শিক্ষাঙ্গনে হত্যাকাণ্ড

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৪৬
লাঠিপেটা করিয়া নির্দয়ভাবে হত্যা করা হয় বাংলাদেশ কৃষি বিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী সায়াদকে। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের মাত্র পাঁচদিনের মাথায় ছাত্রাবাসে নিজ কক্ষে গুলিবিদ্ধ হইয়া মারা যান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা রোস্তম আলী আকন্দ। গত শুক্রবার জুমার নামাজের সময় তাহাকে গুলি করিয়া হত্যা করা হয়। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে শিক্ষার্থীরা পালন করিয়া যাইতেছেন ধর্মঘট কর্মসূচি। এই দাবিতে সংশ্লিষ্ট দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণও সোচ্চার। ছাত্র ও শিক্ষকদের এই আন্দোলন সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত কী ফল বহিয়া আনিবে, তাহা জানে কেবল ভবিতব্য। ক্যাম্পাসে আর কত রক্ত ঝরিলে, আর কত মায়ের বুক খালি হইলে রক্তপাতের নারকীয় উত্সবের অবসান ঘটিবে, তাহাই বা কে বলিতে পারে! শুনিতে খারাপ শোনা যায়, বলিতে সংকোচ হয়;আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি যেন রূপান্তরিত হইয়াছে ভিন্ন ভিন্ন মৃত্যুর উপত্যকায়। শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষক— ক্যাম্পাসে কেহই নিরাপদ নহে। পরস্পরবিরোধী ছাত্র সংগঠনের সংঘাত-সংঘর্ষে এই যাবত্ কত তরুণের জীবনপাত ঘটিয়াছে সহসা সেই হিসাব দেওয়া কঠিন। হলে ডাকিয়া নিয়া সহপাঠিকে নির্দয়ভাবে পিটাইয়া হত্যা করা কিংবা দিন দুপুরে ছাত্রাবাসের কক্ষে প্রবেশ করিয়া গুলি করিয়া মানুষ মারিবার ঘটনাদৃষ্টে মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনই পরিণত হইয়াছে অপরাধীদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্রে। গত চার বত্সরে এক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিহত হইয়াছেন চার ছাত্রলীগ কর্মী। হাত ও পায়ের রগ কাটিয়া দেওয়ার মত পৈশাচিক ঘটনা ঘটিয়াছে অনেক। যাহাদের হাত ও পায়ের রগ কাটিয়া দেওয়া হইয়াছে, দুর্বিষহ হইয়া উঠিয়াছে তাহাদের অনেকের জীবন। রাবি ক্যাম্পাসে এই যাবত্ নিহত হইয়াছেন কম করিয়া হইলেও ২৭ জন শিক্ষার্থী। শিক্ষক হত্যার ঘটনাও ঘটিয়াছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন, বাংলাদেশে যে কয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে, তাহার সবগুলির পরিস্থিতি কমবেশি একই রকম। বত্সর দুই আগের হিসাব; ২০১২ সালের মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হইয়াছে ১২৯টি। এর মধ্যে ৭৪ জন নিহত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। চট্টগ্রামে ২৪, জাহাঙ্গিরনগরে ৬ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে খুন হইয়াছে ২৫ জন। ইহার বাহিরে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাকৃবি, বুয়েট প্রভৃতি উচ্চ শিক্ষ্াঙ্গনেও খুন-খারাবির ঘটনা ঘটিয়াছে। গত শতকের নব্বইয়ের দশক নাগাদ প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলিয়া খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতির এতটাই অবনতি ঘটিয়া গিয়াছিল যে, ১৯৯৩ সালে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় ইহাকে পৃথিবীর সবচাইতে বেশি সন্ত্রাস কবলিত শিক্ষাঙ্গন বলিয়া আখ্যায়িত করা হইয়াছিল। আশার কথা এই যে, এক্ষণে ঢাবি পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে অনেকটাই শান্ত। কিন্তু রাজধানীর বাহিরের পাবলিক ইউনিভার্সিটি সমূহের পরিস্থিতি তাহা নহে। রাজনীতির নামে সন্ত্রাস সংঘাত ও রক্তপাতের ঘটনা ঘটিয়া চলিয়াছে সময়-সময়ান্তরে। কিন্তু কেন এই পরিস্থিতি? বিশ্ববিদ্যালয়ে যাহারা পড়িতে আসেন, তাহারা অপেক্ষাকৃত মেধাবী ও অধ্যবসায়ী। ক্যাম্পাসে আসিয়া তাহাদের মধ্যে কেউ কেউ খুনি সন্ত্রাসী হইয়া যায় কেমন করিয়া তাহা আরেক বিস্ময়। পরিবেশ-পরিস্থিতিই তাহাদের বিপথে পরিচালিত করিয়া থাকে। এই প্রসঙ্গে সমাজবিজ্ঞানী ও তথ্যাভিজ্ঞ মহলের অভিমত; কোনো হত্যাকাণ্ডের যথাযথ তদন্ত এবং বিচার না হওয়ার কারণে ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসীরা দিনে দিনে বেপরোয়া হইয়া উঠিয়াছে। বহিরাগতদের উপস্থিতি ও রাজনৈতিক আদর্শহীনতাও এই জন্য কম দায়ী নহে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, কঠোরতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে নিরপেক্ষতার অভাবহেতু হত্যার মত অপরাধেরও প্রতিকার পাওয়া যায় না। এই পরিস্থিতি হইতে আমাদের অবশ্যই বাহির হইয়া আসিতে হইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন