অগ্নি দুর্ঘটনা ও সচেতনতা

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০১৪, ২০:৫৫
আগুন হইল সেই শক্তি, যাহার নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার মানব জীবনকে সহজতর ও সুন্দর করে। বিপরীতে, এই আগুনই অনিয়ন্ত্রিত হইয়া গেলে সমূহ সর্বনাশ। তাহার লেলিহান শিখা গ্রাস করে জগতের সুন্দর-অসুন্দর, ভালো-মন্দ—সকল কিছু। সভ্যতা সৃষ্টিতেও মূল অনুষঙ্গ আগুন, ধ্বংসেও আগুন। সুতরাং আগুনকে যাহাতে শুধু সৃষ্টি বা কল্যাণকর কাজেই ব্যাপৃত রাখা যায়, সেই সচেতনতার বিকল্প নাই। কিন্তু আমরা কি ততোখানি সচেতন? দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ডের যেই সমস্ত সংবাদ পাওয়া যায়, তাহার সকল ঘটনাই হয়তো অসচেতনতার জন্য ঘটে না। কিন্তু এমন অসংখ্য অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা সারা বত্সরই শোনা যায়, যাহার মূল কারণ অসচেতনতা ও অসাবধানতা। গার্মেন্টস শিল্পকারখানা কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের বৃহত্ ভবনসমূহে অগ্নিনির্বাপণের যাবতীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রেই আগুনের সূত্রপাত ঘটে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির শর্ট সার্কিটে। কোনো ভবনে বা কারখানায় যদি দাহ্যজাতীয় পদার্থেরও আধিক্য থাকে, তবে কঠোরভাবে নিয়মনীতি অনুসরণ করা হইলে অগ্নি দুর্ঘটনার আশঙ্কা নাই বলিলেই চলে। আমাদের দেশে যেই পরিমাণ অগ্নি দুর্ঘটনা ঘটে, তাহার অধিকাংশই ঘটে অগ্নি দুর্ঘটনার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করিয়া রাখিবার কারণে। তিন দিন পূর্বে নীলফামারী সদর উপজেলার চড়াইখোলা ইউনিয়নের হুগলিপাড়ায় যেই অগ্নিকাণ্ড ঘটিয়াছে, তাহার কারণ দাহ্যপদার্থবেষ্টিত পরিবেশে বসবাস। এই কারণে সেইখানে ৩৪ পরিবারের ১১৪টি টিনের ও খড়ের ঘর ভস্মীভূত হইয়াছে মারাত্মকভাবে। ইহার কয়েকদিন পূর্বে বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার বিস্ফোরিত হইয়া আগুনের সূত্রপাত ঘটে রাজধানীর এলিফেন্ট রোডের একটি কম্পিউটার মার্কেটের নবম তলায়। একই সময়ে অগ্নিকাণ্ড ঘটে মতিঝিলে একটি বেসরকারি ব্যাংকে। মার্চের শেষার্ধে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে জাতীয় জাদুঘরের চতুর্থ তলায়। এই সকল ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ গোলযোগকে দায়ী করা হয়, তাহা হইল—বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট। সারা বত্সর ধরিয়াই দুর্ঘটনার এই পরিসংখ্যানের গ্রাফ ঢেউয়ের মতো অল্পবিস্তর উঠা-নামা করে, কিন্তু স্তিমিত হয় না। নাগরিক জীবনে অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহতা ও ভিকটিম হিসাবে আমাদের অসহায়তার অন্ত নাই। কিন্তু ‘অসহায়তা’ থাকা এই কারণে উচিত নহে যে, যথাযথভাবে পূর্ব সতর্কতা অবলম্বন করিলে এবং নিজেরা সচেতন থাকিলে খুব সহজেই ভয়াবহ অগ্নি দুর্ঘটনা হইতে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। গ্রামে-গঞ্জে বা ছোটখাটো শহরে কোথাও আগুন লাগিলে চকিতে ত্বরিতে বাহিরের খোলা জায়গায় চলিয়া আসিয়া প্রাণ বাঁচানোর ছোট্ট সুযোগটুকু অনেক সময় পাওয়া যায়। কিন্তু খাঁচাবদ্ধ নাগরিক জীবনে সেই সুযোগটুকুও সুদূরপরাহত। তাই আগুন হইতে রক্ষা পাইতে সম্ভাব্য অগ্নিকাণ্ডের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও সচেতনতা সৃষ্টি অপরিহার্য বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। কী কী কারণে অগ্নিকাণ্ড ঘটে তাহা যেমন জানা প্রয়োজন, তেমনি আগুনের ধর্ম, উত্স, স্বভাব ও অনুঘটকসমূহ কী কী এবং আগুনের আগ্রাসী অবস্থায় পৌঁছাইবার পূর্বেই প্রাথমিক অবস্থায় কীভাবে আগুনকে নিয়ন্ত্রণে লইয়া আসা যায়, তাহা অন্তত প্রত্যেক নাগরিকেরই জানিয়া রাখা অবশ্য কর্তব্য। ইহাও মনে রাখিতে হইবে যে, কেহ নিজে যত সচেতনই হউন, তাহার পাশের ব্যক্তিটির অসচেতনতার কারণেও সকলে অগ্নি দুর্ঘটনার শিকার হইতে পারেন। তাই শুধু নিজে সচেতন হইলেই কাজ শেষ হয় না, অন্যকে সচেতন করাও আমাদের সকলের নাগরিক দায়িত্ব বটে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন