দুর্নীতি প্রতিরোধ সপ্তাহ উপলক্ষে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আয়োজিত এক সেমিনারে বিশিষ্টজনেরা বলিয়াছেন যে দেশের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলি রাজনৈতিক ক্ষমতার নিকট জিম্মি হইয়া আছে। ফলে এইসব প্রতিষ্ঠান জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হইতেছে। সেমিনারে অংশগ্রহণকারী একজন আলোচক বলিয়াছেন যে সাংবিধানিক প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই প্রশ্নবিদ্ধ। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ নূতন নহে। এমনকী স্বৈরশাসনের অবসানের পর নব উদ্যমে গণতন্ত্রের অভিযাত্রা শুরু হইলেও প্রায় সকল সরকারের আমলেই এই ধরনের অভিযোগ উত্থাপিত হইয়াছে। সম্মুখীন হইতে হইয়াছে কঠোর সমালোচনার। আর ব্যতিক্রমহীনভাবে সর্বদাই বিরোধী দলই এই ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করিয়াছে। কখনও দাবি উঠিয়াছে আইন সংশোধনের। কখনও-বা ব্যক্তি পরিবর্তনের। এইসব লইয়া বিস্তর পরীক্ষা-নিরীক্ষা হইয়াছে। কিন্তু অদ্যাবধি সন্তোষজনক কোনো মীমাংসায় উপনীত হওয়া সম্ভব হয় নাই। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কার্যকর করা সম্ভব হয় নাই সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে। এই প্রসঙ্গে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু হেনা বলিয়াছেন যে নির্বাচন কমিশন বা দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানগুলিকে কার্যকর করিতে হইলে শীর্ষ পর্যায়ে যোগ্য ব্যক্তির নিয়োগ নিশ্চিত করিতে হইবে। সর্বোপরি, প্রচলিত আইনের মধ্যে থাকিয়াই এইসব প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করা সম্ভব বলিয়া তিনি মনে করেন।
ব্যক্তি বা নেতৃত্বের ভূমিকা যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ তাহা অনস্বীকার্য। অভিজ্ঞতায় দেখা গিয়াছে যে যথাযথ আইন থাকা সত্ত্বেও শীর্ষ পর্যায়ে আসীন ব্যক্তিবিশেষের নতজানু বা পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকার কারণেও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বহু প্রতিষ্ঠান বিতর্কিত বা অকার্যকর হইয়া পড়ে। জাতীয় পর্যায়ে শুধু নহে, স্থানীয় পর্যায়েও এমন উদাহরণ ভূরি ভূরি। সংবিধান বা আইনের নির্দেশনা মানিয়া চলিবার পরিবর্তে কতিপয় সরকারি কর্মকর্তা স্থানীয় ক্ষমতাশালীদের তুষ্ট করিতেই অধিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই আজ্ঞাবহ মানসিকতার মারাত্মক কুফল ভোগ করিতে হয় সাধারণ মানুষকে। এই বাস্তবতা যেমন অস্বীকার করিবার উপায় নাই, তেমনি অনেক ক্ষেত্রে আইনের সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও প্রকটভাবে দৃশ্যমান। বিশেষ করিয়া দুদক ও নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রে কথাটি বেশি করিয়া প্রযোজ্য। ইহা সুবিদিত যে আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে অতীতে যেমন এই দুইটি প্রতিষ্ঠানকে অনেক ক্ষেত্রে সরকারের মুখাপেক্ষী হইয়া থাকিতে হইয়াছে, তেমনি এখনও হইতেছে। তদুপরি অর্থ বরাদ্দ ও প্রাপ্তি হইতে শুরু করিয়া প্রশাসনিক নানা বিষয়ে সরকারের উপর নির্ভরশীলতাজনিত মজ্জাগত দুর্বলতা তো আছেই। সামপ্রতিক একটি জরিপে দেখা গিয়াছে যে দুদকের উপর জনগণের আস্থা মাত্র ৮ শতাংশে নামিয়া আসিয়াছে। অনুরূপ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলির ক্ষেত্রেও চিত্রটি ভিন্ন হইবার সম্ভাবনা খুবই কম। আস্থার এই সংকট যে একদিনে তৈরি হয় নাই— তাহা না বলিলেও চলে।
গণতন্ত্র ও আইনের শাসনকে সুসংহত করিতে হইলে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে শক্তিশালী ও কার্যকর করা ছাড়া গত্যন্তর নাই। ইহার জন্য উপযুক্ত নীতি ও নেতৃত্ব দুইটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ বলিয়া আমরা মনে করি। উদাহরণ হিসাবে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র বলিয়া বিবেচিত প্রতিবেশী দেশ ভারতের দিকে তাকানো যাইতে পারে। কাজে লাগানো যাইতে পারে তাহাদের এতদ্সংক্রান্ত দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে সম্পূর্ণভাবে কার্যকর করিতে হইলে উপযুক্ত আইনি সমর্থন অপরিহার্য শুধু নহে, অবিকল্পও বটে। স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসাবে কাজ করিবার মতো যথাযথ আইনি সুরক্ষা না থাকিলে যতো যোগ্য লোকই নিয়োগ দেওয়া হউক না কেন— তাহাতে কোনো ফল হইবে বলিয়া মনে হয় না। আবার যথাস্থানে যথাযোগ্য ব্যক্তি বা নেতৃত্বেরও যে প্রয়োজন রহিয়াছে তাহাও বলিবার অপেক্ষা রাখে না। ইহা অনস্বীকার্য যে, উপযুক্ত নীতি ও নেতৃত্বের সুসমন্বয়ের মাধ্যমেই কেবল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে কার্যকর করিয়া তোলা যাইতে পারে।
