প্রসঙ্গ :বেকারত্ব হ্রাসের পরিকল্পনা

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০১৪, ২০:৫৭
বিভিন্ন স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের জরিপ, সমীক্ষা ও প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে সম্প্রতি পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে যে, অর্থনীতির নানামাত্রিক বিকাশের ধারা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও দেশের বেকারত্ব পরিস্থিতি এখনো যথেষ্টই নাজুক। এরমধ্যে বিশেষ উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী তরুণদের ক্ষেত্রে। পত্রিকায় প্রকাশিত উল্লিখিত প্রতিবেদনে সাপ্তাহিক ইকোনমিস্ট-এর উদ্ধৃত তথ্যে বলা হচ্ছে যে, বাংলাদেশের ৬৭ শতাংশ স্নাতকই এখন বেকার। আর অন্যান্য পর্যায়ে বিরাজমান বেকারত্বতো রয়েছেই। বাংলাদেশকে এখন অনেকেই বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দেশ হিসেবে অভিহিত করছেন। পশ্চিমের বিভিন্ন পুঁজিবাদী দেশ ও তাদের কর্তৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এ ব্যাপারে অনুরূপ মতামত ব্যক্ত করে চলেছে। অবশ্য শেষোক্তদের মতামত কখনো কখনো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতও হয়ে থাকে, যেমনটি লক্ষ্য করা গেছে ১৯৯০-এর দশকের প্রথমার্ধে বাংলাদেশ থেকে গ্যাস রপ্তানির পক্ষে ওকালতি করতে যেয়ে দেয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের মতামতের ক্ষেত্রে। এরা তখন গ্যাস রপ্তানির পক্ষে সাফাই গাইতে যেয়ে বলেছিল যে, এটি করা হলে ২০০০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ একটি মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। গ্যাস রপ্তানির পক্ষে তত্কালীন সরকার ও বিশেষ করে তখনকার জ্বালানিমন্ত্রীর জোরালো অবস্থান গ্রহণ সত্ত্বেও জনগণের প্রতিবাদের মুখে সেটি আর তখন করা সম্ভব হয়নি। এবং মাত্র এক দশকের ব্যবধানেই লক্ষ্য করা যায় যে, গ্যাস রপ্তানি না করা সত্ত্বেও বাংলাদেশ গ্যাস-ঘাটতির দেশে পরিণত হয়েছে। সে যাহোক, নানাভাবেই এটি এখন স্বীকৃত ধারণা যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে প্রকৃতই দ্রুত গতিতে বিকশিত হচ্ছে (গত ৫ বছরে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার গড়ে ৫.২৭ শতাংশ)। এখন তাহলে স্বভাবই প্রশ্ন আসে যে, অর্থনীতির এই ধারাবাহিক উচ্চতর বিকাশের ধারা অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও একই ধারায় ও হারে বেকারত্ব পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না কেন? বেকারত্ব পরিস্থিতির কারণ অনুসন্ধান ও বেকারত্ব রোধে ভবিষ্যত্ কর্মকৌশল নির্ধারণের লক্ষ্যে এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট ও আশু জবাব পাওয়াটা খুবই জরুরি। আর সে প্রশ্নের জবাব অনুসন্ধান করতে যেয়ে বেকারত্ব হ্রাসের লক্ষ্যে রাষ্ট্রের যে উন্নয়ন পরিকল্পনা বর্তমানে চালু আছে, তার উদ্দেশ্যের সততা নিয়ে কোনোরূপ প্রশ্ন উত্থাপন না করেও এ ব্যাপারে ইতিবাচক অভিপ্রায় থেকে বলা প্রয়োজন যে, এ ক্ষেত্রে বেশকিছু বড় মাপের দুর্বলতাও রয়েছে। আর সে অন্তর্গত দুর্বলতাসমূহকে কাটিয়ে ওঠতে না পারলে এ ক্ষেত্রে যত কর্মসূচিই গ্রহণ করা হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত তা এ খাতের প্রকারান্তরিক লক্ষ্য অর্জনে কতোটা টেকসই সাফল্য এনে দিতে সক্ষম হবে, সে ব্যাপারে প্রশ্ন থেকেই যাবে। অতএব দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব মোকাবেলার লক্ষ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিভঙ্গি (অ্যাপ্রোচ) নিয়ে এগুবার স্বার্থেই এ ক্ষেত্রে অনুসৃত পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বিরাজমান কিছু কিছু দুর্বলতার প্রসঙ্গ এখানে তুলে ধরা হলো। দেশে বিরাজমান কর্মসংস্থান পরিস্থিতির উন্নয়নকল্পে উপস্থাপিত এ বিষয়গুলোর আলোকে রাষ্ট্রের বেকারত্ব হ্রাস পরিকল্পনার প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রসমূহ সংশোধন ও পুনর্বিন্যাস করলে এ ক্ষেত্রে সুফল পাওয়া যেতে পারে বলে মনে করি। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, দেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি এখন চরম হুমকির মুখে। স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৮০-এর দশকের শেষ পর্যন্ত দেশে জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেতে পেতে এক পর্যায়ে তা ১.২ শতাংশে নেমে আসলেও পরবর্তীতে তা আবার ঊর্ধ্বমুখী হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশে পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ ২০১২-১৩ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী জনসংখ্যা বৃদ্ধির এ হার হচ্ছে ১.৩৭ শতাংশ। ১৯৭০-এর দশকের গোড়ার তুলনায় জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এক পর্যায়ে ১.২ শতাংশে নেমে আসা নিঃসন্দেহে একটি বড় অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এটিকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কিন্তু বিশ্বের সর্বাধিক জনঘনত্বপূর্ণ এ দেশের জন্য এ অগ্রগতি মোটেও সন্তোষজনক নয়। কারণ ১.২ শতাংশ হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া মানে হচ্ছে ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার হিসাব অনুযায়ী বছরে দেশে ন্যূনপক্ষে ১৮ লক্ষ লোক বেড়ে যাওয়া, যা সামাল দেয়ার সামর্থ্য বাংলাদেশের নেই বললেই চলে। এ অবস্থায় উচিত ছিল জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাসের ক্ষেত্রে অর্জিত অগ্রগতিকে যেভাবেই হোক আরো সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা। এ পরিস্থিতিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার আগামী এক-দেড় দশকের মধ্যে কিভাবে শূন্য শতাংশে বা তার কাছাকাছি পর্যায়ে নামিয়ে আনা যাবে, সে ব্যাপারে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে নয়া কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে নানা কর্মসূচি গ্রহণ যেমনি জরুরি, তেমনি জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনাটা তারচেয়েও বেশি জরুরি। আর সত্যি কথা বলতে কি, এটি দুর্যোগকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলার মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিপুল জনসংখ্যাধিক্যের এ দেশে এ দুর্যোগ আমাদের প্রায় সকল উন্নয়ন প্রচেষ্টকেই ম্লান করে দিচ্ছে। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে যে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ১৯৮০-এর দশক জুড়ে যে ধারার অগ্রগতি সাধিত হয়েছে, পরবর্তীতে এসে তাতে কেন ভাটা পড়লো। মাঠ পর্যায়ে পরিবার কল্যাণ সহকারী থাকবে কি থাকবে না—স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এতদ্সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের দ্বন্দ্ব এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে জানা যায়। তবে শুধু এটি নয়, এ খাতের সামগ্রিক নীতি-পরিকল্পনা ও কর্মসূচি-কৌশলের মধ্যেও এমন কিছু ত্রুটি ও দুর্বলতা রয়েছে যা সংশোধন করা প্রয়োজন যাতে আগের ধারাবাহিকতা খুঁজে পাওয়া যায় এবং ২০২১ সালকে লক্ষ্য রেখে প্রণীত সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা-কাঠামোর আওতায় বর্ধিত বরাদ্দ সংস্থান ও ব্যাপকভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ এ উভয়বিধ বিবেচনা থেকেই তা যেন সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার তালিকায় থাকে। উল্লেখ্য যে, দেশে বর্তমানে যেসব কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলোর সংখ্যা ও মান কোনোটাই সন্তোষজনক পর্যায়ের নয়। ফলে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বৃদ্ধির পাশাপাশি এগুলোর মানের দিকেও পর্যাপ্ত দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের আওতায় স্থানীয় ও বৈদেশিক বাজারের চাহিদার সাথে সঙ্গতি রেখে নতুন নতুন ট্রেড অন্তর্ভুক্ত করা যেমনি জরুরি, তেমনি বিদ্যমান ট্রেডসমূহের পাঠ্যক্রমেরও আধুনিকায়ন প্রয়োজন। দেশের নতুন শিক্ষানীতিতে কারিগরি শিক্ষার এই দিকটিকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হলেও এ ক্ষেত্রে বাস্তব অগ্রগতি তেমন একটা নেই বললেই চলে। ফলে দেশের বেকারত্ব হ্রাস কর্মসূচির ক্ষেত্রে সহসাই কোনো কার্যকর অগ্রগতি সাধন করতে চাইলে এ জায়গাটিতে গুরুত্ব দেয়ার কোনোই বিকল্প নেই। অথচ ভর্তি হবার কিংবা অধিত বিষয় অধ্যয়ন ও আত্মস্থকরণের আদৌ কোনো যোগ্যতা থাক বা না থাক, ওঠতি বিত্তবানের ওই নাদুস সন্তানদের জন্য তথাকথিত বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ডিগ্রি থাকা চাই-ই! এ দৃষ্টিভঙ্গির দ্রুত পরিবর্তন ঘটাতে না পারলে এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু বেকারত্বজনিত অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না-সামাজিক প্রকরণের ক্ষেত্রেও তা নতুনতর জটিল পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে, যার মূলে থাকবে বস্তুতঃ মানহীন উচ্চশিক্ষা সনদধারীদের অযোগ্যতার সমস্যা। বর্ধিত ও নয়া কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিঃসন্দেহে দেশের জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম অগ্রাধিকার। কিন্তু মনে রাখা দরকার যে, এ কর্মসংস্থান সৃষ্টির চিন্তা যেন কোনোভাবেই উত্পাদনশীলতাকে ব্যাহত করে না হয়। কারণ, বর্তমানের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে বা এগুতে হলে উত্পাদনশীলতার সর্বোচ্চ কাম্য স্তর বজায় রেখে চলার কোনোই বিকল্প নেই। এখন থেকে দু’-আড়াই দশক আগে এমন একটা সময় ছিল যখন যেনতেন প্রকারে হলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়টিই অগ্রাধিকার পেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখন সে সময় পেরিয়ে এসেছে। দেশে এখন বহুসংখ্যক মানুষ বেকার থাকা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক বিকাশের এমন একটি স্তরে আমরা পৌঁছে গেছি যে, সেখান থেকে শুধু কর্মসৃষ্টির কথা ভাবলেই চলবে না-নতুন সে কর্মদ্বারা সৃষ্ট পণ্য বা সেবা বিশ্ববাজারের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সক্ষম কিনা, সেটিও দেখতে হবে। আর এটি শুধু নতুন শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে নয়-নতুন সেবা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা কিংবা নতুন কৃষিখামার গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তা সমানভাবে প্রযোজ্য। লেখক :পরিচালক, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন