শতায়ু হয়েছেন ১৭ জানুয়ারি, শুক্রবার স্থানীয় (প:বঙ্গ) সময় সকাল আনুমানিক সাড়ে নটায়। তিন যুগ পর্দার অন্তরালে থাকা রহস্যময় জীবনের ছক ভেঙে, ভক্তকূলের হূদয় ছিঁড়ে নিয়ে চিরন্তন না-ফেরার দেশে চলে গেছেন। আসলেই কি চলে গেছেন? চোখ বুঁজলে যার চোখ, পটল-চেরা নয়, হরিণ চোখোও নয়, আবার কাজল-নয়না-হরিণীর বিশেষণে রাখলে কেউ অস্বীকার করার সাহস পাবে না। তার চোখ অন্য কারও অক্ষি-কোটরে আটকানো যাবে না। কারণ তার চাহনির অভিনবত্ব কোনো আভিধানিক শব্দে পাওয়াও দুষ্কর। তার হঠাত্-হাসির ঝিলিক কিংবা, চমেক- দেয়ার মতো বিষাদক্লিষ্ট হাসির নম্র গুরুভার এক- জীবনে আর কারও কাছে মেলেনি। কোনো প্রসাধনী ছাড়াই তার মুখাবয়বের সরল চমত্কারিত্ব এই অব্দি আর মেলেনি। কোনো যাদুকরী তুলির স্পর্শে পৃথিবীর কোনো চিত্রকরের পক্ষেও ওর মতো নিখুঁত কিংবা ওর মতো মোহময় মুখের আঙ্গিক উপহার দেয়া আদৌ সম্ভব নয়। চ্যালেঞ্জ রইলো। তার ভুরু কিংবা থুতিনর কালো তিল কোনো মেকআপম্যানের মাধ্যমেও বানানো সম্ভব নয়। ওর বাঁকানো ঘাড়ের কাছে ময়ূরও হার মানে। মেঘের আগমনী বার্তা-পাওয়া কোনো ময়ূরী ওর মতো পা তুলতে পারবে না, পা ফেলতে পারবে না, ঘাড় বাঁকিয়ে চলতে পারবে না। ওর ভূষণের কাছে পেখম-তোলা ময়ূরও হার মানে। ১৯৫০-৫১ সালে তিনি ব্লাউজের সাথে ম্যাচিং করে শরীরে শাড়ি জড়াতেন, ২০৫১ সালে, এমনকি দ্বাবিংশ শতাব্দীতেও কোনো রমণী অমন মোহনীয় বাঙালি পোশাক পরতে পারেন কি-না, সন্দেহ। চুল-খুলে-রাখা অথবা খোঁপা-বেঁধে রাখা দু’টি সুন্দর ব্যাপারেই একই সমান্তরালে মনোমুগ্ধকর। প্রাণোচ্ছল রমণীর অভিনয়ই হোক, বিষাদগ্রস্ত নারীর অভিনয়ই হোক, কন্যা-জননী-জায়া সব চরিত্রেই যেন সুশ্রী কাননের মায়াবী গোলাপ হয়ে ফোটাতেন তিনি। তার কান্নার মতো বিধুর বেদনাময় মুখাবয়বের ছবিটি কে কবে ফোটাতে পেরেছেন? আর দাঁতের ঝিলিক?
আংটির জন্য চন্দ্রশীলা পাথরের কী-প্রয়োজন? সুন্দর দাঁতের জন্য হাসির চ্ছ্বটা, না-কি সুন্দর হাসির জন্য দাঁতের শোভা— বলা কঠিন কে কার অলংকার? তার প্রাণোচ্ছল হাসিটাই ওরকম। বাঈজী ঘরাণার আবদ্ধতা এবং নিয়মরীতি ভেঙে সম্পূর্ণ নিজস্ব স্টাইলে বাঈজীর চরিত্র নির্মাণ (আমি অভিনয় বললাম না) করা শুধু তার পক্ষেই সম্ভব, যিনি অভিনয়কে বাস্তবতার রম্য আবেগের ছোঁয়া দেন। ‘রাজলক্ষ্মী’ তার বড় প্রমাণ।
পাঠকমাত্রই বুঝতে পারছেন, আমি একজন সুচিত্রা সেনের কথাই বলছি। আমাদের পাবনার সুচিত্রা সেন। ছবিতে অভিনয়ের আগে যিনি ছিলেন রমা দাশগুপ্ত। দেশ ভাগের পর চলে যান কলকাতা। ইহলৌকিক জীবনের ঘাঁটি নির্মাণ করেন টালিগঞ্জের এক নিভৃত মনোরম নৈসর্গিক স্থলে।
মায়ের মুখে, বালক বয়সে শুনেছিলাম চন্দ্রাবতী-কানন দেবীদের রূপ-সৌন্দর্যের কথা। ওদের মোহনীয় বয়সের ছবি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় দেখেছি, হাতে-গোনা কয়েকটি সিনেমাও দেখেছি। রূপলাবণ্যের সাথে যদি ব্যক্তিত্বের সংমিশ্রণ ঘটানো যায়, তাহলে বলবো, সুচিত্রা সেন ব্যালকোনীতে হাঁটছেন, যার সিঁড়ির ধারে-কাছেও অন্য কেউ নেই। লোভনীয়, ঈর্ষণীয় সৌন্দর্য অথচ যৌনাবেদনময়তা ঘুণাক্ষরেও উঁকি দ্যায় না। আশ্চর্য তার শারীরিক গঠন প্রক্রিয়া। বিমোহিত যৌবন অথচ বিনম্র আচরণ। রবীন্দ্রনাথ কি ওরই জন্য লিখেছিলেন: ‘নহ মাতা নহ কন্যা, নহ বঁধু সুন্দরী রূপসী
হে নন্দনবাসিনী উর্বশী!...
-উত্তর সম্ভবত ‘না’। তবে, অভিন্ন এক আনন্দের অদৃশ্য অংশীদারিত্ব রয়েছে ওই বাণীবন্ধনে।
কিশোর বয়সের শুরুতেই যখন শাপমোচন, সাগরিকা, সবার উপরে, শিল্পী, পথে হলো দেরী, রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত প্রমুখ ছবিগুলো দেখি, তখনই তার নায়ক চরিত্রে অভিনয় করা কান্তিমান পৌরুষদীপ্ত নায়ক (বাংলা ছবির এ যাবত্কালের মহানায়ক) উত্তম কুমারকে দেখে অনেক চিত্রানুরাগীকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে উত্ত্যক্ত করেছি এই বলে ‘আচ্ছা, ওরা দুজন একে-অপরকে বিয়ে করে ফেললে কী এমন ক্ষতি হতো? এর জবাব বাস্তব জগতে বহুদিন আগেই ‘মৃত’ হয়ে গ্যাছে, কিন্তু অনুরাগীদের বুকে এখনও যেন ছুটে আসে ওই প্রশ্নের বাণ... আর ‘উত্তম’টাই বা কেমন লোক, সুপ্রিয়া দেবীর পানিগ্রহণ করতে পারলে, সুচিত্রাকে নয় কেন? যাই হোক।
১৯৭৮ সালে সুচিত্রা সেনের বয়স কতো হয়েছিল? পঞ্চাশেরও অনেক নিচে। কথায় আছে, সুন্দরী নারী নাকি পঞ্চাশে অন্যরকম পেখম ছাড়ে। সুচিত্রা’র মনে সেই তাত্ত্বিক বচনখানি হয়তো উঁকি দেয়নি। আর, দিলেইবা কী হতো? মনোবিদরা যেখানে সুচিত্রার আত্মনির্বাসনের বিষয়টিকে তার ‘নার্সিসিস্টিক অ্যাটিচ্যুড’ হিসাবে চিহ্নিত করে ফেলেছেন, সেখানে আমরা আর এমন কী? মনোবিজ্ঞানী ডা. কেদার রঞ্জন, ডা. সুবর্ণা সেন তো এ ব্যাপারে পরিষ্কার বলেই ফেলেছেন— সুচিত্রা সেন কখনো রূপ-লাবণ্যের জোয়ারে ভাটির টান পড়ুক, এটা পছন্দ করতেন না। বাস্তবতার প্রতি নেতিবাচক হওয়াটাই নার্সিসিজমের লক্ষণ: তাই তার অভিনয়-জীবনের ‘সাত পাকে ‘বাঁধা’ সুন্দরকে কখনোই সময়ের বিচারে দেখতে চাননি। নিভৃত বাসিনী সুচিত্রা সেন যখন কোনো সঙ্গী-সাথীকে নিয়ে তার অভিনীত পুরোনো দিনের ছবি দেখতেন,তখন সঙ্গীদের মন্তব্যে আনমনা হয়ে জবাব দিতেন: ‘আরে দূর, ওটা তো আমি নই ও হচ্ছে সুচিত্রা সেন। নিজের রূপ-লাবণ্য আর সৌন্দর্যের প্রতি কতোটা চুলচেরা বিশ্বাস থাকলে এমনটি বলা যায়। নিজেকে ভালোবাসার এই স্বয়ম্ভর-শক্তি, সৌন্দর্যবোধকেই বরং বড় করা বৈ আর কিছু নয়।
আজ, কেন জানি আমার নিজের মনেও এমন প্রশ্ন জাগায়: বয়ঃসন্ধিকালে সিনেমা-পত্রিকায় প্রকাশিত সুচিত্রা-উত্তম জুটির ছবিগুলো কেন লুকিয়ে কাটিং করে রাখতাম বাংলা বইয়ের পাতায়। আজ আরো মনে হয়, ওকে কাছে থেকে না- দেখার দুঃখটা সুখের চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর, অনেক বেশি ভাবনামুখর।
স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, তখনকার মালা সিন্হা, সন্ধ্যা রায়, অরুন্ধুতি মুখার্জি, যমুনা, এমনকি বোম্বের মধুবালা, বৈজয়ন্তীমালা, নূতন ... (এমন আরো অনেককে বলা যায়) অপরূপ সুন্দরী ছিলেন। মনোগতভাবেই তারা যৌবনকে উসকে দিতেন উন্মাদনায়। কিন্তু সুচিত্রা সেন? এই উন্মত্ত উন্মাদনার অনেক ঊর্ধ্বে উঠে গিয়েছেন শরীরের সুশ্রী ভাষা ও ব্যক্তিত্বের বৈভব নিয়ে, স্বকীয় মাধুরি নিয়ে।
০৬ এপ্রিল তার ৮৫তম জন্মদিন।
তার বিদেহী আত্মাকে জানাই প্রণাম। শ্রদ্ধা ও মৃত্যুহীন অমরত্বের মহিমা। এমন সুচিত্রা সেনের আবির্ভাব কখনও ছায়াছবির জগতে ঘটবে কি-না, সন্দেহ। কবি তো ঠিকই বলেছেন ‘এই পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় না কো আর!’
[লেখক: কবি]
