অগ্নিকাণ্ড এবং বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৪৬
অগ্নি দুর্ঘটনা বর্তমানে বাংলাদেশে একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রত্যেক দিনই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। জান-মালের প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। ‘Prevention is better than Cure’- একটু সতর্ক হলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বহুলাংশে হ্রাস করা যেতে পারে। রান্নার গ্যাস, ইলেকট্রিক শর্ট সার্কিট, মশার কয়েল প্রভৃতি হতে অগ্নিকাণ্ড সৃষ্টি হতে পারে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অর্থাত্ প্রায় শতকরা ৯৮ ভাগ অগ্নিকাণ্ডের মূল কারণ হিসাবে চিহ্নিত হচ্ছে ইলেকট্রিক শর্ট সার্কিট। (Electric Short Circuit)। এ ক্ষেত্রে ভবন নির্মাণ এবং রক্ষণাবেক্ষণকারী বিদ্যুত্ প্রকৌশলীগণ যথাযথভাবে ডিজাইন, বাস্তবায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করলে বিদ্যুত্ শর্ট সার্কিটজনিত অগ্নিকাণ্ড বহুলাংশে হ্রাস করতে সমর্থ হবে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি অনেক আধুনিক সুউচ্চ ভবনে স্থাপত্যবিদ ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ার সম্পৃক্ত থাকলে, নির্মাণকালীন সময়ে বিদ্যুত্ ও যান্ত্রিক প্রকৌশলী সম্পৃক্ততা থাকে না, যা অপরিহার্য। যার জন্য অনেক আধুনিক ইমারত ভবনে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটজনিত অগ্নিকাণ্ড সৃষ্টি হয়। বৈদ্যুতিক সার্কিট সাধারণত: দুই ধরনের হয়ে থাকে। ওপেন সার্কিট (Open Circuit) অর্থাত্ সার্কিট উন্মুক্ত থাকাতে বিদ্যুত্ তড়িত্ প্রবাহ হয় না। কিন্তু অপরটি শর্ট সার্কিট অর্থাত্ বাধাহীন। ন্যূনতম বাধাগ্রস্ত থাকাতে অপরিসীম বিদ্যুত্ প্রবাহ হয়ে থাকে। এই অপরিসীম বিদ্যুত্ প্রবাহ কমন তারের পরিবাহক (Conductor)-এর বিদ্যুত্ প্রবাহের ক্ষমতার চেয়ে বেশি হয়। তখন পরিবাহক উত্তপ্ত হয়। রোধক (Insulation) পুড়ে যায়, ফলশ্রুতিতে অগ্নিকাণ্ড সৃষ্টি হয়। আরও অন্যান্য কারণে ঘটতে পারে। যেমন: (ক) তারের দুর্বল সংযোগ (Loose Connection) স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টির মাধ্যমে (খ) প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে হাউজ ওয়ারিং-এর কমপিল্ড ওয়ারিং-এ জোড়া পরিহার করা বাঞ্ছনীয়। তার/ক্যাবল ও যন্ত্রপাতিসমূহ ওভার লোডেড অর্থাত্ ক্ষমতার চেয়ে বেশি তড়িত্ প্রবাহের কারণে উত্তপ্ত হয়ে সৃষ্ট অগ্ন্যুত্পাত। (গ) বৈদ্যুতিক উত্স, তার, ক্যাবলসমূহ সহজ দাহ্য পদার্থ হওয়ার কারণে (ঘ) নিম্নমানের বৈদ্যুতিক তার ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি (ঙ) স্থিতি বিদ্যুত্ (Stetic Electricity) উত্পন্ন জন্য। (ছ) নকল, নিম্নমানের তার, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি এবং অপেশাজীবী অদক্ষ বৈদ্যুতিক কারিগর হতে সাবধান। (জ) অতি সম্প্রতিকালে ‘শর্ট সার্কিট’এর অন্যতম একটি কারণ হল: ইঁদুর। ইঁদুর-এর কারণে প্রায় ৯৫ ভাগ শর্ট সার্কিট হয়ে থাকে। ইঁদুর তার কেটে ‘শর্ট সার্কিট’ সৃষ্টি করে থাকে। (ঝ) ব্যক্তি ইমারত ভবনের আয়ুষ্কাল সাধারণত ৭৫-১০০ বছর বিবেচনা করা হয়। কিন্তু সে ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক ওয়ারিং এর আয়ুষ্কাল ধরা হয় ১২-১৫ বছর অর্থাত্ নির্দিষ্ট সময় পর তার সমূহ পরিবর্তন করা প্রয়োজন। শর্ট সার্কিট প্রতিরোধে করণীয় কতিপয় নিয়মাবলী:- ১। ভালো গুণগত মানের অগ্ন্যুত্পাতের সহায়তাকারী নয়, এমন প্রকৃতির আন্তর্জাতিকমানের পরীক্ষিত ক্যাবল ব্যবহার করণ। ২। দক্ষ পেশাজীবী বৈদ্যুতিক প্রকৌশলী দ্বারা বৈদ্যুতিক নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। ৩। বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় লাইসেন্সধারী দক্ষ বৈদ্যুতিক কারিগর দ্বারা বৈদ্যুতিক কাজ বাস্তবায়ন। ৪। কোন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি হতে ধোঁয়া অথবা পোড়া গন্ধ বের হওয়ার সাথে সাথে “আন প্লাগ” করা অথবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করণ। ৫। ক্যাবল/তার জোড়া পরিহার করণ। ৬। নির্দিষ্ট সময় পর অর্থাত্ বাংলাদেশের আবহাওয়ায় ১২-১৫ বছর পর পর তার পরিবর্তন করণ। কারণ নির্দিষ্ট সময় পর তারের রোধক (Insulation) ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। ৭। নির্দিষ্ট পরিমাপের সার্কিট ব্রেকার অথবা ফিউজ স্থাপন করণ। ৮। সার্কিট ব্রেকার বক্স/এম.ডিবি বক্স, যাতে দাহ্য পদার্থের না হয়। এবং সহজ দাহ্য পদার্থের সংস্পর্শে না থাকে। ৯। গ্যাস-জ্বালানি আবদ্ধ অবস্থায় বিশেষ পাত্রে রাখা বাঞ্ছনীয়। ১০। বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি অপ্রয়োজনে বন্ধ রাখা বাঞ্ছনীয়। ১১। নির্দিষ্ট পরিমাপের আর্থলীকেজ সার্কিট ব্রেকার স্থাপন করণ। কারণ সামান্য লিকেজ কারেন্ট-ই অগ্ন্যুত্পাতের জন্য যথেষ্ট। ১২। পেষ্ট নিয়ন্ত্রণ করা। ইঁদুর যাতে তার কাটতে সমর্থ না হয়। অতি সম্প্রতিকালে ছুটিকালীন সময় অর্থাত্ বন্ধকালীন সময়ে অগ্নিকাণ্ড সৃষ্টি হওয়ায় বিষয়টি পরিলক্ষিত হচ্ছে। যার অন্যতম কারণ হচ্ছে লুজ প্লাগ সংযোগ নিম্নমানের ব্যালাষ্ট যা উত্তপ্ত হয়ে অগ্নিকাণ্ড সৃষ্টি হয় এবং দ্রুত বিস্তার লাভ করে। অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধে করণীয় কতিপয় সুপারিশ Preventation is setter than cure-প্রতিরোধের জন্য প্রতিশোধক শ্রেয়। সেই লক্ষ্যে কতিপয় ব্যবস্থা গ্রহণ বাঞ্ছনীয়। ১। অগ্নির উত্স যেমন বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা, গ্যাস বার্নার, বয়লার নিয়মিত পরীক্ষা করণ। পর্যবেক্ষণ এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের কোন বিকল্প নাই। ২। অগ্নি নির্বাপণ যন্ত্র ব্যবস্থা (Fire Fighting Management System) সব সময় অতন্ত্র প্রহরীর ন্যায় সচল ও সক্ষম রাখবে। ফায়ার রিজার্ভারে যথেষ্ট কাজে পানি মজুত রাখা। ৩। ফায়ার এক্সিট (Fire Exit) সম্পূর্ণরূপে বাধাহীন ও নিরাপদ রাখা বাঞ্ছনীয়। সুউচ্চ ভবনে ফায়ার এক্সিট সত্যিকার অর্থে যেন ন্যূনতম পক্ষে ৯০ মিনিট পর্যন্ত অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ করতে পারে। কোন অবস্থাতেই যেন অগ্নি/ ধোঁয়া ফায়ার এক্সিট এ প্রবেশ করতে পারে না। সব সময় যাতে পজিটিভ প্রেসার (Positive Pressure) বিরাজমান থাকে। দরজাসমূহ যাতে একমুখী হয়। অনেক সুউচ্চ আধুনিক ইমারত ভবনে (Fire Exit) সমূহ যথাযথ নয়। যা বিকল্প সিঁড়ি বিবেচনা করা যেতে পারে। অর্থাত্ অগ্নিকাণ্ডে/ ধোঁয়া দ্রুততার সাথে বিস্তৃতি লাভের পথ। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। ৪। অনেক সময় লক্ষ্য করা যায় যে, অগ্নিকাণ্ড সৃষ্টির সাথে সাথে সম্পূর্ণ ইমারতভবনের বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়। ফলশ্রুতিতে জরুরি বিদ্যুত্ সরবরাহ বন্ধ হওয়ার ফলে Fire Fighting Managment System অকার্যকর হয়ে পড়ে। অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হয়ে জানমালের ক্ষতির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। এক্ষেত্রে জরুরি বিদ্যুত্ সরবরাহ থাকা বাঞ্ছনীয়। ৫। প্রতিরোধ অথবা সতর্কতামূলক চারটি প্রধান যন্ত্র যেন সবসময় সচল থাকে। যা অগ্নিকাণ্ডের প্রারন্তেই সতর্ক করতে পারে। যেমন (ক) স্মোক ডিক্টেটর (smoke detector) অর্থাত্ ধোঁয়া সৃষ্টির সাথে অ্যালার্ম বাজিয়ে সতর্ক করে এবং কন্ট্রোল পারসেলে অবস্থান চিহ্নিত করে। যার জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক smoke detector যথোপযুক্ত স্থানে স্থাপন করা অপরিহার্য। স্মোক ডিক্টেটর প্রায় প্রতিমাসে পরীক্ষা করা প্রয়োজন এবং ৮-১০ বছর পর পর পরিবর্তন করা প্রয়োজন। (খ) ফায়ার অ্যালার্ম (Fire Alarm) প্রয়োজনীয় সংখ্যক ফায়ার অ্যালার্ম এবং গ্লাস ব্রেক সুইচ স্থাপন করা প্রয়োজন। যাতে অগ্নিকাণ্ড সৃষ্টি হওয়ার সাথে সতর্ক করা সম্ভব হয়। (গ) ফায়ার এক্সটিংগুইশার (Fire Extinguisher) যথেষ্ট পরিমাণ ফায়ার এক্সটিংগুইশার বতল গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থাপন করা প্রয়োজন। নিয়মিত পরীক্ষা করণ ও হালনাগাদ করা। (ঘ) প্রশিক্ষণ/ ফারার ড্রীল- প্রশিক্ষণের কোন বিকল্প নেই। অগ্নিকাণ্ডের সময় অধিকাংশই কিংকর্তব্যপরায়ণ হয়ে পড়ে। অনেক সময় আতংকগ্রস্ত হয়ে পদদলিত হয়ে অনেক প্রাণহানি ঘটে থাকে। মহানগরীর যানজটের বিষয় বিবেচনা করলে অগ্নিকাণ্ড সৃষ্টি হওয়ার ফায়ার সার্ভিস এর সহযোগিতা পেতে সকলের প্রয়োজন হয়। ফলশ্রুতিতে অগ্নিকাণ্ড ব্যাপক বিস্তৃতি লাভের সুযোগ পায়। যার জন্য ভবনের প্রত্যেকে বাসিন্দাদের যন্ত্রপাতি পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেয়া প্রয়োজন। ৩-৬ মাস পরপর ড্রীল করা প্রয়োজন। প্রাথমিক শিক্ষা পাঠ্য-পুস্তকেও বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। যাতে অগ্নিকাণ্ড উত্পত্তির সাথে সাথে প্রতিরোধ করা যায়। লেখক:নিবাহী প্রকৌশলী (ইনেক্স) রির্জাভ গণপূর্ত অধিদপ্তর, Email: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন