ভাষা ও বাংলা ভাষা:
ভাষা: প্রাণিজগতে একমাত্র মানুষের ভাষা আছে। ভাষার সাহায্যে আমরা কথা বলি। ভাষার মাধ্যমে আমরা প্রকাশ করি আমাদের অভিজ্ঞতা, নানা ধরনের আবেগ, বিভিন্ন ধরনের অনুভূতি। ভাষা আমাদের শিক্ষার মাধ্যম, ভাষাকে দেশ গঠনের হাতিয়ার হিসেবেও গ্রহণ করা হয়।
সংজ্ঞা: মানুষের কণ্ঠনিঃসৃত বাক্সংকেতের সংগঠনকে ভাষা বলে।
ভাষা দুই প্রকার:
ক. মৌখিক ভাষা (Oral Language): যেসব ভাষার লেখার কোন ব্যবস্থা নেই সেসব ভাষাই মৌখিক ভাষা।
খ. লিখিত ভাষা (Writen Language): যেসব ভাষার লিখিত ব্যবস্থা আছে সেসব ভাষাই লিখিত ভাষা।
মানুষের ভাষা মৃত্যুর পরও যাতে বেচেঁ থাকে সেজন্য আবিষ্কৃত হয়েছে লিখন - ব্যবস্থার (Writing- System )।
ভাষার লিখন ব্যবস্থা তিন প্রকার:
১। বর্ণভিত্তিক (Alphabetic): বর্ণমালাভিত্তিক লিখিতব্যবস্থাই হলো বর্ণভিত্তিক ভাষা। বাংলা, ইংরেজি, রুশ, হিন্দি, তামিল প্রভৃতি বর্ণভিত্তিক ভাষা।
২। অক্ষরভিত্তিক (Syllabic): অক্ষর হচ্ছে বাগযন্ত্রের স্বল্পতম প্রয়াসে উচ্চারিত ধ্বনি বা ধ্বনিগুচ্ছ। ‘বন্ধন’ - শব্দের বন্ + ধন্ — এ দুটো অক্ষর।
অক্ষর অনুযায়ী যেসব ভাষার লিখিত ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে তাকে বলে অক্ষরভিত্তিক ভাষা।
যেমন — জাপানি ভাষা।
৩। ভাবাত্নক (Idiographic) ছবি বা চিত্রের মাধ্যমে যেসব ভাষার লিখিত ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে সেসব ভাষাই ভাবাত্নক ভাষা।
যেমন — চীনা ভাষা, কোরীয়া ভাষা।
ভাষার উপাদান:
ভাষার প্রধান উপাদান চারটি -
ক. ধ্বনি খ. শব্দ গ. বাক্য ঘ. বাগর্থ
ক. ধ্বনি: বাতাসে আঘাতের ফলে ধ্বনির সৃষ্টি হয়। ভাষায় তাকেই ধ্বনি হিসেবে গ্রহণ করা হয় যা বাগ্যন্ত্র এর সাহায্যে তৈরি হয়। সাধারণভাবে আমরা বলতে পারি — মানুষের মুখনিঃসৃত অর্থপূর্ণ আওয়াজকেই ধ্বনি বলে।
খ. শব্দ: এক বা একাধিক ধ্বনি মিলে শব্দের সৃষ্টি হয়। আর অর্থপূর্ণ ধ্বনি বা ধ্বনিসমষ্টিকে শব্দ বলে। যেমন - অলস = অ + ল্ + অ + স্ + অ।
গ. বাক্য: বাক্য বলতে কথা বা বাচন কে () বোঝায়। ভাষার উপাদান হিসেবে ধরলে বাক্যের স্থান তৃতীয়। যে সুবিন্যস্ত পদসমষ্টি দ্বারা বক্তার মনোভাব সম্পূর্ণরূপে প্রকাশ পায় তাকে বাক্য বলে।
ঘ. বাগর্থ: মাতৃভাষা: মাতৃভাষা অর্থ মায়ের ভাষা। শিশু প্রথম যে ভাষা শেখে তা-ই তার প্রথম ভাষা বা মাতৃভাষা। বাঙালি মায়ের সন্তানেরা মায়ের কাছ থেকে প্রথম বাংলা ভাষা শেখে তাই তার মাতৃভাষা বাংলা।
ভাষার রূপবৈচিত্র্য :
ভাষার কোন অখণ্ড বা একক রূপ নেই। একই ভাষা নানা রূপে ব্যবহূত হয়।
ক. উপভাষা: ভৌগলিক ব্যবধান, যোগাযোগ ব্যবস্থা, সমাজগঠন, ধর্ম, পেশা ইত্যাদি কারণে এক এলাকার ভাষা থেকে অন্য এলাকার ভাষার পার্থক্যের সৃষ্টি হয়। ভৌগোলিক ব্যবধান বা অঞ্চল ভেদে ভাষার যে বৈচিত্র্য তা-ই হলো উপভাষা। উপভাষাকে আঞ্চলিক ভাষা ও বলা হয়।
উপভাষিক এলাকা উপভাষার নমুনা
খুলনা-যশোর: অ্যাকজন মানশির দুটো ছাওয়াল ছিল
ময়মনসিংহ : অ্যাকজনের দুই পুত্ আছিল।
সিলেট : অ্যাক মানুশর দুই পোয়া আছিল।
নোয়াখালী : অ্যাকজনের দুই হুত আছিল।
প্রমিত ভাষা: একই ভাষার উপভাষাগুলো অনেক সময় বোধগম্য হয় না। এজন্য একটি উপভাষাকে আদর্শ ধরে সবার বোধগম্য ভাষা হিসেবে তৈরি ভাষারূপই হলো প্রমিত ভাষা।
প্রমিত ভাষার মাধ্যমে —শিক্ষা, প্রশাসনিক কাজ,ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পাদিত হয়।
সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মাধ্যমে প্রমিত ভাষা প্রমিত ভাষা ও উপভাষার পার্থক্য:
প্রমিত ভাষা উপভাষা
প্রমিত ভাষার লিখিত ব্যাকরণ থাকে উপভাষার কোন ব্যাকরণ থাকে না
প্রমিত ভাষা চর্চা করে শিখতে হয় উপভাষা শিশুকাল থেকে প্রাকৃতিক নিয়মে অর্জন করতে হয়।
প্রমিত ভাষা শেখার বিষয় উপভাষা অর্জনের বিষয়
কথ্যভাষা : অনানুষ্ঠানিক পরিবেশে বন্ধু কিংবা সহকর্মী বা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলাপচারিতায় যে ভাষারূপ ব্যবহার করা হয় সেই ভাষারূপকে কথ্যভাষা বলা হয়।
ব্যক্তিভাষা: ব্যক্তির নিজস্ব পরিচয় যে ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ পায় তা-ই ব্যক্তিভাষা
মহত্ সাহিত্যিকরা ব্যক্তিভাষা বা নিজস্ব ভাষারূপ সৃষ্টি করেন।
সামাজিক ভাষা: সমাজের কোন বিশেষ শ্রেণির ভাষাকে বলে সামাজিক ভাষা।
সামাজিক ভাষা দুই প্রকার: ক. উচ্চশ্রেণির ভাষা
খ. নিম্নশ্রেণির ভাষা।
ক. উচ্চশ্রেণির ভাষা: সমাজের অভিজাত শ্রেণির ভাষাকে বলা হয় উচ্চশ্রেণির ভাষা।
খ. নিম্নশ্রেণির ভাষা: নিম্নশ্রেণি বা নিম্ন আয়ের মানুষের ভাষাকে বলা হয় নিম্নশ্রেণির ভাষা।
পেশাগত ভাষা: সমাজের কোন বিশেষ মানুষের ভাষাবৈচিত্র্যই হলো পেশাগত ভাষা।
যেমন:চিকিত্সকের ভাষা, আইনজীবীদের ভাষা
রাজমিস্ত্রি বা কাঠমিস্ত্রিদের ভাষা।
দ্বিতীয় ভাষা: মাতৃভাষা ছাড়া যে কোন ভাষাকেই দ্বিতীয় ভাষা বলে।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় ভাষা মূলত — ইংরেজি।
