’ভিত্তিক PR ব্যবস্থা বড় দলগুলোর বাইরেও উদীয়মান অথচ তুলনামূলকভাবে এখনো ছোট রয়েছে এমন সব দলকে ন্যায্য সুযোগ করে দেয়ার ফলে গণতন্ত্রের ভিত্তি আরো প্রসারিত হবে, রাজনীতিতে প্লুরালিজমের (pluralism) চর্চা বৃদ্ধি পাবে, রাজনীতি আরো নীতি-আদর্শভিত্তিক হওয়ার সুযোগ পাবে। বর্তমান ‘আসনভিত্তিক FPTP’ ব্যবস্থায় ভোটারদের জন্য প্রতিনিধি প্রত্যাহার করার সুযোগ রাখার যে দাবি প্রগতিশীল মহল বহুদিন ধরে করে আসছে তা ‘ভোট অনুপাতে আসন’ভিত্তিক PR ব্যবস্থাতেও প্রবর্তন করা সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে কেবলমাত্র একজন সাংসদকে নয়, একটি গোটা দলকে অথবা পুরো সরকারকে ও খোদ সংসদকে প্রত্যাহার করার জন্য দেশবাসীর সুযোগ রাখার বিধান অন্তর্ভুক্ত রাখা যাবে। প্রায় দুই শতাব্দী ব্রিটিশ কলোনির অংশ থাকার কারণে আমাদের দেশে ‘আসনভিত্তিক FPTP’ ব্যবস্থা মানুষের কাছে পরিচিত। অনেকের একটা ভুল ধারণা হলো এই পদ্ধতিই পশ্চিমা গণতন্ত্রের সব দেশে সাধারণভাবে অনুসৃত হয়। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, ইউরোপের প্রায় সব দেশে, দক্ষিণ আমেরিকার বেশিরভাগ দেশে, জাপানে, অস্ট্রেলিয়ায় ‘ভোট অনুপাতে আসন’ভিত্তিক PR ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়। পার্শ্ববর্তী শ্রীলঙ্কায় ও নেপালে এই ব্যবস্থার প্রচলন রয়েছে। দেশবাসীকে এই নতুন পদ্ধতির সাথে পরিচিত করে তোলা খুব কঠিন কাজ হবে না। ‘ভোট অনুপাতে আসন’ভিত্তিক PR পদ্ধতি গ্রহণ করা হলেও এর সাথে আংশিকভাবে ‘আসনভিত্তিক FPTP’ পদ্ধতিও যুক্ত করার সুযোগ রাখা যেতে পারে। অনেক দেশে ৫০% আসন ‘ভোট অনুপাতে আসন’ পদ্ধতিতে এবং অপর অর্ধেক আসন ‘আসনভিত্তিক FPTP’ পদ্ধতিতে নির্বাচিত হয়। আমরা দুটো পদ্ধতিকেই কাজে লাগাবো কিনা এবং লাগালে কিভাবে দুটোর সমন্বয় ঘটাবো, এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা যেতে পারে। তবে প্রথমে মৌলিকভাবে স্থির করে নিতে হবে যে, আমরা এখন ‘ভোট অনুপাতে আসন’ভিত্তিক PR ব্যবস্থা সাধারণভাবে প্রবর্তন করবো। সাহসের সাথে নির্বাচন ব্যবস্থার এরূপ আমূল সংস্কার করতে পারলে দেশে গণতন্ত্র দৃঢ়মূল করার পথে তাত্পর্যপূর্ণ অগ্রগতি ঘটানো যাবে। এ নিয়ে সিরিয়াস মনোনিবেশ করার কাজটিকে আর পেন্ডিং রূপে ফেলে রাখা ঠিক হবে না। তবে, অবাধ, নিরপেক্ষ, অর্থবহ নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে হবে। সেসব করণীয়গুলোর প্রতি এখনই সিরিয়াস মনোযোগ দিতে হবে। অন্যথায় সর্বনাশ! [চলবে] লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি E-mail : [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন