নরেন্দ্র মোদী :গণতন্ত্রের ছায়া আরও দীর্ঘ

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৩৪
এই এপ্রিল-মে মাস জুড়িয়া ভারতে অনুষ্ঠিত হইবে লোকসভা নির্বাচন। বিশ্বের ‘সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষের গণতন্ত্রের’ দেশে প্রধানমন্ত্রী কে হইবেন, তাহা লইয়া রহিয়াছে কৌতূহল বিস্তর। সেই কৌতূহল আরও তীব্র হইয়াছে, যখন বিবিধ জরিপে আগামী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে উঠিয়া আসিয়াছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-এর প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদীর নাম। তিনি গুজরাটের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এবং অতীতে, মাত্র এক যুগ পূর্বে এমন একটি অভিযোগের কলঙ্কে ডুবিয়াছিলেন—যাহার সহিত ‘গণতন্ত্র’ এককাতারে দাঁড়াইতে পারে না। গুজরাটের সামপ্রদায়িক দাঙ্গায় তাহার প্রত্যক্ষ ইন্ধনে সন্দিহান হইয়াই যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন তাহাকে ভিসা দেয় নাই। কেননা, মার্কিন ইমিগ্রেশন ও ন্যাশনালটি অ্যাক্ট অনুযায়ী—সেই সব বিদেশি রাজনীতিবিদদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয় না, যাহাদের বিরুদ্ধে মানুষের অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা খর্ব করিবার অভিযোগ থাকে। কিন্তু নানা কারণে ভারতের জনমতস্রোত অনেকটাই মোদী-অভিমুখে অধিক বেগবান বলিয়া প্রচারযন্ত্রে দেখা যাইতেছে। তাত্পর্যপূর্ণভাবে বিজেপি হইতে প্রধানমন্ত্রী পদে মনোনয়ন প্রাপ্তির পর মোদীকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে রিপাবলিকান পার্টির সদস্য কেটি ম্যাকমরিস রজার্স অভিনন্দনও জানাইয়াছিলেন। গত বত্সর সেপ্টেম্বরে দ্য ইকোনমিক টাইম্স-এর এক সমীক্ষায় দেখা গিয়াছে, ভারতের যেই সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মোট সম্পদমূল্য ৫০০ কোটি টাকার অধিক, সেই সব প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীদের ৭৪ শতাংশই মোদীকে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দেখিতে চান। মোদীর পক্ষে জোর প্রচারণা রহিয়াছে যে, মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে গুজরাটকে তিনি অর্থনৈতিক উত্কর্ষের মডেলে পরিণত করিয়াছেন। একই ভাবে তিনি গুজরাটকে অচিরেই সর্বভারতীয় উন্নয়নের রোল মডেল হিসাবে দাঁড় করাইতে পারিবেন বলিয়া তাহার প্রচারযন্ত্র উচ্চনিনাদে বাজিয়া চলিতেছে। কিন্তু এই উন্নয়ন মডেলের বিপরীত কথাও শোনা যাইতেছে সমানতালে। গুজরাট-উন্নয়নচিত্র যে শুভঙ্করের ফাঁকি, তাহার ভিতরটা যে ফাঁপা—তাহারও চুলচেরা বিশ্লেষণ দেখা যাইতেছে ভারতীয় পত্রপত্রিকায়। নরেন্দ্র মোদীর প্রধান প্রতিপক্ষ ভারতীয় কংগ্রেস দলটি স্বাভাবিকভাবেই জোর দিয়া চলিয়াছে ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তির উপর। দশ বত্সর ধরিয়া ক্ষমতাসীন কংগ্রেস উন্নয়নের প্রশ্নে নিজেরা শরবিদ্ধ হইবার পাশাপাশি বিজেপিকে বিদ্ধ করিতেছে তাহাদের সামপ্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গিকে। কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী গত সোমবার নির্বাচনী প্রচারণায় তাই দ্ব্যর্থহীনভাবে বলিয়াছেন—এই নির্বাচন শুধু দেশের উন্নয়নের লড়াই নয়, বরং ধর্মনিরপেক্ষতা রক্ষার লড়াই। প্রকৃতপক্ষে, ‘হিন্দু’ এবং ‘মুসলমান’ হিসাবে দ্বিজাতি-তত্ত্বের উপর ভিত্তি করিয়া যে ভারত স্বাধীন হইয়াছে, তাহার রাজনীতিতে ঐতিহাসিকভাবে ধর্ম এবং সামপ্রদায়িকতার প্রভাব অগুরুত্বপূর্ণ হয় নাই। যেই কারণে বিজেপি একাধিকবার ক্ষমতাসীন হইতে পারিয়াছে। পাশাপাশি ইহাও সত্য যে, গণতন্ত্রের দীর্ঘ ছায়াতলে সকল মানুষ সমান। সেই গণতন্ত্রকে, স্বাধীনতার পর হইতে প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে, বিশ্বের অন্যতম ‘সৌন্দর্য’ হিসাবে নিজের দিকে মুগ্ধদৃষ্টি সৃষ্টি করিয়াছে ভারত। ভারতের সংবিধানে যে ধর্মনিরপেক্ষতার উল্লেখ রহিয়াছে, তাহারই মহাশক্তি একঅর্থে ভারতবর্ষকে একতাবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল রাখিয়াছে। গত ৬৭ বত্সর ধরিয়া সেই সৌন্দর্য ও শক্তি ভারতের জমিনের গভীর হইতে অতি গভীরে প্রোথিত হইয়াছে। ইহাই সর্বাধিক তাত্পর্যের। ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও তাহারাই অতীত কৃতকর্মের জন্য নরেন্দ্র মোদীকে প্রতিনিয়ত জর্জরিত করিতেছে সহস্র প্রশ্নবাণে। গণতন্ত্রে জবাবদিহিতার যে বহুস্তর ‘ফিল্টার’ রহিয়াছে, তাহা মোদীকে বিব্রত করিয়া চলিতেছে নিরন্তর। ‘ধর্ম ও সামপ্রদায়িকতা’ মোদীর তাস হইলেও ন্যায়নিষ্ঠতা ও কল্যাণকর দৃষ্টিভঙ্গির প্রশ্নে তাহাই তাহার গলার কাঁটা হইয়া উঠিতেছে। তাই, নরেন্দ্র মোদী আগামীতে ক্ষমতায় আসীন হইলেও তাহার ছায়া গণতন্ত্রের সৌন্দর্যকে নিষ্প্রভ করিতে পারিবেন না। বরং গণতন্ত্রের দীর্ঘ ছায়ায় ও মিথষ্ক্রিয়ায় মোদী-চরিত্রের ‘রসায়ন’ই পরিবর্তিত হইয়া যাইতে পারে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন