আলোকপাত

দেশ প্রেম ও নৈতিকতা

আপডেট : ৩১ মার্চ ২০১৪, ২১:৪৫
গত ২৬ মার্চ “লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা” গেয়েছিলাম আমরা আসলে কোটি কণ্ঠে। ছোটবেলায় রোদে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গাইতে হবে বিধায় কতবার জাতীয় সংগীতকে উপেক্ষা করেছি বিভিন্ন কৌশলে। সেই অপরাধের দায় শোধ করতে কত দিনে পারবো সেটিই ছিলো ভাবনার বিষয়। এখন শুধু জাতীয় সংগীত নয় প্রতিটি দেশাত্ববোধক গান আমাকে এতটা গভীরে নিয়ে যায় দু’চোখের অশ্রু সামাল দেয়া কঠিন হয়। দেশের প্রতি এত আবেগ ও দরদ দিয়ে অন্য কোন ভাষায় গান আছে কি না জানি না। তবে এতটুকু বুঝি আমার সোনার বাংলা তুলনাহীন, যেমন আমার মা। মাত্র নয় মাসে ত্রিশ লক্ষ লোকের আত্মত্যাগ ও একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম বাংলাদেশ ব্যতীত দ্বিতীয় কোন উদাহরণ আমার জানা নেই। দেশের প্রতি সমুদ্র গভীর ভালোবাসা ছিল বলে নিরস্ত্র জনতা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, সুসজ্জিত একটি সশস্ত্র বাহিনীকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে পেরেছিল। দেশপ্রেম, মমত্ববোধ, আবেগ, অবিচল আত্মবিশ্বাস ও ইস্পাত কঠিন জাতীয় ঐক্যের কারণেই সম্ভব হয়েছিল এ অসাধ্য সাধন। জাতীয় ঐক্যের মাধ্যমেই পেয়েছি সোনার বাংলা, আবারো সোনার বাংলা গোটা জাতিকে একই মঞ্চে দাঁড় করিয়ে ছিলো। এ কথা সত্য, স্বাধীনতার তেতাল্লিশ বছর শেষে আমাদের অনেক অর্জন আছে কিন্তু প্রত্যাশা অনুযায়ী প্রাপ্তি নেহায়েত কম। এর মূলে রয়েছে জাতীয় আদর্শিক অনৈক্য ও সত্যিকার দেশপ্রেমের অভাব। সকল স্বার্থের ঊর্ধ্বে দেশের স্বার্থকে স্থান দেই না বলেই স্বাধীনতার সুফল গুটিকয়েক সৌভাগ্যবানের ভোগবিলাসিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ । নৈতিক অধঃপতন চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে বলেই জীবন-জীবিকার প্রয়োজনে পণ্যের সাথে নিজের দেশের মর্যাদার কথাও মনে রাখিনা আমরা অনেকেই। এ বিষয়ে কয়েকটি দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করা যেতে পারে পর্যটন রাজধানী খ্যাত কক্সবাজার— যেখানে অবসর কাটানো ও বিনোদনের জন্য দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটক ভিড় করে প্রায় সারা বছর। পর্যটকদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নামি- দামি মার্কেট, হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্ট। বার্মীজ ম্যানিয়া ও এর নামে প্রতারণা কক্সবাজারের একটি অন্যতম বিষয়। এ নামে প্রতারণা চলছে কক্সবাজারসহ টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনে। স্থানীয়ভাবে উত্পাদিত এসব পণ্যের গায়ে ভিনদেশি নাম জুড়ে দিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই প্রতারণা করছি নিজের দেশের সাথে। অন্যদিকে নিজের টাকা খরচ করে অন্যসব দেশের প্রচার করছি। এমনকি মার্কেট ও দোকনগুলোর নাম দেয়া হয়েছে ভিনদেশি নামে। যাতে ক্রেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। দেশপ্রেম কতটা তলানিতে গেলে নিজের দেশের এতো সুন্দর নাম থাকতে অন্যের নামে চালানো হয়। দেশে উত্পাদিত পণ্যকে নিজের বলে চালানোর সত্ সাহস আমাদের নেই। অথচ বহির্বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর ব্রান্ডেড শপগুলোতে সগৌরবে বিক্রি হচ্ছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য। দেশের অভ্যন্তরে নিজের দেশকে ভিনদেশি পর্যটকদের কাছে উপস্থাপনের বিরাট সুযোগ থাকা সত্ত্বেও আমরা বরং তার উল্টো করছি। বিদেশি পণ্য আমদানি ও বাজারজাত করতে গিয়ে আমদানি করছি বিদেশি বিজ্ঞাপনের সাথে বিদেশি কালচার। স্বদেশের অর্থ দিয়ে প্রচার করছি ভিনদেশের, জলাঞ্জলি দিচ্ছি আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ। হায়রে দেশপ্রেম, হায়রে সোনার বাংলা ! লেখক :অধ্যক্ষ, ন্যাশনাল কলেজ, বাড্ডা, ঢাকা [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন