[ আ ন্ত র্জা তি ক ]

ভারতে নির্বাচন ও আমাদের প্রত্যাশা

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৩৫
বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে লোকসভা নির্বাচন শুরু হয়েছে। নানা কারণে এ নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবেই শুধু নয়, এখনকার একমুখী বিশ্বের আর্থ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ভৌগোলিক-রাজনৈতিক বিবেচনায়ও তা গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের নীতি-নির্ধারণী সরকার এখন কেমন হবে, কোন ভাবনা-চিন্তায় তার উন্মোচন ঘটবে—তা এখন অনেকেরই আগ্রহের বিষয়। ৩৫টি প্রদেশ ও ইউনিয়ন টেরিটোরিতে ৯ ধাপে এ ভোটগ্রহণ শেষ হবে ১২ মে, আর ফল প্রকাশ হবে ১৬ মে। ৫৪৩ আসনের ষোড়শ লোকসভা নির্বাচন এটি। ভারতের ভোটার তালিকায় ইতিমধ্যেই সংযুক্ত হয়েছে ১০ কোটি নতুন ভোটার। যাদের অর্ধেকই অনূর্ধ্ব ২৫ বছর বয়সী তরুণ। ছয় সপ্তাহ ধরে ৮১ কোটি ৪০ লাখ ভোটার এ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এবার কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ (সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চা)র সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লালুপ্রসাদ যাদবের রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) এবং শারদ পাওয়ারের ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টি (এনসিপি)। অন্যদিকে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপি (ভারতীয় জনতা পার্টি)র নেতৃত্বাধীন এনডিএ (জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চা)তে রয়েছে লোকজনশক্তি পার্টি (এলজেপি), তেলেগু দেশম পার্টি (টিডিপি) ও শিবসেনাসহ ২২টি দল আছে। এ ছাড়া নির্বাচনী দৌড়ে বেশ সজাগ ১৪টি বামপন্থী ও সমমনা দল নিয়ে গঠিত ‘থার্ডফ্রন্ট’। আর সমপ্রতি দিল্লির রাজ্য সরকারে ভাগ বসানো আম আদমি পার্টি (এএপি)ও এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, যদিও এ নির্বাচনে তার গুরুত্ব তেমন নেই। তবে অধিকাংশ জনমত জরিপে এবার কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ-র অবস্থা তেমন আশানুরূপ মনে হচ্ছে না। বিপরীতে হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএর দিকে ঝুঁকে পড়েছে ভোটাররা। এটা কার্যত ভারতের তরুণ সমাজের প্রতিক্রিয়া বলে মনে হচ্ছে। টানা দশবছরে কংগ্রেস বা গান্ধী পরিবারের শাসনের পালাবদলে চাচ্ছে তারা। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে ফল প্রকাশের পর। কারণ, মিডিয়া বা জনমত জরিপ সব সময় সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করতে পারে না। একটা নির্ধারিত সময়ে জনগণের আবেগ আর অনুভূতির প্রকাশও সেখানে থাকে। তবে যাই হোক, কংগ্রেস দলটির দেশ পরিচালনার ব্যর্থতা বা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এমন বিরূপতার কারণ বলে মনে হয়। কিন্তু সামগ্রিক পরিবর্তনটি তরুণ সমাজের হাতেই ঘটবে, এটা নিশ্চিত। এবং তারাই আসলে নির্বাচন করবেন দেশের ১৪তম প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, রাহুল না মোদি! ইতিমধ্যেই মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ হয়ে গেছে আসামে-ত্রিপুরায়। ছয়টি আসনে হয়েছে এ ভোটগ্রহণ। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী উলফার চারণভূমি আসামের ভোট নিয়ে অনেকটা আশঙ্কা থাকলেও তা মোটামুটি নিরাপদেই সম্পন্ন হয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতে বিজেপি জোট ভালো ফল করার লক্ষ্যে অধিক প্রচারণা চালিয়েছে। হেভিওয়েট নরেন্দ্র মোদি মাসব্যাপী ত্রিপুরা-আসাম-মেঘালয়-অরুণাচলে জনসভা করেছেন। ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করেছেন। অবশ্য বিপরীতে রাহুল-সোনিয়াও কম ছিলেন না। তারা জনসভা করে তাদের নিজস্ব ভোটব্যাংকে প্রেরণা যুুগিয়েছেন। এখন ফলাফল কী হয় সেটাই দেখার বিষয়। ভারতের গণতন্ত্রে নির্বাচনকেন্দ্রিক একটি সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। বৃটিশ শাসনের পর এই উপমহাদেশে ভারত একক ও বৃহত্ রাষ্ট্র হিসেবে সুষ্ঠু গণতন্ত্র-চর্চার দৃষ্টান্ত ইতিমধ্যেই তৈরি করেছে। এটা স্বীকার্য, গোটা বিশ্বে ভারত এখন বৃহত্ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। রাজনৈতিক দল ও রাজনীতির চর্চায় দেশটি অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ থেকে অনেক এগিয়ে। জাতি-রাষ্ট্র-জাতীয়তাবাদী চিন্তায় ইতিমধ্যেই তারা অনেক অগ্রসর হয়েছে। মারামারি, হানাহানি থাকলেও তা রাষ্ট্রের আইন ও শাসন দ্বারা অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। নির্বাচন কমিশন এবং ক্ষমতাসীন সরকার সেখানে সম্পূরক হিসেবে কাজ করে। যা হোক, ভারতে জিঙ্গোইজমের নানারকম ব্যাপারও আছে, পরস্পরের ভেতরে। সোনিয়াকে নিয়ে, রাহুলকে নিয়ে, মোদির সামপ্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে তীব্র কটাক্ষ ও ব্যঙ্গ থাকলেও—সেটি নিছক নির্বাচনেরই অংশ মনে করেন অনেকেই। যেমন, মিডিয়ায় এসেছে মোদিকে কেউ থ্যাচারের মতো দেখতে চায়, কেউ বলছে মোদি বিভেদ সৃষ্টিকারী আবার কেউ বলছে সোনিয়াকে রাহুলসহ ইতালি পাঠিয়ে দেয়া হবে ইত্যাদি। সমর্থকদের মধ্যেও নানারকম গুজব, উত্তেজনা আছে। তাতে ব্যক্তিগত আক্রমণেরও শিকার হন কেউ কেউ। এদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতার অবস্থান ও সমর্থন নিয়েও পত্র-পত্রিকায় খবর কম হচ্ছে না। আর জয়ললিতা, সুষমা স্বরাজের মতো নেত্রীরাও এ নির্বাচনে স্ব স্ব অবস্থানে বেশ সক্রিয়। গোটা ভারতজুড়ে যখন এমন নির্বাচনী উত্সব চলছে, চলছে যখন নানা নির্বাচনী হিসেব-নিকেশ তখন আন্তঃদেশীয় বা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এর পর্যবেক্ষণ কেমন? প্রতিবেশী দেশগুলোর ভাবনা কেমন? আঞ্চলিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর কর্ম-নির্ধারণ এখন কী হবে! এমন নানা প্রশ্ন আছে অনেকের মনে। চলতি নির্বাচনকে ঘিরেই এসব প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এ অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলোর কর্মপদ্ধতি, আর্থনীতিক উন্নয়নও লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকিয়ে আছে। যা নির্বাচনের গুরুত্বকে বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকগুণ। বিশেষ করে টানা দশ বছরের কংগ্রেস জোটের শাসন অবসানের যে ইঙ্গিত ভোটাররা দিতে যাচ্ছেন (পত্রিকা মতে) তাতে বিভিন্ন দেশের ভবিষ্যত্ পারস্পরিক সম্পর্ক বা পরা-বিশ্বে আঞ্চলিক শক্তি অর্জনের কর্মপন্থা, উপমহাদেশের ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার নতুন সীমারেখা ইত্যাদি বিষয়ে জনমনে নানা ব্যাখ্যা তৈরি হচ্ছে। এছাড়া আরও আছে ভারতের মতো বিশাল দেশে বিভিন্ন জাতি-সমপ্রদায়-শ্রেণিগত স্বার্থ ও আবেগের টানাপড়েন, টেক-বিশ্বে ভারতের ঊর্ধ্বমুখী সমপ্রসারণের অধিক গতি সঞ্চার করা, বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী-জঙ্গিবাদ বা দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় সামনের পাঁচ বছরের কর্মপন্থা কী কেমন প্রভৃতি বিষয় কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ-পাকিস্তান-ভুটান-নেপাল-মিয়ানমার কিংবা বৃহত্ শক্তি চীনের দাপট, বিভিন্ন সীমান্ত বিরোধ সমস্যার নিষ্পত্তি বিশেষ করে সন্ত্রাসবাদের বিস্তার রোধ, উেক্ষপণ শক্তির পরিকল্পনা—এমন নানা পদক্ষেপ নিয়ে নতুন সরকার কী করতে চায়—তা এ অঞ্চলে কতোটা উপযোগী, সহনশীল হবে এমন বিষয়ে ব্যাপক আগ্রহের জন্ম দিয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি-খাদ্য নিরাপত্তা, আমদানি-রপ্তানি পণ্য নিয়েও এক দেশ অন্য দেশ সম্পর্ক যেন প্রহর গুণছে। এমনটা নিশ্চিত যে, বিশ্ব এখন সামনের দিকে এগুচ্ছে, নিশ্চয়ই বৃহত্ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার নিরিখেই নির্ধারণ করবেন তাদের যোগ্য নীতিনির্ধারক। কিন্তু, জঙ্গি ও সন্ত্রাস নির্মূলের কোনো বিকল্প আছে কী? সন্ত্রাস উসেক দিয়ে, হানাহানিকে প্রশ্রয় দিয়ে কেউ সম্মুখে এগুতে পারবে কী? অবশ্যই না। প্রযুক্তির বিশ্বে ভারত অনেকদূর এগিয়েছে। ভারতের মতো বড় দেশ ও তার প্রযুক্তি বাণিজ্য সমপ্রসারণের নিরিখে অন্যান্য আঞ্চলিক দেশগুলোতেও গৃহীত হয়েছে। চীন বা ভারতের অনেক কাঁচামাল প্রযুক্তিগত উত্পাদন ও সমপ্রসারণে আয়তনে ছোট, দরিদ্র দেশগুলোতে বিরাট ভূমিকা রাখছে। সুতরাং ‘দাদাগিরি’সুলভ নয়, সহযোগিতামূলক মনোভাব নিয়ে, সকলকে সঙ্গে নিয়ে এগুনোর চেষ্টা করতে হবে ভারতকে। সে নীতির কোনো বিকল্প এই মুহূর্তে নেই। একই নীতিতে তাদের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাস নির্মূলে নিতে হবে যোগ্য ভূমিকা। সেখানে একচক্ষু নীতি গ্রহণযোগ্য নয়। অবশ্যই দেশে দেশে জাতীয়তার রাজনীতি থাকবে কিন্তু জাতিতে-ধর্মে-বর্ণে বিভেদ নয়, সকলকেই ব্যাস্টিক চিন্তার ভেতর দিয়েই সামষ্টিক চিন্তায় অগ্রসর হতে হবে। উগ্র কোনোকিছুই কাম্য নয়। দশবছর কংগ্রেস শাসন করেছে, চলমান নির্বাচনের ভেতর দিয়ে তারা ক্ষমতায় ফিরলেও এ বিষয়গুলোর প্রতিই তাদের সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে। মানুষের উন্নতি ও সন্ত্রাসমুক্ত বিশ্বের জন্য ভারতের অনেককিছু করার আছে। আর এ উপমহাদেশের মানুষ হিসেবে আমাদের সে সহযোগিতা ও সাফল্যের হতে পারি আমরাও অংশীদার। সত্যিকার অর্থে, ভারতের নির্বাচনের এ পর্বটি শুধু আঞ্চলিক স্বার্থরক্ষার নয়, আন্তর্জার্তিক পরিমণ্ডলেও তাত্পর্যপূর্ণ। এটা সত্য, ঘনবসতিপূর্ণ এ অঞ্চলে দারিদ্র্য বেড়েছে। একই সঙ্গে ধর্মীয় উগ্রতা ও সন্ত্রাস ব্যাপকভাবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। গ্লোবালাইজেশানের কারণে পণ্যে ও বাণিজ্যেও সৃষ্টি হয়েছে অস্থিরতা। কর্পোরেট শাসন উগ্রভাবে চেপে বসেছে সাধারণ মানুষের ওপর। সমাজের নানা অংশে ভোগ ও চাহিদা বেড়েছে অসমভাবে। এ পর্যায়ে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কল্যাণকর মানবিক নেতৃত্ব দেখা দিয়েছে অনিবার্য হয়ে। ‘এক গ্রাম, এক বিশ্ব’ কথাটি প্রযুক্তির কল্যাণে এলেও, জোটবদ্ধ হয়েই এ বিশ্বে মর্যাদা নিয়ে আমাদের বাঁচতে হবে। ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা তারই ইঙ্গিত করছে। ভারতের নির্বাচনে তরুণ ভোটাররা যে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে সেটি বিবেচনায় রেখেই জল্পনা-কল্পনা চলছে। সম্ভাব্য নীতিও নির্ণয় হচ্ছে। যদিও ১৬ই মের আগে কে ক্ষমতায় আসবে কিছুই নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবুও আমরা সমস্ত উগ্রতা পরিহার করে প্রকৃত গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবেই ভারতকে দেখতে চাই। যে জোটই ক্ষমতায় আসুক ‘দাদাগিরি’ নয়, আঞ্চলিক ও পারস্পরিক সহযোগিতার হাতটুকু সমপ্রসারিত করতে হবে, সেটুকুই প্রত্যাশা করি। একই সঙ্গে আর্থ-সামাজিক ও আন্তঃনদীর ক্ষেত্রে চাই উদারনীতি ও কল্যাণমুখী মনোভাবের উদ্যোগী পদক্ষেপ। লোকসভা নির্বাচনের উত্তাপ স্বভাবতই বাংলাদেশের রাজনীতিতেও পড়েছে। বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে তিনহাজারেরও অধিক বর্গকিলোমিটার সীমানা আছে ভারতের সঙ্গে। পণ্য-ট্রানজিটসহ, রাজনীতিতেও ভারত অধিক গুরুত্বপূর্ণ। সেক্ষেত্রে রাহুল বা মোদি যেই সরকারে আসুক, সমস্ত আবেগ-উত্তাপের ঊর্ধ্বে আমরা চাইব একটি সহযোগিতামূলক সহনশীল মনোভাবের নীতি। বিশেষ করে, নদীর পানিবণ্টন ও আঞ্চলিক অর্থনীতিক কর্মপরিকল্পনায় বাংলাদেশ যুক্তিসঙ্গত অধিকারটুকু পেতে চায়—কোনো বঞ্চনা বা অসম নীতি নয়, ‘বিগ ব্রাদারের’ ভূমিকাতে নয়, আন্তঃরাষ্ট্রীয় মনোভাবে। এতে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের সহায়তা এবং আমাদের কৃতজ্ঞতার ধারাটি আরও শক্তিশালী হতে পারে। স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক চির অমলিন থাক—এই কামনা সবার। আর আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে ভারতও আগামীতে কার্যকরী পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে তা প্রমাণ করতে সামর্থ্য হবে, সে প্রত্যাশাটুকু বাস্তবায়ন হলে উভয়েরই মঙ্গল। লেখক: অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন