বাংলাদেশে স্থলবন্দর রহিয়াছে ২১টি। তন্মধ্যে বর্তমানে আটটি কার্যকর। অবশিষ্ট ১৩টি স্থলবন্দর নানা কারণে স্থবির ও অকার্যকর। অকার্যকর স্থলবন্দরগুলি প্রতিবেশী দেশের সহিত বাণিজ্য উন্নয়নের অন্যতম প্রতিবন্ধক। নিকটতম ও বৃহত্ প্রতিবেশী ভারতের সহিত বাংলাদেশের আমদানি-রফতানির আশি ভাগ পরিচালিত হয় স্থলবন্দরের মাধ্যমে। কিন্তু আমরা এই বন্দরগুলির উন্নয়নের দিকে তেমন নজর দিতেছি বলিয়া মনে হয় না। যেই বন্দরগুলি আরও গতিশীল ও কার্যকর করিবার পক্ষেও আছে নানা সমস্যা। যেমন- যশোরের বেনাপোল, লালমনিরহাটের বুড়িমারী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জের সোনামসজিদ, দিনাজপুরের হিলি, পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা, কক্সবাজারের টেকনাফ এবং সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরের অবকাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আজও দুর্বল। বন্দরগুলির অনিয়ম ও দুর্নীতি দূর করিয়া সক্ষমতা বৃদ্ধির পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। যতদূর জানা যায়, বেনাপোল ছাড়া অন্যান্য স্থলবন্দরে আধুনিক পার্কিং ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত গুদামঘর, ওজনযন্ত্র, ব্যাংকিং সুবিধা ইত্যাদি নাই। ফলে সীমান্ত অতিক্রমকালে বন্দরের আনুষ্ঠানিকতায় বিলম্ব হয়। ইহাতে দেখা যায় পণ্যবাহী ট্রাকের দীর্ঘ সারি। বাড়িয়া যায় পরিবহন ব্যয় যাহা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাহাছাড়া বন্দরগুলির কাজ-কর্ম গতিশীল করিতে পণ্যখালাস পদ্ধতিতে আধুনিকতার ছাপ থাকা প্রয়োজন। কাগজপত্র কম্পিউটারাইজড করা দরকার। দরকার উন্নত মানের সড়ক।
অকার্যকর ১৩টি স্থলবন্দরের মধ্যে সিলেটের তামাবিল, ময়মনসিংহের গোবড়াকুড়া এবং কুড়িগ্রামের সোনাহাটের ব্যাপক সম্ভাবনা রহিয়াছে। কিন্তু বন্দর তিনটি এখনও চূড়ান্ত অনুমোদনই পায় নাই। এই তিনটি স্থলবন্দর ভারতের মেঘালয়, শিলং, দাউকি, আসাম ও ধুবরীর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করিবে। অন্যদিকে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা, কুমিল্লার বিবিরবাজার, ফেনীর বিলোনিয়া, দিনাজপুরের বিরল ও ময়মনসিংহের কড়ইতলী স্থলন্দরের অনুমোদন দেওয়া হইলেও কার্যক্রম গতিশীল নহে। দর্শনা ও বিরল রেলকেন্দ্রিক বন্দর, কিন্তু ইহার আশেপাশে পরিবহনযোগ্য কোন রাস্তা নাই। অন্যান্য অবকাঠামোও নির্মাণ করা হয় নাই। আবার চুয়াডাঙ্গার দৌলতগঞ্জ, নীলফামারীর চিলাহাটি, রাঙামাটির টেগামুখ ও খাগড়াছড়ির রামগড় স্থলবন্দর ঘোষণার মধ্যেই কেবল সীমাবদ্ধ রহিয়াছে। তবে এই কথাও সত্য যে, শুধু বাংলাদেশেই নহে, এমনকি কোন কোন ক্ষেত্রে ভারতের স্থলবন্দরগুলির অবস্থাও নাজুক ও শোচনীয়। তাই এই সমস্যার প্রতি উভয় দেশেরই সমান মনোযোগ দিতে হইবে। নিশ্চিত করিতে হইবে স্থলবন্দরগুলির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার ন্যায় বাংলাদেশ ও ভারত যৌথ পরিবহন কোম্পানি গঠনের মাধ্যমে দ্রুত পণ্য আনা-নেওয়া করিতে পারে। বিশেষত ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলিতে বাংলাদেশি পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হইতেছে। তাই মেঘালয়, ত্রিপুরা রাজ্যঘেঁষা তামাবিল, সুতারকান্দি, আখাউড়া ও বিবিরবাজারের অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ানো একান্ত প্রয়োজন।
আমরা জানি, আমাদের বন্দরগুলির উন্নয়নের পথে প্রধান অন্তরায় অর্থ সংকট। সমপ্রতি স্থলবন্দরের অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থমন্ত্রণালয়ের নিকট ১০০ কোটি টাকা চাওয়া হইয়াছিল। কিন্তু পাওয়া গিয়াছে মাত্র ৫ কোটি টাকা। আমরা যতই বলি না কেন, এই স্বল্প বাজেট দিয়া স্থলবন্দরগুলিকে কার্যকর ও গতিশীল করা বাস্তবিক পক্ষেই কঠিন। দ্বিতীয়ত বন্দরগুলির উন্নয়নে আমলতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা আবশ্যক। একটি স্থলবন্দর নির্মাণের সঙ্গে অর্থ, আইন, নৌ, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় জড়িত। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সমূহের মধ্যে সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। মনে রাখা দরকার, বন্দরকে বলা হয় অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রতীক। স্থল, সমুদ্র কিংবা বিমানবন্দর কোনটির গুরুত্ব আসলে কম নহে। তবে আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে স্থলবন্দরগুলির গুরুত্ব দিন দিন বাড়িতেছে। এই স্থলবন্দরগুলির উন্নয়নের দিকে এখন আমাদের মনোনিবেশ করিতে হইবে। এইক্ষেত্রে সার্বিক উন্নয়নের জন্য অর্থ বরাদ্দ বাড়াইবার কোন বিকল্প নাই।
