কর্মস্থলে অনুপস্থিতির অসত্ মানসিকতা

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৪৭
চাকুরীর প্রধান শর্ত হইল, তাহা সরকারি কিংবা বেসরকারি হউক, কর্মস্থলে উপস্থিত থাকিয়া যথাযথ দায়িত্বপালন পূর্বক শ্রমের মূল্য হিসাবে বেতনভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করা। অর্থাত্ এইখানে মূল্য বিনিময় ঘটে কর্ম ও অর্থের। শর্তখানি আরও স্পষ্ট করিয়া বলা যায়—‘কর্ম’ ও তাহার বিনিময়স্বরূপ ‘পারিশ্রমিক’। কোনো চাকুরীজীবী যদি কর্মস্থলে দিনের পর দিন নিয়মানুযায়ী ছুটি না লইয়া অনুপস্থিত থাকেন, তবে তিনি তাহার পেশার মৌলিক শর্তখানিই সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করেন। পরিতাপের কথা হইল, কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকিবার ন্যূনতম ‘সুযোগ’ পাওয়া গেলে তাহা গ্রহণ করিতে দ্বিধা করেন না একশ্রেণীর চাকুরীজীবী। শিক্ষা ও চিকিত্সার মতো মৌলিক সেবাখাতে যাহারা কাজ করেন, এবং যাহাদের অনুপস্থিতির কারণে সৃষ্ট শূন্যতায় ক্ষতি হয় শত শত ছাত্রছাত্রী কিংবা রোগীর, সেই সকল পেশার এহেন চাকুরীজীবীকে নৈতিকতার প্রশ্নেও বিদ্ধ করা যায়। নিয়মবহির্ভূতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকিয়াও বেতন-ভাতাদি গ্রহণ করিতে তাহাদের বিবেক বা নীতি-নৈতিকতায় কি একটুও আঁচড় পড়ে না? অথচ তাহারাই কিনা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পদ-পদবী অনেক ক্ষেত্রেই উপভোগ করেন, ব্যবহার করেন ব্যক্তিগত পসারেও। বিদ্যালয়, হাসপাতাল ও প্রশাসনে কর্মসংস্কৃতির সুষ্ঠুধারা অব্যাহত রাখিতে সকল সরকারই সাধ্যমতো চেষ্টা করিয়া থাকে। যাহারা কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকিয়া, অনুমতি গ্রহণের তোয়াক্কা না করিয়াই স্টেশনের বাহিরে যথেচ্ছাচারভাবে অবস্থান করেন, তাহাদের ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করিবার চেষ্টা সব সময়ই দেখা গিয়াছে। শোনা গিয়াছে বিবিধ হুংকার, যাহাতে ফাঁকিবাজ চাকুরীজীবীগণ উপলব্ধি করিতে পারেন—ফাঁকির দিন চিরকাল একভাবে যাইবে না। সরকারি চাকুরীতে শৃৃঙ্খলাবিধি মোতাবেক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইতে পারে এবং তাহা হইতে পারে কঠোর। গত বুধবার সংসদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী এই ধরনের একটি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করিয়াছেন যে, যাহারা চাকুরী নিয়া কর্মস্থলে থাকেন না, তাহাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হইবে। যাহারা কর্মস্থল ত্যাগ করিয়া রাজধানীতেই বেশিরভাগ সময় পার করেন, প্রধানমন্ত্রী তাহাদের ব্যাপারে বীতশ্রদ্ধ হইয়া খেদ প্রকাশ করিয়াছেন যে, এই ধরনের ব্যক্তিদের তো চাকুরী করিবার দরকার নাই। প্রকৃতপক্ষে, কর্মস্থলে ফাঁকি দেওয়ার মানসিকতা বহু দিন ধরিয়া চাকুরীজীবীদের ভিতরে প্রোথিত হইয়া গিয়াছে। এই ফাঁকির বিপরীতে যে অ্যাকশন নেওয়া হয়, তাহারও অনেক জটিলতা থাকিয়া যায়। যেইহেতু কর্মফাঁকির ঘটনার তুলনায় অ্যাকশন নেওয়ার ঘটনাও উল্লেখযোগ্যহারে সামান্য, সেই হেতু, তাহা করিতে খুব বেশি দ্বিধায় পড়িতে হয় না ফাঁকিবাজ চাকুরীজীবীদের। তাহা ছাড়া, যেই দেশে বেশিরভাগ মানুষই ‘আমরা আমরাই তো’ নামের বিনিসুতার সম্পর্কে আবদ্ধ, সেইখানে ভূত তাড়াইবার সরিষা নিজেই ভূতাচ্ছন্ন হইয়া থাকে অনেক ক্ষেত্রে। এই দৈন্য-সংস্কৃতির মানসিকতা হইতে উত্তরণ ঘটাইতে হইলে একজন চাকুরীজীবীর অন্তস্থ বিবেকবোধের আত্মোপলব্ধির জাগরণ সর্বপ্রথম দরকার। কঠোর হুঁশিয়ারি, আইন এবং পাহারাদারী ব্যবস্থার মাধ্যমে সকল অনিয়ম আটকানো সম্ভব নহে। একজন ন্যূনতম সত্ ও নৈতিকতাসম্পন্ন চাকুরীজীবী নিশ্চয় ইহা স্মরণে রাখেন যে—কর্ম ফাঁকি দিয়া পারিশ্রমিক তথা বেতনভাতাদি ও অন্যান্য সুবিধা গ্রহণ করা সম্পূর্ণতই অবৈধ ও নীতিগর্হিত কাজ, যাহা চাকুরীর মৌলিক শর্তকে সবার আগে লঙ্ঘন করে। যাহার সুবিধা তিনি গ্রহণ করিতেছেন, বিপরীতে সেই প্রতিষ্ঠানকে কিছুই দিতেছেন না—এই অপরাধবোধ উপলব্ধির স্থান ভোঁতা হইয়া গেলে সমূহ বিপদ বটে। প্রকৃত মানুষের তাহা কখনই হইবে না। আর প্রকৃত মানুষ না হইলে সাধারণ কর্মচারী দূরঅস্ত, জাঁদরেল কর্মকর্তারও কি নৈতিক মূল্য থাকে কানাকড়ি?

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন