প্রতি বছরের ন্যায় এবারও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্যভুক্ত দেশগুলোতে আজ ০৭ এপ্রিল বিশ্বস্বাস্থ্য দিবস পালিত হচ্ছে। প্রতিবছর এ দিবসের একটি প্রতিপাদ্য বিষয় থাকে। বিশ্বস্বাস্থ্য দিবসে এ বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে vector borne disease, small bites can be a big threat - অর্থাত্ ভেক্টর বাহিত রোগ তথা ডেঙ্গু প্রজাতির বিভিন্ন প্রকার মশা দ্বারা পরিবাহিত রোগ -সামান্য কামড়ে বড় ধরনের বিপদের কারণ হতে পারে। সদস্য দেশ হিসেবে এবং জনগণের কল্যাণে বাংলাদেশেও যথাযথ গুরুত্বসহকারে দিবসটি পালিত হচ্ছে। দিবসের কর্মসূচির মধ্যে সরকারি ও বেসরকারিভাবে র্যালি, আলোচনা সভা, সংবাদপত্রে বিশেষ ক্রোড়পত্রসহ আরো নানা শিক্ষামূলক বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে। এছাড়া, এ বিষয়ে পারদর্শী ব্যক্তিবর্গের মধ্যে মতামত বিনিময় হয়ে থাকে। এর ফলে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি হয়, যা রোগ প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ডেঙ্গু জ্বরের বাহক এডিস মশা পানিতে বংশ বিস্তার করে। বৃষ্টি হওয়ার পর কিংবা বিভিন্ন কারণে কোন জায়গায় যেমন ফুলের টব, ড্রাম, বোতল, ফ্রিজের নিচে, পরিত্যক্ত টায়ারের ভেতরে ও নারকেলের খোলস ইত্যাদি স্থানে পানি ৩-৪ দিন জমে থাকলে সহজেই এডিস মশা বংশ বিস্তার করতে পারে। এ রোগের লক্ষণ হচ্ছে হঠাত্ করে তীব্র জ্বর হওয়া (১০৩ ডিগ্রী ফারেনহাইটের বেশি), কোমর ব্যথা, মাথাব্যথা ও জ্বর সহজে নামে না যা ২-৭ দিন পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। চিকিত্সকদের মতে, সাধারণ বা ক্ল্যাসিকেল ডেঙ্গু জ্বরে ভয়ের কিছু নেই। তবে রক্তবমি, রক্ত পায়খানা, দাঁতের মাড়ি দিয়ে রক্তকরণ, চামড়ার নিচে জমাট রক্ত এবং চোখের নিচে রক্ত জমলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে মর্মে চিকিত্সকবৃন্দ পরামর্শ দিয়ে থাকেন। মেডিসিন বিশেষঞ্জ অধ্যাপক ডা. এইচ এ এম নাজমুল আহসান কর্তৃক অনলাইন সংসকরণ ম্যাগাজিন অনুরণন হতে দেখা যায় যে, এ রোগের চিকিত্সায় জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল সিরাপ, ট্যাবলেট, প্রয়োজন হলে মলদ্বারে সাপোজিটরি দেয়াসহ এবং অবশ্যই চিকিত্সকের প্রেসক্রিপসন অনুযায়ী চিকিত্সা নিতে হবে। প্রচুর পানি পান এবং ওরস্যালাইন এ সময় উপকারী ও ঘরে বানানো ফ্রেশ ফলের রসও উপকারী মর্মে উক্ত তথ্যে দেখা যায়। এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু হয়। এ ভাইরাসের এখনও কোন ভ্যাকসিন না থাকায় রোগ প্রতিরোধ কর্মসূচি যেমন -পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, ডেঙ্গু থেকে নিজেকে রক্ষা করার বিভিন্ন পদক্ষেপ যেমন মশারি টাংগিয়ে বিছানায় যাওয়া, যথাসম্ভব ঢেকে কাপড় পরিধান করা এবং প্রয়োজনে চিকিত্সকবৃন্দের পরামর্শ নিতে হবে। ভেক্টর বাহিত রোগ তথা ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু রোগের কারণে ব্যক্তি, পরিবার, কমিউনিটি বিশেষ করে গরিব জনগোষ্ঠীর জন্য বড় ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়। রোগের কারণে ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুলে অনুপস্থিতি, দরিদ্র দেশগুলোতে দারিদ্র্যের মাত্রা আরো বৃদ্ধি করে এবং তাদের পরিবারে অর্থনীতির ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে। এমনিতে দরিদ্র জনগোষ্ঠী ঠিকমত খেতে পায় না, তদুপরি এ রোগের কারণে তাদের উপর বাড়তি চিকিত্সা খরচ যোগ হওয়ায় পরিস্থিতিকে আরো শোচনীয় করে তোলে। যে সব অঞ্চলে নিরাপদ পানির অপ্রতুলতা বেশি এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বিরাজ করে এবং উষ্ণ অঞ্চলে এ রোগের প্রকোপ বেশি থাকে।
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, ঘাতক ভেক্টর বাহিত রোগ ম্যালেরিয়ার কারণে ২০১০ সালে প্রায় ৬.৬০ লক্ষ লোক প্রাণ হারায় যার বেশির ভাগ ছিল আফ্রিকান শিশু। গত ৫০ বছর যাবত্ সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে ভেক্টর বাহিত রোগ ডেঙ্গু। বর্তমানে অনেক এশিয়ান দেশগুলোতে ডেঙ্গু শিশু মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা গেছে। বিশ্বে প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী ডেঙ্গু রোগের ঝুঁকিতে আছে। ভয়াবহ ডেঙ্গু রোগের কারণে এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে শিশুদের মাঝে তীব্র অসুস্থতাসহ মৃত্যুর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে এ রকম যে ডেঙ্গু/ ভয়াবহ ডেঙ্গুর রোগ নিয়ন্ত্রণে চিকিত্সার চেয়ে প্রতিরোধ ব্যবস্থা উত্তম। শুরুতে রোগ নির্ণয় করা গেলে এবং কার্যকরভাবে ভেক্টর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলে রোগের ভয়াবহতা প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে বিগত দশকগুলোতে সারা বিশ্বে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বের ৩.৫ বিলিয়ন-এর বেশি জনংখ্যার ৪০% ভাগের বেশি জনসংখ্যা ডেঙ্গু ঝুঁকিতে রয়েছে মর্মে জানা গেছে। তথ্যমতে আরো জানা যায় যে, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৫০-১০০মিলিয়ন লোক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে। ১৯৭০ সালের পূর্বে শুধু নয়টি দেশে তীব্র ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বিস্তার করেছিল কিন্তু বর্তমানে আফ্রিকা, আমেরিকা, ইষ্টার্ণ মেডিটেরিয়ান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ ওয়েস্টার্ন প্যাসিফিক অঞ্চলে ১০০-এর বেশি দেশে তীব্র ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বিরাজ করছে।
সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ভেক্টর বাহিত রোগ তথা ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ রোগ প্রতিরোধের লক্ষ্যে এডিস মশা যাতে বংশ বিস্তার করতে না পারে সে বিষয়ে সচেতনতা জরুরি। ফুলের টব, ড্রাম, বোতল, ফ্রিজের নিচে, পরিত্যক্ত টায়ারের ভেতরে ও নারকেলের খোলস ইত্যাদি স্থানে পানি যাতে জমে না থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। এডিস মশার কামড় থেকে রক্ষার্থে মশারি টাংগিয়ে বিছানায় যাওয়া এবং হাত-পা, শরীর যথাসম্ভব ঢেকে রাখতে হবে। গ্রীণ সিটি/গ্রীণ বাংলাদেশ ধারণা বাস্তবায়ন করা এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশের জন্য সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
লেখক :আধূনিক-এর নির্বাহী সচিব
