উন্নয়নশীল ও উন্নত অনেক দেশ দেরিতে হলেও অনুধাবন করছে যে, পরিবেশের জন্য তাদের সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ নেয়া দরকার। এর অংশ হিসাবে কোনো কোনো দেশে ইতিমধ্যে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর প্লাস্টিক ব্যাগ নিষিদ্ধ করেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ২০১৬ থেকে সারা ইউরোপে প্লাস্টিক ব্যাগ নিষিদ্ধ করতে যাচ্ছে। পরিবেশবান্ধব এ জাতীয় অনুপ্রেরণা থেকে অনেক দেশ এখন সবুজ পণ্যকেই টেকসই ও লাভজনক মনে করছে। এক্ষেত্রে উন্নত দেশে ভোক্তা পর্যায়ে সবাই বিশেষ করে তরুণ সমাজ এখন ন্যাচারাল প্রোডাক্ট বা গ্রীন প্রোডাক্ট কেনার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে। আর এ জাতীয় পণ্য হিসাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাটের নামই বার বার উচ্চারিত হচ্ছে। অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে, অদূর ভবিষ্যতে পাটই হতে পারে পরিবেশ-বান্ধব পণ্যের আলোকবর্তিকা। যা থেকে বাংলাদেশ গার্মেন্টস-এর বাইরে পরিবেশ-বান্ধব পণ্য হিসাবে আন্তর্জাতিক বাজারের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টির অপূর্ব সুযোগ গ্রহণ করতে পারে।
পাটের উপকারিতার কথা বলে শেষ করা যাবে না। পাট শুধু বাংলাদেশের অগণিত কৃষকের জীবিকার অবলম্বন নয়, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বিবেচনায় এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত। তবে এই আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ আনা সম্ভব বহুমুখী পাটপণ্য (জুট ডাইভার্সিফাইড প্রোডাক্ট বা জেডিপি) থেকে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে এ বছর জুট সেক্টরে বিশ্ব বাজারের নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও বহুমুখী পান পণ্যের রপ্তানি গত বছরগুলোর মত এ বছরেও বেড়ে চলেছে। বিশ্ববাজারে শুধু চটের ব্যাগ নয়, অন্যান্য খাতে যেমন হোম টেক্সটাইল, গিফট এন্ড হাউজওয়্যার প্রডাক্ট, ফ্যাশন এক্সেসরিজ এন্ড লাইফস্টাইল প্রোডাক্ট উত্পাদনে ন্যাচারাল ম্যাটেরিয়ালস্ হিসাবে পাটের ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলেছে। এক্ষেত্রে ভারত গত বিশ বছর ধরে এ খাতকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে একটি সহায়ক পরিবেশ ও রপ্তানি নীতিমালার আলোকে এ খাতকে অনেকদূর এগিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। গত বছর শুধু বহুমুখী পাট পণ্য খাত থেকে ভারত আয় করেছে প্রায় দশ হাজার কোটি রুপি। এক্ষেত্রে সরকার একটি সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী অবস্থান করে নিতে পারবে। তবে এর জন্য দরকার উন্নত টেক্সটাইল প্রযুক্তির আওতায় বিশেষায়িত কয়েকটি জুট মিল স্থাপনের মাধ্যমে নানা রকম উন্নতমানের ফেব্রিকসহ আন্তর্জাতিক মানের প্রডাক্ট ডেভেলপ করে তার বাজার নিশ্চিত করা। এখানে কিছু পরিসংখ্যান উল্লেখ করা যেতে পারে। বিশ্ববাজারে জুট ফেব্রিক্সের চাহিদার ৫৫ শতাংশ পূরণ করছে ভারত। ভারতের প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, মিসর ও ইরান। ওভেন ফেব্রিকে সবচেয়ে বড় রপ্তানিকারক হচ্ছে চীন। থাইল্যান্ডের বাজারে ৪২ শতাংশ ওভেন ফেব্রিক যাচ্ছে চীন থেকে। কার্পেটেরও বৃহত্তম রপ্তানিকারক চীন যার বাজার মূলত জাপান, জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র ও ইতালিতে কেন্দ্রীভূত। বাংলাদেশের জন্য এসব পণ্যের বাজার যথেষ্ট সম্ভাবনাময়। পণ্য ও ডিজাইনের উন্নয়ন ঘটিয়ে বাংলাদেশ এসব বাজারে শক্ত জায়গা করে নিতে পারে। পাটের শপিং ব্যাগের ব্যাপক টেকসই সম্ভাবনা রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল জুট স্টাডি গ্রুপের (আইজেএসজি) তথ্য অনুসারে বিশ্ববাজারে শপিং ব্যাগের বার্ষিক চাহিদা ৫০০ বিলিয়ন পিস। ২০১০ সালের তথ্য অনুযায়ী শুধু যুক্তরাজ্যের গ্রোসারি মার্কেট (মুদির ব্যবসা) ১৫০ বিলিয়ন ইউরো, যেখানে গ্রোসারি পণ্যের সাথে শপিং ব্যাগ বিক্রয় বৃদ্ধি করা সম্ভব। খাদ্য ও গ্রোসারি বাজারের উন্নয়নে সম্পৃক্ত আইজিডি নামে একটি গবেষণা সংস্থার অনুমান ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের গ্রোসারি বাজার এক ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
বাজার নিয়ে এক গবেষণা (২০০৬) রিপোর্টের তথ্যমতে, শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে গৃহসজ্জা ও সাজ সরঞ্জাম (Home decor and furnishing) এর বাজার ২৭০ বিলিয়ন ডলারের। এর মধ্যে রয়েছে কিচেন টেক্সটাইল, হাউজওয়্যারস, ফার্নিচার, হোম টেক্সটাইলস, অ্যাপারেল্স, আউটডোর লিভিং, ঘরের দেয়াল সজ্জা এবং আলোকসজ্জা অন্যতম। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক সংকটে অন্যান্য পণ্যের চাহিদা কমলেও যুক্তরাষ্ট্রে গৃহসজ্জা সামগ্রীর বাজার বরাবরের মতো তেজী ছিল। ফোর্বস ম্যাগাজিন ২০১২ সালে এ বিষয়ে একটি নিবন্ধ ছেপেছে।
ঘরকে নিত্য নতুনভাবে সাজানোর বিষয়টি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি এবং বেশিরভাগ মানুষ তা উপভোগ করে। বহুমুখী পাটপণ্য উপখাত গৃহসজ্জা সামগ্রীর বাজারে দিন দিন চাহিদা ও জনপ্রিয়তা বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে খুব ভাল করতে পারে এমন আইটেমের মধ্যে রয়েছে টেবিলওয়্যার, পর্দা, সোফার কাভার, কুশন কাভার ও কিচেনওয়্যার, স্টোরেজ প্রোডাক্ট, হাউজওয়্যার প্রোডাক্টসহ ক্রিসমাস ডেকোরেশন আইটেমে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর গৃহসজ্জার বিক্রয় বাড়ছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের নিজস্ব বাজারেও এ জাতীয় পণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। ভারতের আসবাবপত্র ও সাজসজ্জার বাজার ২০১৫ সাল নাগাদ ১ লাখ কোটি রুপী ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। ফ্যাশন অনুষঙ্গ ও লাইফস্টাইল পণ্যের বাজারও ঊর্ধ্বমুখী। ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে খুচরা বাজারে নারীদের এক্সেসরিজ বিক্রি হয়েছে ২৯ বিলিয়ন ডলারের, যার মধ্যে ফ্যাশনেবল ব্যাগই বিক্রি হয়েছে সাড়ে ৮ বিলিয়ন ডলারের। তৈরি পোশাক পণ্যের বাজারে ধীরগতির প্রবণতার কারণে ডিজাইনাররা লাইফস্টাইল ও ফ্যাশন এক্সেসরিজের দিকে ঝুঁকছেন। বিভিন্ন ধরনের শপিং ও লাইফস্টাইল ব্যাগ, প্রমোশনাল আইটেম ও প্যাকেজিং ব্যাগের চাহিদা বাড়ছে। এক্ষেত্রে জুট ফেব্রিক থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রোডাক্ট ডেভেলপ করে এই বাজারে জুটের একটি শক্তিশালী বাজার উন্নয়ন করা সম্ভব।
সরকারের রপ্তানি নীতিতে বহুমুখী পাট-পণ্য উপখাতকে বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে। যাতে এ খাতে আমাদের প্রতিযোগী দেশ ভারতের সাথে আমাদের উদ্যোক্তাদের একটি প্রতিযোগী অবস্থান থেকে আমরা সক্ষমতা অর্জনে এগিয়ে যেতে পারি। এ খাতকে শুধু কুটির শিল্পের আওতায় চিন্তা না করে, এই শিল্প কিভাবে মধ্যম ও বৃহত্ শিল্প হিসাবে বিকশিত হতে পারে, সেই ক্ষেত্রে বিশেষায়িত খাত হিসাবে সরকার থেকে বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে। এক্ষেত্রে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়া একদল উদ্যোক্তা তৈরিসহ আন্তর্জাতিক বাজারের ডিমান্ড অনুযায়ী ‘প্রোডাক্ট ডেভেলপমেন্ট’-এর উপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। সেইসাথে মানব সম্পদ উন্নয়ন ও দক্ষ জনবল উন্নয়নে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজার সমপ্রসারণে সরকারকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। সর্বোপরি বহুমুখী পাট-পণ্য উত্পাদনের ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা একই ছাতার নীচে উন্নত মানের কাঁচামালসহ উন্নতমানের ডাইং ও লেমিনেশন সুবিধাসহ স্পেশালাইজ্ড জুট মিল স্থাপন, যেখানে ছোট ছোট উদ্যোক্তারা সহজেই তাদের কাঁচামাল প্রতিযোগী মূল্যে পেতে পারে। বর্তমান ৫০ বছরের পুরনো মেশিনে পরিচালিত এই শিল্পের মিলগুলো উন্নয়নে আধুনিক মেশিন পুন:স্থাপনের মাধ্যমে এই শিল্পের সার্বিক উন্নয়নে সরকারকে একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে আসা দরকার। জুট কমিশনের প্রাথমিক রিপোর্টে এ খাতকে সবধরনের সহায়তা দিয়ে ‘কৃষিভিত্তিক শিল্প’ হিসাবে ঘোষণা দেয়ার সুপারিশ ছিল। এই সুপারিশ যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়ন করতে হবে। আরও উল্লেখ থাকে যে, পাট শিল্পের সুরক্ষায় স্থানীয় বাজার সমপ্রসারণ অতীব গুরুত্বপূর্ণ, এক্ষেত্রে সরকার ২০১০ সালে ‘জুট প্যাকেজিং এ্যাক্ট’ প্রণয়ন করে এবং ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসে যা গেজেট আকারে এই আইন আলোর মুখ দেখে। যার কার্যকর বাস্তবায়ন অতি জরুরি।
লেখক : সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ জুট ডাইভার্সিফাইড প্রোডাক্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স এন্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন
