নগর পুড়িলে দেবালয় রক্ষা পাইবে কীভাবে

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০১৪, ২১:১৬
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) স্নাতক শেষবর্ষের ছাত্র সায়াদ ইবনে মমতাজকে কক্ষে ডাকিয়া আনিয়া পিটাইয়া হত্যা করা হইয়াছে। জানা যায়, এই ঘৃণ্য ও নৃশংস কাজটি যাহারা করিয়াছে তাহারা হতভাগ্য তরুণটির সহপাঠীই শুধু ছিল না, ছিল একই ছাত্র সংগঠনের দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধাও। হত্যার কারণ যাহাই হউক না কেন, বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন কোনো মানুষ আরেকজন মানুষকে এতো নির্দয়ভাবে হত্যা করিতে পারে—তাহা ভাবা যায় না। কিন্তু আমাদের চারিপাশে প্রতিনিয়ত যেন তাহারই মহোত্সব চলিতেছে। অতি তুচ্ছ কারণেও খুন হইতেছে মানুষ। এমনকী সন্তানের হাতে পিতামাতা কিংবা পিতামাতার হাতে সন্তান খুন হওয়ার মতো লোমহর্ষক ঘটনাও ঘটিতেছে। সর্বাপেক্ষা উদ্বেগের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি। সেইখানে খুন-নির্যাতনের মতো নৃশংসতা যেন নৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হইয়াছে। জবাই করা, হাত-পায়ের রগ কাটিয়া দেওয়া এবং মারধর করিয়া বহুতল ভবনের ছাদ হইতে ফেলিয়া দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটিতেছে হরহামেশাই। ইহার তালিকা এতো দীর্ঘ যে, এই পরিসরে তাহা লিখিয়া শেষ করা যাইবে না। প্রসঙ্গত সদ্য সন্তানহারা সায়াদের শোকবিহ্বল পিতা মমতাজ উদ্দিন আহমেদের মর্মবেদনা তুলিয়া ধরা যাইতে পারে। তীব্র ক্ষোভের সহিত তিনি বলিয়াছেন যে, তাঁহার সন্তানের লাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিতে দেওয়া হইবে না। কারণ এই ধরনের হত্যাকাণ্ড তিনি অনেক দেখিয়াছেন। কিন্তু কোনো হত্যাকাণ্ডেরই বিচার হয় না। তাই তিনি কোনো মামলাও করিবেন না। সন্তানহারা পিতার এই অভিযোগ কোনোভাবেই অস্বীকার করা বা এড়াইয়া যাওয়া সম্ভব নহে। ধারাবাহিক এই নৃশংসতার অন্যতম প্রধান কারণ নিঃসন্দেহে বিচার বা প্রতিকারহীনতা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দায়ী ব্যক্তিরা কোনো না কোনোভাবে আইনের দীর্ঘ হাত এড়াইয়া যায় বা যাইতে সক্ষম হয়। অবশ্য একেবারে যে বিচার হয় না বা হইতেছে না তাহাও বলা যাইবে না। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, কয়েকমাস আগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মুখে নিরপরাধ যে-কিশোরটিকে নির্দয়ভাবে পিটাইয়া হত্যা করা হইয়াছিল তাহার বিচার হইয়াছে। সর্বোচ্চ সাজাও হইয়াছে অনেকের। তবে ইহা ব্যতিক্রম মাত্র। কোমলমতি কিশোর-তরুণদের মধ্যে হিংস্রতার প্রবণতা যে বৃদ্ধি পাইতেছে তাহা লইয়া দ্বিমত প্রকাশের অবকাশ নাই। প্রশ্ন হইল, বায়ান্নের ভাষা আন্দোলন হইতে মহান মুক্তিযুদ্ধ অবধি প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে যাহারা অত্যন্ত গৌরবময় ভূমিকা পালন করিয়াছে, এমনকী হাসিমুখে উত্সর্গ করিয়াছে জীবন—মাত্র কয়েক দশকের ব্যবধানে সেই ছাত্র সমাজ এতোটা বদলাইয়া গেল কীভাবে? ইহার উত্তরে অনেকেই হয়তো বলিবেন যে, এই ধরনের নৃশংসতা সব সময়েই ছিল। অশুভ প্রভাব-প্ররোচনার কারণে তরুণদের একটি অংশ আগেও বিপথগামী হইয়াছে। এখনও হইতেছে। ইহাতে নূতন করিয়া উদ্বিগ্ন হইবার কিছু নাই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৃশংসতা আগেও হইয়াছে—এই কথা সত্য। তবে এখনকার মতো এতো ব্যাপকভাবে অবশ্যই নহে। এখন জাতীয় স্বার্থ তথা বৃহত্তর জনগণের স্বার্থকে ছাপাইয়া উঠিয়াছে সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থ। ফলে নীতি, আদর্শ ও মনুষ্যত্ববোধের বিষয়টি সমূলে উত্পাটিত হইয়া গিয়াছে। সেই শূন্যস্থান দখল করিয়া লইয়াছে ব্যক্তিগত লোভ, লালসা ও স্বার্থপরতা। সকলেই এখন নিজেকে লইয়া ব্যস্ত। রাতারাতি বিত্ত ও তরক্কি অর্জন করিবার প্রবণতা এতোটাই আগ্রাসী হইয়া উঠিয়াছে যে, সেইখানে বন্ধু, সহপাঠী বা সহযোদ্ধা বলিয়া কিছু নাই। আছে কেবল প্রতিদ্বন্দ্বী। আর প্রতিদ্বন্দ্বী মাত্রই হননযোগ্য। এই যে আত্মঘাতী মানসিকতা ইহার জন্য কিশোর-তরুণরা দায়ী নহে। দায়ী হইল আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র। পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে তাহারা প্রতিনিয়ত যাহা দেখিতেছে, নিজেদের জীবনেও তাহাই প্রয়োগ করিতেছে মাত্র। অতএব, পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে ন্যায়নীতি তথা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা না গেলে কিশোর-তরুণদের নিকট ভিন্ন কিছু প্রত্যাশা করিয়া লাভ নাই। নগর পুড়িলে দেবালয় রক্ষা পাইবে কীভাবে?

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন