দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধির অশনি সঙ্কেত দেখা দিয়াছে। এই বিপদাপন্ন অবস্থা রাতারাতি সৃষ্টি হয় নাই। যথেচ্ছাচারভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে এই সঙ্কট এক্ষণে তাহার গভীরেও আসন পাতিয়াছে। প্রাকৃতিক ও মনুষ্যসৃষ্ট কারণে এইসকল অঞ্চলে পানির লবণাক্ততা এতোটাই বাড়িয়া গিয়াছে যে, সেইখানে অর্ধেকের বেশি রোগব্যাধির প্রভাবক হিসাবে দায়ী করা হইতেছে পানির এই লবণাক্ততাকে।
জীবন ধারণের জন্য বিশুদ্ধ পানি ‘জীবন’ নামেরই সমার্থক। জীবনরক্ষার এই উপাদান যদি বিশুদ্ধতা হারায়, তবে তাহাই জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হিসাবে মৃত্যুর কারণ হইয়া উঠে। পানির লবণাক্ততা উত্তরোত্তর বৃদ্ধির ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জনপদ এক্ষণে সেই মরণের কারণ হইয়া উঠিয়াছে। লবণ হইল ঔষধের মতো, মাত্রা কম হইলেও বিপদ, বেশি হইলেও বিপদ। মাত্রা বেশির কারণে উচ্চ রক্তচাপ, রক্তস্বল্পতা, লিভারের নানা অসুখ, ডায়রিয়াসহ বিবিধ রোগের মারণ জনপদে পরিণত হইয়াছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। এই অঞ্চলে অগভীর নলকূপসহ অসংখ্য মিঠা পানির জলাশয় বহুলাংশেই লবণাক্ত হইয়া পড়িয়াছে। ফলে যেইখানে প্রতিদিন মাত্র ৫ গ্রাম লবণ আমাদের শরীরের জন্য স্বাভাবিক, সেইখানে এই অঞ্চলের মানুষ প্রায় ১৬ গ্রাম লবণ গ্রহণ করিয়া থাকে পানীয় জলের ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার কারণে। আশঙ্কার কথা হইল, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এই চিত্র অধিক প্রকট হইলেও দেশের বিস্তীর্ণ উপকূলীয় অঞ্চলের বেশিরভাগ জনপদ এই সমস্যায় আক্রান্ত। এই ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততার বড় একটি কারণ জলবায়ুর পরিবর্তন। উপকূলীয় অঞ্চলে অস্বাভাবিক জোয়ার ও তুলনামূলক অধিকহারে সংঘটিত ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ভূগর্ভস্থ পানি লবণাক্ত হইয়া উঠিতেছে। আশঙ্কা করা হয় যে, বিশ্বের কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বর্তমানে যেই হারে বাড়িতেছে, তাহা অব্যাহত থাকিলে আগামি ২০৯০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা চার ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়িয়া যাইতে পারে। ইহার ফলে আমাদের উপকূলের ৪০ শতাংশ ফসলি জমি শুধু বিলীন হইবে না, বিদ্যমান মাটি ও পানির লবণাক্ততা এমন পর্যায়ে উপনীত হইবে যে, ক্ষতিগ্রস্ত হইবে এই অঞ্চলের কৃষিকাজ, লবণসহিষ্ণু জাতের বীজসমূহও লবণের ওই তীব্র মাত্রা সইতে পারিবে না। বিপন্ন হইবে কয়েক কোটি মানুষের জনস্বাস্থ্য। বিপুল জনগোষ্ঠীর এই সমস্যা হইতে মুক্তি পাইতে হইলে সরকারি, বেসরসারি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সমন্বিত প্রচেষ্টা এক্ষণে জরুরি। গভীর নলকূপ বসাইয়া মিঠা পানির সংস্থান মিটাইবার যে উদ্যোগ সমপ্রতি অধিক দৃষ্টিগোচর হইতেছে, তাহার পরিণতিও ভালো নহে। কেননা, লবণাক্ততা এখন সেই গভীরেও আসীন হইয়াছে। সুতরাং এখনই সময় সচেতনতা বৃদ্ধির। সাধারণ সচেতনতার মাধ্যমে সহজ ও সাশ্রয়ী উপায়ে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা ঘরে ঘরে গড়িয়া তোলা যাইতে পারে। বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলায় আমরা এর আদর্শ উপদাহরণ দেখিয়াছি। সেইখানে মাটির নিচে নিরেট পাথর থাকায় গভীর-অগভীর— কোনো নলকূপই বসানো সম্ভব হয় না। বৃষ্টির পানি বড় একটি ভরসা সেইখানে। দুইটি টিনের চালের মধ্যিখানে পাইপ দিয়া বৃষ্টির পানি বড় আধারে জমা করা যায়। তারপর সাধারণ ফিল্টালের তিনটি স্তর পার করিয়া বিশুদ্ধ পানি সংরক্ষণ করা যায় আড়াই হইতে তিন হাজার লিটার পর্যন্ত। লবণসহিষ্ণু উন্নত প্রজাতির ধান এক্ষণে যে সমস্ত রহিয়াছে, তাহাদের লইয়া আরও অধিক গবেষণা দরকার, যাহাতে সহিষ্ণুতার মাত্রা বৃদ্ধি করা সম্ভব হয়।
সমস্যা তখনই বৃহত্ সঙ্কট হইয়া দেখা দিতে পারে, যখন তাহা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে বিলম্ব হয়। সুতরাং পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধির এই অশনি সঙ্কেতকে আমলে লইয়া দূরদৃষ্টিসম্পন্ন পরিকল্পনা গ্রহণের আশু প্রয়োজন। তাহার ব্যত্যয়ে এতদঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের জীবন বিপন্ন হইয়া পড়িবে।
