প্রকৃতির নিয়মেই সময় বদলায়, পরিবর্তন ঘটে জীবনবোধের। নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রেও পরিবর্তিত জীবনবোধের প্রকাশ ঘটিবে ইহাই স্বাভাবিক। অতীতের রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গি বর্তমানকালে লক্ষ্য করা যায় না বলিলেই চলে। তথ্য প্রযুক্তির সহজলভ্যতার দরুন আজকের পৃথিবী মানুষের একরকম হাতের মুঠোয়। পৃথিবীর এক প্রান্তে মানুষ যাহা ভাবে মুহূর্তেই তাহা অন্য প্রান্তে পৌঁছিয়া যায়। ফলে ইহার প্রভাবে পাল্টাইয়া যাইতেছে জীবনাচরণ ও মানবিক মূল্যবোধ। কয়েক দশক আগেও সমাজে নারী পুরুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘আড়াল-আবডাল’ বলিয়া যে ব্যাপারটি ছিল তাহা এখন অনেকক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। উপমহাদেশ বা প্রাচ্যের অনেক রক্ষণশীল দেশেই প্রথাগত সম্পর্ক স্থাপনের বাহিরে নারী-পুরুষে একসাথে বসবাস করিবার উদাহরণ একালে বিরলদৃষ্ট নহে। কিন্তু অকল্পনীয় হইলেও সত্য যে, অনেক ক্ষেত্রেই সঙ্গী তাহার একান্ত মানুষটিকে চিনিতে বা বুঝিতে পারিতেছে না। নারী কিংবা পুরুষ উভয় ক্ষেত্রেই কম বেশি এই বিভ্রম ঘটিয়া থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হইলো পরস্পরকে বুঝিতে না পারিবার যে ব্যর্থতা ইহাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যাইতে পারে? ইহাকি নেহায়েত আবেগের আতিশয্য ও বাড়াবাড়ি রকমের ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবোধের কারণেই ঘটে? কিন্তু মানুষের জীবনতো খেলার বস্তু নহে যে, খেলা শেষে উহা ছুঁড়িয়া ফেলা হইবে। একজন তরুণ যখন তাহার ক্যারিয়ার পরিকল্পনা করে তখন তাহাকে নিজের ঝোঁক, যোগ্যতা, সক্ষমতা সর্বোপরি বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখিতে হয়। যেই ক্ষেত্রে তাহার সফলতার সম্ভাবনা অপেক্ষাকৃত অধিক, পেশা হিসাবে তিনি তাহাই বাছিয়া নেন অথবা নিতে চাহেন। দুইজন মানুষের—নারী ও পুরুষের সংসার পাতিবার বিষয়টি ক্যারিয়ার প্ল্যানিংয়ের চাইতে কোনো অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। তাহাসত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, জীবনসাথী চিনিয়া লইবার ক্ষেত্রে ঠিক সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয় না। পরিণামে দেখা দেয় বিপর্যয়। পরম বন্ধু পরম শত্রু হইয়া যায়। সম্পর্কের জটিল আবর্তের মধ্যে পড়িয়া জীবন বিপন্ন হওয়াও বিচিত্র নহে। এই ক্ষেত্রে মেয়েরাই যে বেশি ভিকটিম হইয়া থাকে তাহা চোখে আঙ্গুল দিয়া দেখাইবার প্রয়োজন পড়ে না।
সঠিক বিবেচনা ব্যতীত একবিংশ শতাব্দীর কোনো তরুণীর কোন সম্পর্কে জড়াইয়া যাওয়া মোটেও স্বাভাবিক নহে। যদি শতাব্দীকাল আগে ঘটিতো তাহা মানিয়া লওয়া যাইত; কেননা তখন ছেলেটি বা মেয়েটি সাংসারিক জীবনে সঙ্গী নির্ধারণের ক্ষেত্রে পরিবারের সিদ্ধান্তকেই মানিয়া লইত অবনত মস্তকে। কেউ কেউ ব্যক্তিগত সম্পর্কে জড়াইয়া গেলেও পারস্পরিক যোগাযোগের সুযোগ ছিল অপ্রতুল। কিন্তু এই যুগে যোগাযোগ ব্যবস্থায় যেই উন্নতি সাধিত হইয়াছে তাহাতে একে অপরকে সম্পর্ক গড়িবার আগেই জানিবার-বুঝিবার সুযোগ রহিয়াছে। জীবনসঙ্গী বাছিয়া লইবার স্বাধীনতা এখন মৌলিক মানবাধিকারের অংশও বটে। পরিবারও এই বিষয়ে আগের তুলনায় বেশ সচেতন হইয়া উঠিয়াছে। তাহা হইলে জীবনসঙ্গী হিসাবে পছন্দনীয় মানুষটিকে বুঝিবার ক্ষেত্রে ভুল হওয়া সত্যিকারার্থেই অপ্রত্যাশিত। এইক্ষেত্রে কৃত ভুলের কারণে জীবন দুর্বিষহ হইয়া উঠিতে পারে। ঘটিতে পারে নানান অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। গণমাধ্যমে প্রতিনিয়ত হত্যাকাণ্ডসহ সংঘটিত নানান অপরাধের খবরই তাহার প্রমাণ।
আসলে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগেই প্রয়োজন গভীর অনুধ্যান। একান্ত নিজের যে জীবন সেইখানে আরেকজনকে সঙ্গী করিয়া লইতে, সম্পর্কের সুতোয় কাহাকেও বাঁধিবার আগে জানিয়া-বুঝিয়া লওয়া একান্ত কর্তব্য। তাহা না হইলে জীবনের পথ কণ্টকাকীর্ণ হওয়া অসম্ভব কিছু নহে। সমাজ কিংবা আইন সব সময় সকল বিপদ ও বিপর্যয় হইতে মানুষকে রক্ষা করিতে পারে না। নিজের নিরাপত্তা বলয় নিজেকেই তৈয়ার করিয়া লইতে হয়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতার সহিত ইহার তুলনা চলে। জগতের সকল ধূলি মলিনতা ঢাকিয়া দেওয়া অসম্ভব। জুতা পরিয়া নিজের পা রক্ষা করিতে হইবে মলিনতা হইতে। ধূলার ন্যায় নানান বিপত্তি হইতে রক্ষা পাইতে প্রয়োজন সচেতনতা। ব্যক্তিগত চিন্তা ও সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে পারিবারিক শিক্ষা ও সংস্কৃতি, গভীর অন্তর্দৃষ্টির বিকল্প নাই।
