শিক্ষা আলোর সমতুল্য, সূর্য যেমন পৃথিবীকে আলোকিত করে, উপযুক্ত শিক্ষাও তেমনি মানুষের মনোজগতের অন্ধকার বিদূরিত করে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখে আমরণ। সূর্যের যেমন কোন বিকল্প নেই, সুশিক্ষা ছাড়া অজ্ঞানতা ও কুসংস্কার দূর করার দ্বিতীয় কোন পথ নেই। ভয়ংকর অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত কোন ব্যক্তি সামনে এসে দাঁড়ালে ত্রাসে হূদয় প্রকম্পিত হয়, তার হুংকারে সব লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়, কিন্তু সুশিক্ষায় আলোকিত কোন ব্যক্তির সামনে আপনাতেই বিমুগ্ধ শ্রদ্ধায় মাতা নত হয়ে যায়,তাঁর মুখ-নিঃসৃত বাণী মনে আনে গভীর প্রশান্তি।
ভুবন-বিজয়ী বীর নেপোলিয়ন বোনাপার্ট এই অমোঘ সত্যিটা মনে মনে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন বলেই মৃত্যুর আগে বলে গেছেন—“আমাকে তোমরা শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাদের শিক্ষিত জাতি দেব।” শিক্ষা সবার জন্যই অপরিহার্য।
সরকার বরাবরই প্রাথমিক শিক্ষাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে এসেছে। স্বাধীনতার পূর্বে, প্রাথমিক শিক্ষকেরা চরম অবহেলায় দিন কাটাতো, মাসিক ২০/৩০ টাকা ছিল তাদের বেতন। আজ আমরা গর্বিত আবারও বঙ্গবন্ধুর জন্য, কারণ স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই তিনি সর্বপ্রথম যে পূণ্য কাজটি ও সুকর্মটি করেছিলেন, তা হল প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ। ফলে প্রাথমিক শিক্ষকদের জীবনধারাই পাল্টে গিয়েছিল। বর্তমান সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের ২য় শ্রেণীর পদমর্যাদায় উন্নীত করে দিলেন। যদিও বেসরকারি মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষকেরা এখনও ভাল অবস্থায় নেই,অথচ দেশের এক বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে তারাই পাঠ দান করে চলেছেন। আর তারাই তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার থেকে আজও বঞ্চিতই রয়ে গেছেন। সরকারি বেতন তাদের মাসের ১৫/২০ তারিখের আগে পাস হয় না, এমনকি পদোন্নতিতেও রয়েছে অনৈতিক বৈষম্য। ফলে অনেক হতভাগ্য শিক্ষক, অনুপাতের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে পদোন্নতি না পেয়েই অবসরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার অবসরের টাকা পেতেও পোহাচ্ছেন নানা ভোগান্তি।
অপরদিকে শিক্ষাঙ্গনেও রয়েছে নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি, সেজন্য প্রশাসনের দিকেই প্রশ্ন ছুঁড়তে হয়। কারণ শিক্ষক নিয়োগে তাদের ভূমিকাই মুখ্য। আর যেহেতু শিক্ষাঙ্গন আজ চরমভাবে রাজনীতির কুপ্রভাবে জর্জরিত, তাই প্রায়শই দেখা যায় অযোগ্য ও বিতর্কিত প্রার্থীরাই নিয়োগ পেয়ে যান, যারা শিক্ষাদানে যেমন অসমর্থ, তেমনি সচেষ্টও নন। ফলে শিক্ষাজগত্ অশুভ ছায়ার প্রভাব-বলয়ে ছেয়ে যাচ্ছে ক্রমশঃ। যার প্রভাবে শ্রেণীকক্ষে নিয়মিত পাঠদান হয় না, শিক্ষার্থীদের কোন নৈতিক শিক্ষা ও নিয়ম শৃংখলা শেখানো হয় না। চাহিদা তাদের একটাই, আর তা হল পাস করা অথবা পাস দেখানো। উপর মহলের নিম্নচাপ থাকে এই মর্মে যে, “অধিক ফেল হলে বিল বন্ধ”, নিম্নমহল তাই আতংগ্রস্ত হয়ে পথ খুঁজতে থাকে কানাগলিতে, যেখানে আলো নেই শুধুই অন্ধকার!
কি করে আলোকিত হবে, শিক্ষা-জমিই তো ভালভাবে কর্ষণ করাই হয়নি। তারপর প্রচণ্ড দাবদাহে জমি ফেটে চৌচির হয়ে গেছে, পানিও দেয়া হয়নি সময়মত, এমনকি বীজগুলোও হূষ্টপুষ্ট ছিল না। উপরন্তু ফাটলের অভ্যন্তরে ক্ষতিকর জীবাণুগুলো স্থায়ী আবাসন গড়ে তুলেছে যে! ফলে নড়বড়ে ভিতের উপর গড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরা কখনও জাতির জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেয় না, আসে কলংক হয়ে, আসে আতংক হয়ে। আর এই মূর্তিমান আতংক যেখানেই যায়, সেখানেই জন্ম দেয় অঘটনের।
শিক্ষাজগতের এই কলংকিত অপছায়া অপসৃত করতে না পারলে সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন এই দেশ মহা-বিপর্যয়ের মুখে পতিত হবে, হবে নিন্দিত, হবে ঘৃণিত পৃথিবীর মানচিত্রে। পরীক্ষার পূর্বরাত্রে যদি ইন্টারনেটে উত্তরসহ প্রশ্নপত্র ডানা মেলে উড়তে থাকে, আর পরীক্ষার হল যদি শিক্ষার্থীদের অভয়ারণ্য হয়ে ওঠে, তাহলে সে শিক্ষা শুভ ফলদায়ক হয় কি? হতে পারে কি?
শিক্ষা কার্যক্রম একটা মজবুত সুতোয় গাঁথা মালার মত, যার প্রতিটি ফুল হতে হবে সতেজ ও সুন্দর, কোন বাসি পচা ফুলের স্থান সেখানে হতে পারে না। তবেই না জাতি সেই সুশোভিত মালা কণ্ঠে ধারণ করে গর্বিত হয়ে উঠবে, আর সতেজ ফুল তখনই পাওয়া যাবে যখন প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চতর স্তর, প্রতিটি ক্ষেত্রে কালিমামুক্ত শিক্ষাকার্যক্রম চলমান থাকবে। পরীক্ষা যেখানে মূল্যায়নের গর্বে ভরে উঠবে,প্রহসনে নয়। এজন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন উপযুক্ত যন্ত্রীর হাতের নিপুণ যন্ত্রে শিক্ষাজমিকে কর্ষণ করা, যেখানে শিক্ষার্থীরা আপন আপন মেধার শক্তিতে আলোকিত হয়ে উঠবে। আর সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে জাতি গঠনে রাখবে বলিষ্ঠ ভূমিকা।
লেখক :প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা, বাউফল কলেজ, পটুয়াখালী।
[email protected]
