দূরের জানালা

নায়াগ্রা জলপ্রপাত ও পানির সৌন্দর্য

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০১৪, ২০:৫৬
প্রথম ভালোলাগাটা নাকি বেশ মনে থাকে। যেমন মনে থাকে প্রথম প্রেম। কথায় আছে—Love at first sight। আমেরিকায় এসে আমার প্রথম ভাললাগাটার নাম হল- নায়াগ্রা জলপ্রপাত দেখা। বাংলাদেশে থাকতে নায়াগ্রা জলপ্রপাত নিয়ে একটি প্রামাণ্য চিত্র জীবনে প্রথম দেখেছিলাম বিটিভির মাধ্যমে। “ইত্যাদি” নামক একটি ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানে। যতদূর মনে পড়ে ১৯৮৮-৮৯ সালের দিকে আমার প্রিয় ও অতি জনপ্রিয় উপস্থাপক “হানিফ সংকেত” সেই প্রামাণ্য চিত্রটি অত্যন্ত সাবলীলভাবে দর্শকদের নিকট “ইত্যাদি” অনুষ্ঠানে দেখিয়েছিলেন। তারপর অনেক সময় অতিবাহিত হয়েছে। আমার মনের মধ্যে সশরীরে নায়াগ্রা ফলস দেখার আকাঙ্ক্ষা ও তীব্রতা অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০০৩ সালের কথা। তখন মেরিল্যান্ড স্টেটের বালটিমোর শহরে এসেছি। ওয়াশিংটন ডি সি’র খুব কাছের শহর বালটিমোর। মাত্র ৪০ মিনিটের ড্রাইভ। আর বালটিমোর থেকে নায়াগ্রা ফলস যাত্রাও খুব বেশি দূরে নয়- ড্রাইভ করে মাত্র ৭-৮ ঘণ্টার পথ-আইডিয়াটা মন্দ না। নায়াগ্রা ফলস দেখার স্বপ্নটা এবার বাস্তবে রূপ দিতে হবে। সারাদিন ৭-৮ ঘণ্টার যাত্রা শেষে পৌঁছালাম আমরা অবশেষে নায়াগ্রাতে। কি যে সেই সৌন্দর্য! পানির সৌন্দর্য! নায়াগ্রা জলপ্রপাতের সৌন্দর্য! পানির সার্বক্ষণিক কল কল শব্দের এক অবর্ণনীয় সৌন্দর্য! পানি আসছে তো আসছেই। পড়ছে তো পড়ছেই। আমেরিকার দিক থেকে কানাডার দিকে বিরতিহীন সেই ফলস-যার নাম নায়াগ্রা ফলস। কোথা থেকে এতো পানি বিরামহীনভাবে ছুটে আসছে ও গড়িয়ে পড়ছে কানাডা অভিমুখে- আমার এই ছোট্ট মাথায় তা কিছুতেই ঢুকছে না। এবার রাতের দৃশ্য দেখার পালা। কেমন লাগে দেখতে রাতে নায়াগ্রা ফলসকে? সেই দৃশ্য দেখতেই হবে। ছবি তুলতে হবে। অনেক ছবি। জীবনে যদি আর কোনোদিন এখানে আসতে না পারি- সে সব কথা মাথায় রেখে ক্যামেরার ফ্ল্যাশ পড়ছে তো পড়ছেই। এবার মোটেলে রাত্রি যাপন। তার আগে গাড়ি নিয়ে নায়াগ্রা শহরটি একটু ঘুরে দেখা। ২০-২৫ মিনিটেই শহর ঘুরে দেখা শেষ হয়ে গেল। কারণ, তেমন কিছুই দেখার মতো মনে হল না এখানে নায়াগ্রা ফলস ছাড়া। শুধু হোটেল, মোটেল আর রেস্তোরাঁ। অর্থাত্ নায়াগ্রা ফলসের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কাছে অন্য সব সৌন্দর্যই যেন ম্রিয়মাণ এখানে। পরদিন আবার আমরা বেরুলাম নায়াগ্রা ফলস অভিমুখে। মোটেল থেকে মাত্র দশ পনেরো মিনিটের পথ। আমাদের ব্যাড লাক। এদিন বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি একটু হচ্ছে আবার একটু পরেই থেমে যাচ্ছে। আবার রোদও উঠছে। রোদ ও বৃষ্টির খেলা একসঙ্গে চলছে। আমাদের কারো আমেরিকার গ্রিনকার্ড ছিল না তখন। শুধু ভিসা আছে। তাই কানাডার দিকে যেতে পারছি না আমরা। কানাডা থেকে নায়াগ্রা ফলসের সৌন্দর্য দেখতে অপূর্ব লাগে—তা আগে থেকেই শুনেছি লোকমুখে। এই দুঃখ কোথায় রাখি। কানাডা যেতে পারছি না তাতে কি আছে? ওয়াটার ট্যাক্সি আছে। টাকা থাকলে বাঘের দুধও মেলে। আমরা সবাই ওয়াটার ট্যাক্সির টিকেট কাটলাম। ওয়াটার ট্যাক্সিতে করে বিশেষ ধরনের ওয়াটার প্রুফ জ্যাকেট পরে ফলস ঘুরে দেখতে শুরু করলাম। এ কি পানির কল কল বিরতিহীন শব্দ! ট্যাক্সি থেকে আমরা পুরো ফলসটি ট্যুর দিলাম। তারপরেও মনের ভিতরে ছোট্ট একটা কষ্ট ও অতৃপ্তি রয়েই গেল। তা হচ্ছে—কানাডার মাটিতে পা দিয়ে তো আর নায়াগ্রার নয়নাভিরাম সৌন্দর্য পুরোপুরি উপভোগ করা গেল না। ঠিক সাত বছর পর অর্থাত্ ২০১০ সালে স্ব-পরিবারে আবার দেখতে গেলাম প্রিয় নায়াগ্রা ফলসকে। গ্রিনকার্ড থাকার কারণে আমাদের কানাডাতে প্রবেশে আর কোনো বাধা ছিল না এবার। তাই কানাডার নায়াগ্রা সিটিতেই হোটেল নিলাম আমরা। মূল উদ্দেশ্য, কানাডার সাইট থেকে রাতের নায়াগ্রা ফলসের মনোরম ও দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য উপভোগ করার। রাতের আর্টিফিশিয়াল লাল-নীল ও নানা রঙের আলোর বিচ্ছুরণ ও ফায়ারওয়ার্কের (আতশবাজি) সংমিশ্রণ যখন আপতিত হচ্ছিল বিশাল উচ্চতা থেকে পতিত নায়াগ্রার পানির উপরে, নয়নাভিরাম দৃষ্টি সৌন্দর্য এতোটাই বিচ্ছুরিত হচ্ছিল যে- কেবলই মনে পড়ছিল “Stevie Wonder” এর অতি পরিচিত সেই গানটির কথা- ‘I just called to say I love you”। লেখক :ওহাইও স্টেটে একটি ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন