নাকের বদলে নরুন পাওয়া

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০১৪, ২১:১৬
মোট পাঁচ ধাপে দেশের ৪৫৫টি উপজেলায় নির্বাচন শেষ হয়েছে। মেয়াদ শেষ না হওয়া, মামলাসহ বিভিন্ন কারণে ২৯টি উপজেলায় নির্বাচন বাকি আছে। এই উপজেলাগুলোতে মে মাসে বা তার পরে নির্বাচন হবে। যে উপজেলাগুলোতে নির্বাচন হয়েছে তারমধ্যে চার-পাঁচটির ফল ঘোষণা বাকি আছে। ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী শেষ পর্যন্ত উপজেলা চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগ এগিয়ে আছে। ইত্তেফাক ও সমকাল-এর হিসাব অনুযায়ী ৪৫৫টি উপজেলার মধ্যে ২৩২টিতে (৬ জন বিদ্রোহীসহ) জয় পেয়েছে আওয়ামী লীগ। বিএনপি জিতেছে ১৬২টিতে (৮ জন বিদ্রোহী প্রার্থীসহ)। জামায়াত পেয়েছে ৩৫টি উপজেলা চেয়ারম্যান পদ। জামায়াত-বিএনপি মিলেও আওয়ামী লীগের থেকে পিছিয়ে আছে। আওয়ামী লীগ বেশি আসনে বিজয়ী হলেও সব বিবেচনায় এবারের উপজেলা নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য আনন্দের খবর হয়ে উঠতে পারেনি। ২০০৯ সালের তুলনায় এবার নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান পদ কমেছে। ২০০৯-এ ছিল ৩৩১। অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে তাদের বিজয় ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগ করা হলেও ২০০৯ সালের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বেশি উপজেলায় তারা জয় পেয়েছে। ২০০৯ সালে বিএনপি পেয়েছিল মাত্র ৭৯টি উপজেলা চেয়ারম্যান পদ। আবার ২০০৯ সালের উপজেলা নির্বাচন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ প্রায় ছিল না বললেই চলে। অথচ এবার অভিযোগের অন্ত নেই। এবারের নির্বাচনে কেন্দ্র দখল, জাল ভোট প্রদান, ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, সহিংসতাসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এইসব অনিয়মের জন্য নির্বাচন কমিশন, সরকার এবং প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কার দায় বেশি সেটা নিয়ে বিতর্ক করা যেতে পারে, তবে এবারের উপজেলা নির্বাচনকে যে ভালো নির্বাচনের দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না, তাতে সন্দেহ নেই। শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে নির্বাচন কমিশন বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম হয়নি। নির্বাচন কমিশন যে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারেনি সেটা নির্বাচন কমিশনার শাহ নেওয়াজের বক্তব্য থেকেও স্পষ্ট হয়েছে। তিনি সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, ‘উপজেলা নির্বাচনে কিছু অনিয়ম হয়েছে। তা অস্বীকারের উপায় নেই। যাদের দিয়ে নির্বাচনী কাজ করিয়েছে তারা ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করায় এমন অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে।’ মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর দোষ চাপিয়ে নির্বাচন কমিশন দায় এড়াতে পারেন না। নির্বাচন কমিশন যে গোড়া থেকেই উপজেলা নির্বাচনকে হালকাভাবে নিয়েছে, নানা ঘটনা থেকেই দেশের মানুষের কাছে তা স্পষ্ট হয়েছে। তারপরও প্রথম এবং দ্বিতীয় দফার নির্বাচন নিয়ে খুব বেশি অভিযোগ ছিল না। অভিযোগ ছিল কেবল বিএনপি-জামায়াতের। প্রথম দফার নির্বাচনের আগে থেকেই বিএনপি-জামায়াত অভিযোগ করে আসছিল যে, প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে সরকার সমর্থিত প্রার্থীদের জয়ী করে আনার চেষ্টা চলছে। নির্বাচন কমিশন সরকারের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করছে। অথচ দেখা যায়, প্রথম ও দ্বিতীয় দফা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের তুলনায় বেশি বিজয়ী হয় বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা। তৃতীয় দফা থেকেই পরিস্থিতি বদলে যায়। একদিকে নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ বাড়তে থাকে, অন্যদিকে বাড়তে থাকে আওয়ামী লীগের আসন সংখ্যা। তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা কমেনি—এটা প্রমাণ করতে গিয়ে যেভাবে নির্বাচন করা হয়েছে সেটা আওয়ামী লীগের সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাকে করেছে প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও যোগাযোগ মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘অতীতের যেকোনো স্থানীয় সরকার নির্বাচনের চেয়ে এবারের উপজেলা নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু হয়েছে। কালো টাকা ও পেশী শক্তির ব্যবহারের পাশাপাশি ক্ষমতার অপব্যবহার নেই বললেই চলে।’ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের সঙ্গে যোগাযোগমন্ত্রীর বক্তব্যের মিল নেই। সব উপজেলায় একভাবে অনিয়মের নির্বাচন না হলেও বেশ কিছু উপজেলায়ই যে ভোট নিয়ে এক ধরনের ছিনিমিনি খেলা হয়েছে সেটা গণমাধ্যমের খবর থেকেই নিশ্চিত হওয়া যায়। তাছাড়া নির্বাচন কমিশনার শাহ নেওয়াজও অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তাহলে প্রশ্ন হলো, সরকারের এবং নির্বাচন কমিশনের অত্যন্ত ভালো নির্বাচনের অতীত রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও এবার এমন একটি হেলাফেলার নির্বাচন কেন করা হলো? এতে আওয়ামী লীগ কিংবা সরকারের কী লাভ হলো? এটা ঠিক যে, দলীয় রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই বিএনপি-জামায়াত উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। তারা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেয়নি। বলেছিল, আওয়ামী লীগ সরকার এবং বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচনে তারা অংশ নেবে না। কারণ এদের অধীনে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। সর্বাত্মক চেষ্টা করেও ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় বিএনপি-জামায়াত জোট রাজনৈতিকভাবে এক ধরনের সংকটের মুখে পড়ে। এই সংকট থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসবে সেটা নিয়ে এই জোটের মধ্যে, বিশেষ করে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে যখন আলোচনা চলছিল, তখনই তারা পথ পেয়ে যায়, তড়িঘড়ি করে উপজেলা নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করায়। সরকার হয়তো ভেবেছিল, যে যুক্তিতে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত আসেনি সেই একই যুক্তিতে উপজেলা নির্বাচনেও তারা আসবে না। সরকার এক্ষেত্রে হিসাবে ভুল করেছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে যে ভুল বিএনপি করেছিল, উপজেলায় তারা সেটা করেনি। উপজেলা নির্বাচনে তারা দুটি উদ্দেশ্য নিয়েই অংশ নিয়েছে। এক. যদি এই নির্বাচনে তারা বেশি আসন পায় তাহলে এটা বলতে পারবে যে, সারা দেশে সরকারের কোনো জনসমর্থন নেই। কাজেই নতুন করে আগাম নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে। দুই. নির্বাচনে যদি অনিয়ম-কারচুপি হয় তাহলেও বিএনপিরই লাভ। তারা তাদের পুরানা যুক্তি—আওয়ামী লীগের এবং বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়—সামনে এনে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আবার সামনে আনতে পারবে। নির্বাচন কমিশন, সরকার এবং আওয়ামী লীগ সম্মিলিতভাবে বিএনপির ইচ্ছাপূরণে সহায়তা করেছে বলে যদি কেউ মন্তব্য করেন, তাহলে তাকে দোষ দেয়া যাবে না। বিএনপি চেয়েছে নির্বাচন কমিশন এবং সরকারকে বিতর্কিত করতে। সরকারের আগের মেয়াদে তারা এটা পারেনি, এবার পেরেছে। ভোট কেন্দ্র দখল এবং ব্যালট পেপার কেড়ে নিয়ে গণহারে সিল মারার যেসব খবর গণমাধ্যমে প্রচার হয়েছে তা কোনোভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রমাণ বহন করে না। কেউ হয়তো বলতে পারেন যে, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়েছে বেশির ভাগ উপজেলায়। বড় জোর ১০-১৫ শতাংশ উপজেলায় নানা অনিয়ম হয়েছে। তাছাড়া এসব অনিয়ম বিএনপি-জামায়াতও করেছে। তাদের যেখানে শক্তি বেশি সেখানে তারাও বলপ্রয়োগ করেছে, জোর করে ভোটের বাক্স ভরেছে। পিরোজপুরে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলেও ভোটকেন্দ্র দখল করেই বিজয় অর্জন করেছে বলে বলা হচ্ছে। একটি বহুল প্রচারিত দৈনিকের প্রথম পাতায় জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে একজন প্রিজাইডিং অফিসার ব্যালটে সিল মারছেন—এমন ছবিও ছাপা হয়েছে। জামায়াত-বিএনপি অনিয়ম করেছে বলেই আওয়ামী লীগ বা সরকারও অনিয়ম করবে এবং নির্বাচন কমিশন তা দেখেও না দেখার ভান করবে—এটা কোনো যুক্তির কথা হতে পারে না। নির্বাচনী অনিয়ম থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আমাদের দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম করতে হয়েছে। এখন আমরা যদি আবার সে জায়গায় ফিরে যাই তাহলে এরচেয়ে আফসোসের আর কিছু থাকতে পারে না। মানুষ পরিবর্তন চায় ভালোর দিকে। আর আমরা ভালোর থেকে খারাপের দিকে ফিরছি। এটা দুঃখজনক এবং অগ্রহণযোগ্য। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এরপর কী? নির্বাচনী অনিয়মের ইস্যুতে দেশে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলা বিএনপির পক্ষে সম্ভব হবে কি? আগাম নির্বাচনের দাবি কি জোরালো হয়ে উঠবে? সরকার কি পাঁচ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারবে? এসব উত্তর পাওয়ার জন্য আরো অপেক্ষা করতে হবে। এখন যেটা দেখা যাচ্ছে সেটা হলো, আন্দোলনের পরিবেশ কোথাও নেই। যেসব উপজেলায় ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে সেসব উপজেলাতেও পরাজিত প্রার্থীরা ভোটারদের নিয়ে তেমন কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেননি। এমন কি ভোটের পরেও সেসব জায়গায় নির্বাচনী অনিয়মের বিপক্ষে বড় ধরনের আন্দোলন গড়ে তোলা যাবে—এমন গণঅসন্তোষের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মানুষের মধ্যে এক ধরনের নিষ্পৃহতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মানুষ সুযোগ পেলে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে চায়, কিন্তু সে সুযোগ থেকে তাকে বঞ্চিত করা হলে ক্ষোভে-অসন্তোষে ফেটে পড়ার অবস্থা তার নেই। নানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে যারা নির্বাচন করেন তারা নির্বাচিত হয়ে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় যত্নবান না হওয়াতেও মানুষের মধ্যে নির্বাচন সম্পর্কে অনাগ্রহ তৈরি হয়। ভোটের অধিকার কেড়ে নিলেও আর উচ্চবাচ্য করেন না। এই যে মানুষ সব কিছু মেনে নিচ্ছে, সব কিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিচ্ছে এটা সুস্থ ধারার রাজনীতি বিকাশের জন্য সহায়ক কি-না সে প্রশ্ন উঠতেই পারে। উপজেলা নির্বাচন শেষ হয়েছে। শেষ দফার নির্বাচনে সহিংসতা দৃশ্যত কম হয়েছে। এটা সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের জন্য কোনো আনন্দ ও স্বস্তির খবর নয়। বেশি আসন নিজেদের কব্জায় রাখতে গিয়ে আওয়ামী লীগ এবং সরকার তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে পারে না এ কারণে যে, এখন সরকার যে কেবল বিএনপির কাছ থেকে সমালোচিত হচ্ছে তা নয়, রাজনৈতিক ও আদর্শিকভাবে যারা এই সরকারের পক্ষে তারাও খুশি মনে এমন নির্বাচন মেনে নিতে পারছেন না। এতদিন সরকার পক্ষের একটি বড় যুক্তি ছিল এটাই যে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব। সেটা সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্যও হয়েছিল। কিন্তু চতুর্থ উপজেলা নির্বাচন মানুষের বিশ্বাসে ফাটল ধরিয়েছে। উপজেলা নির্বাচনে কয়েকটি চেয়ারম্যান পদ বেশি পাওয়ার জন্য বাড়াবাড়ি করতে গিয়ে দল ও সরকারের ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হলো—তা পোষানো হবে কী দিয়ে? ব্যাপারটা কি সেই নাকের বদলে নরুন পাওয়ার মতো হয়ে গেল না? উপজেলা নির্বাচন শেষে এখন কিছু দিন চলতে থাকবে এ নিয়ে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, পারস্পরিক দোষারোপ। কিন্তু শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সুষ্ঠুভাবে পছন্দের প্রার্থীকে নির্বিঘ্নে ভোট দেয়ার সুযোগ কি মানুষ আবার ফিরে পাবে না? পেলে কীভাবে? অভিজ্ঞতা থেকে এটা বলা যায় যে, নির্বাচন কমিশন, সরকার এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল—এই তিন পক্ষের আন্তরিক সদিচ্ছা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। কাজেই এই তিন পক্ষ মিলেই একটি ভালো নির্বাচনের উপায় খুঁজে বের করতে হবে। লেখক :সাংবাদিক ও কলামিস্ট [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন