আজ সাবেক মন্ত্রী, মুক্তিযোদ্ধা এবং ঢাকা সিটি কর্পোরেশন এর সাবেক মেয়র নাজিউর রহান মঞ্জুর ৬ষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৪৮ সালে ১৫ মার্চ ভোলা জেলার উত্তর দিঘলদী ইউনিয়নের বালিয়া গ্রামের মিয়া বাড়ীতে তার জন্ম; পিতা ছিলেন মরহুম বজলুর রহমান মিয়া। শিক্ষা এবং সামাজিক উন্নয়ন, মানব সেবা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ছিল নাজিউর রহমান মঞ্জুর ব্রত। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি যেমন সুপরিচিত ঠিক তেমনিভাবে ভোলায় গণমানুষের কাছে ভোলার প্রাণপুরুষ ভোলাবন্ধু হিসেবে পরিচিত। ১৯৮৬ সালে তত্কালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদকে নিয়ে ভোলা যান। ভোলা থেকে চরফ্যাশন ৬৮ কি.মি. গাড়ি চালিয়ে স্বয়ং রাষ্ট্রপতি ভোলার প্রধান সড়কের করুণ বেহাল চিত্র স্বচক্ষে দেখেন। সেই সফরের পর থেকে ভোলার যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন নাজিউর। গণতন্ত্র ও জাতীয় উন্নয়নে তার অবদান চিরস্মরণীয়। তিনি একজন উদার হূদয়ের অত্যন্ত পরোপকারী, বিচক্ষণ, দূরদর্শী ও বড় মানের মহত্ রাজনীতিবিদ ছিলেন। সফল পিতা হিসেবে তিনি তার তিন ছেলেকে বারএট ‘ল’ ডিগ্রি সম্পন্ন করিয়েছেন।
২০০৭ সালের সিডর উত্তর ভোলার অন্যান্য স্থানের মতো বোরহানউদ্দিন উপজেলার হাসান নগর ইউনিয়নে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ত্রাণ বিতরণ করার জন্য তিনি ছুটে আসেন। ক্ষতিগ্রস্ত, দুস্থ ও অসহায় মানুষের কল্যাণে নাজিউর রহমান মঞ্জুর নাম ভোলার শ্রমিক-রিক্সা চালকসহ সকল মহলে খুবই পরিচিত ছিল। ত্রাণ বিতরণ শেষে ঐদিন নাজিউর রহমান মঞ্জু আমাদের বর্তমান নতুন বাড়িতে মধ্যাহ্ন ভোজে এসেছিলেন। তার ছোট ছেলে ব্যারিস্টার ওয়াছিকুর রহমান অঞ্জনসহ ভোলার বিজেপি নেতৃস্থানীয়রাও সঙ্গে ছিলেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে অনেক খাবারই তার জন্য নিষেধ ছিল; কিন্তু তিনি ছিলেন যেমন ভোজন রসিক তেমনি ভোজন বিলাসীও। যখন আমাদের বাড়ি থেকে চলে যাবার জন্য গাড়িতে উঠবেন তখন তিনি আমাকে উদ্দেশ করে বললেন, “তুই ঢাকায় থাকিস অথচ আমার বাসায় আসিস না, ঢাকায় আসলে অবশ্যই আমার বাসায় আসবি”। তখন আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটির এমএসএস নৃবিজ্ঞান শেষ বছরের ছাত্র। এর কয়েক বছর আগে আমার বাবাসহ তার সাথে কথা হয়েছিল, তখন তিনি আমাকে নৃবিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যয়নের জন্য অনেক উত্সাহ ও অনুপ্রেরণা দেন।
দেশের উন্নয়নের পাশাপাশি ভোলার মানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য-চিকিত্সা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্যানিটেশন, টিউবঅয়েলে পানির ব্যবস্থা গ্রহণে তার অবদান অনস্বীকার্য। একটা সময় ভোলায় প্রবাদ ছিল, বাড়ি বাড়ি টিউবঅয়েল মানে নাজিউরের নাম। ভোলায় যখন বিশুদ্ধ খাবারের পানির অভাব, তখন তিনি গভীর নলকূপের ব্যবস্থা গ্রহণ করে পানিবাহিত রোগ নির্মূলে সচেষ্ট ছিলেন। ভোলার চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে তিনি ভোলায় এক বছরে সারা বাংলাদেশের মোট বরাদ্দের অর্ধেক অর্থাত্ সাত হাজার নলকূপ প্রদান করেন। যার গ্রাহকদের টাকা নিজেই পরিশোধ করে ফ্রি টিউবঅয়েল বিতরণ করেন। ভোলায় শতাধিক স্কুল, মাধ্যমিক স্কুল, মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, কলেজ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, পার্ক ইত্যাদি স্থাপনে তার অবদান রয়েছে। ভোলার শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলনে, নদী ভাঙ্গন রোধ, বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদী ভাঙ্গন রোধে তুলাতুলি বাজারে ব্লক স্থাপন, ইরিগেশন প্লান্ট গ্রহণ ও বাস্তবায়নে, খেয়াঘাটের আমূল পরিবর্তন, বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল বাস টার্মিনাল নির্মাণ, টাউন হলের আধুনিকায়ন ও জাতীয় মঙ্গলের কবি মোজাম্মেল হকের নামে নামকরণ, সার্কিট হাউজ নির্মাণ, ডিসি অফিস নির্মাণ, জেলা জজ ও দায়রা জজ আদালত ভবন নির্মাণ, এলজিইডি ভবন নির্মাণ, সাতটি উপজেলায় সাতটি ডাকবাংলো, সাতটি হ্যালিপোর্ট, সাতটি উপজেলা পরিষদ গঠনসহ সর্বোপরি ভোলাকে জেলায় রূপান্তরে নাজিউর রহমান মঞ্জুর অবদান অনস্বীকার্য। আত্মগোপনে থাকাকালীন অবস্থায় জেলা সাব-রেজিষ্ট্রার অফিস নির্মাণের জন্য ভূমি মালিকদের নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ প্রদান করে নির্মাণ কাজ ত্বরান্বিত করেন। ভোলার গ্যাসের যথাযথ ব্যবহার ও স্থানীয় পর্যটন এলাকাগুলোর গুরুত্ব তুলে ধরে উন্নয়নের মূল সে াতধারায় নিয়ে আসা জরুরি।
তার চিন্তা ও চেতনা ছিল ভোলাকে সিঙ্গাপুরের আদলে বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাজধানী পর্যায়ে গড়ে তোলা। ভোলায় একটি সি-পোর্ট, সার কারখানাসমৃদ্ধ স্বয়ংসম্পূর্ণ ভোলা গড়ে তোলা। তার ইন্তেকালে সৃষ্ট শূন্যতা পূরণে সমমনা রাজনীতিবিদগণ গণতান্ত্রিক মনোভাব নিয়ে দেশ-জাতির উন্নয়নে কাজ করে যাবেন। তার ইন্তেকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘দ্বীপ’-এর আহ্বায়ক হিসেবে আমরা শোক প্রস্তাবসহ তার স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য একটি বৃত্তির প্রকল্প গ্রহণে দাবি উঠলেও আজও তা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। তার কর্মময় জীবন বাংলাদেশসহ ভোলার মানুষের হূদয়ে চির জাগরুক হয়ে থাকবে।
লেখক : বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক
