তুলনামূলক বিচারে দশ-পনের বত্সরের ব্যবধানে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতির দৃষ্টিগ্রাহ্য উন্নতি হইয়াছে। শিশু ও প্রসূতি মৃত্যুর হার অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন অনেক কম। পুষ্টিহীনতার সমস্যা আছে। কিন্তু তাহা দুইতিন দশক আগের মত ব্যাপক নহে। শিক্ষাক্ষেত্রে যে অগ্রগতি সূচিত হইয়াছে, তাহাও উপেক্ষা করিবার মত নহে। সামগ্রিক বিবেচনায় জীবনমানেরও উন্নতি হইয়াছে। তাহা সত্ত্বেও এই কথা নিশ্চয় করিয়া বলা যাইবে না যে, দেশের সকল অঞ্চলের সর্বশ্রেণীর মানুষ আর্থ-সামাজিক অগ্রসরতার সুফল পাইতেছেন। কোনো কোনো অঞ্চলের মানুষ শিক্ষা ও চিকিত্সা সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে এখনও পিছনে পড়িয়া আছেন অনেকটাই। ইহার জন্য ঐ সমস্ত এলাকার ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থাও বহুলাংশে দায়ী। দক্ষিণের সমুদ্র উপকূলের চরজনপদ, নদী অববাহিকার চরাঞ্চল এবং পাহাড়ি এলাকার মানুষ প্রধানত দুর্গমতার কারণে শিক্ষা ও চিকিত্সার যথাযথ সুযোগ পান না প্রায়শ। যোগাযোগের সহজ ব্যবস্থা না থাকায় এইসব এলাকায় প্রসূতি মৃত্যুর হার তুলনামূলকভাবে বেশি। দূরে শহরের হাসপাতালে রোগী কিংবা প্রসূতিকে লইয়া যাইবার পথেই অনেকের মৃত্যু ঘটিয়া থাকে। সত্য বটে, দেশের অন্যান্য গ্রামীণ জনপদের ন্যায় এইসব দুর্গম এলাকাতেও কমিউনিটি ক্লিনিক ও পরিবার কল্যাণকেন্দ্রের মত চিকিত্সালয় আছে। কিন্তু ডাক্তার নাই। প্রশিক্ষিত সেবিকা কিংবা স্বাস্থ্যসহকারীও নাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে। মোটকথা, স্থানীয় এই স্বাস্থ্য কেন্দ্রসমূহের অবস্থা দেশের অন্য যে কোনো পল্লীর সরকারি স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রের তুলনায় খারাপ বৈ ভাল নহে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় যে, দেশের প্রায় সবকয়টি উপজেলায় রহিয়াছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও হাসপাতাল। ইউনিয়ন পর্যায়ে আছে পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। ওয়ার্ড পর্যায়ে থাকিবার কথা কমিউনিটি হাসপাতাল। সকল ওয়ার্ডে এখনও পর্যন্ত কমিউনিটি হাসপাতাল চালু করা সম্ভবপর না হইলেও অধিকাংশ ওয়ার্ডেই উহা আছে। ইহাছাড়াও উপজেলা সদরের বাহিরে আছে একাধিক উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র।
কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি কী তাহা কমবেশি সকলেই জানেন। চিকিত্সকগণের যাহাদের মফস্বলে পোস্টিং দেওয়া হয় তাহাদের কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকিবার প্রবণতাদৃষ্টে সরকার নিজেই বিব্রত। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং ক্ষোভ প্রকাশ করিয়াছেন। শাস্তি দেওয়া হইবে বলিয়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়াছেন। বিষয়টি জাতীয় সংসদেও আলোচনা হইয়াছে। অনুপস্থিত চিকিত্সকদের কয়েক জনের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও গৃহীত হইয়াছে। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো ইতরবিশেষ ঘটিয়াছে,তেমনটি ভাবিবার অবকাশ আছে বলিয়া মনে হয় না। যেইসব গ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থা তুলনামূলক ভাল, সেইসব এলাকাতেও যখন চিকিত্সক থাকিতে চাহেন না, তখন প্রত্যন্ত চর কিংবা পাহাড়ি এলাকায় ডাক্তারগণ যে থাকিতে চাহিবেন না, তা সহজেই অনুমেয়। পাসকরা চিকিত্সক পাওয়া যায় না বলিয়াই দুর্গম চর ও পাহাড় জনপদের মানুষ অনেক ক্ষেত্রেই শিকার হইয়া থাকেন অপচিকিত্সার। উপরন্তু, পরিবেশগত এবং সচেতনতার অভাবহেতু চরাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকার মানুষ নানান সংক্রামক ব্যাধিতে ভুগিয়া থাকেন। এমতাবস্থায় পিছাইয়া থাকা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি অবশ্যই বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। পানি পরিবেষ্টিত চর ও প্রত্যন্ত উপকূলীয় অঞ্চলে সহজলভ্য সি এম্বুলেন্সের ব্যবস্থা থাকা উচিত। আমরা যতদূর জানি কোনো কোনো এলাকায় সি এম্বুলেন্স থাকিলেও সেইগুলির বেশিরভাগই এখন নষ্ট। দুর্গম এলাকার কমিউনিটি হাসপাতাল ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলি যাহাতে সব সময় খোলা থাকে তাহা নিশ্চিত করা দরকার। শিশু এবং প্রসূতি মায়েদের নিয়মিত সাধারণ পরীক্ষা, যেমন ওজন, ব্লাডপ্রেশার, রক্ত ও অন্যান্য সাধারণ পরীক্ষা যাহাতে পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রেই হইতে পারে তাহার ব্যবস্থা করা বাঞ্ছনীয়। সেই সাথে দরকার ধাত্রিবিদ্যায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্স কিংবা মহিলা স্বাস্থ্যকর্মী। মনে রাখিতে হইবে চিকিত্সা পাওয়া কোনো অনুগ্রহের বিষয় নহে। ইহা সব অঞ্চলের সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার।
