হাওয়াই :স্বপ্নের দ্বীপপুঞ্জ ঈগলের ডানায়

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৩৫
ভ্রমণবিলাসী মানুষ আমি। ঘর হতে আঙ্গিনা বিদেশ মানলেও বাইরে পা ফেলা মানেই কিন্তু অনেক ঝক্কি। এককালে আমাদের সবুজ পাসপোর্ট দেখলেই বিদেশের এয়ারপোর্টে কাজ করা মানুষগুলোর চেহারা পাল্টে যেতো। একবার ব্যাংককে বাংলাদেশি এক ভদ্রমহিলার দুর্দশা দেখে খুব খারাপ লাগছিল। কোন কারণ নেই শুধু পাসপোর্টের জন্য তাকে হেনস্থা হতে দেখেছিলাম। তাছাড়া বেনাপোল দিয়ে ভারত যাবার বেলায়ও কম ঝামেলা পোহাইনি। চোখ কপালে তোলা ভারতীয় কর্মকর্তাদের লিকলিকে আদলে শক্তি না থাকলেও চেহারায় ছিল আতঙ্ক আর হামবড়া ভাব। যেন আমরা কোন তস্কর জাতি। সত্যি বলতে কি, অনেকটা সে কারণেই দেরি না করে ক্যাঙ্গারু মার্কা পাসপোর্ট নিয়ে নিয়েছিলাম। আর যাই হোক অজি পাসপোর্টে নিশ্চয়ই সে ধরনের ঝামেলা পোহাতে হবে না। এটা সত্যি এই পাসপোর্ট আমার ভ্রমণসীমা বাড়িয়ে দিয়েছে। একশ’র মত দেশে আগাম ভিসা নেবারও দরকার পড়ে না। বিমানবন্দরে গিয়ে নামলেই হল। নীল পাসপোর্টটি আরো অনেকভাবে যাত্রা সুগম করলেও একেবারে নিষ্কন্টক করতে পারেনি। কথায় বলে—আমি যদি যাই বঙ্গে তো আমার কপালও যায় সঙ্গে। এ যাত্রায় আমেরিকার মূল ভূখণ্ড থেকে অনেক দূরে অথচ আমেরিকা ভ্রমণে যাবার পথেও তার কোন ব্যতিক্রম হয়নি। নিয়ম মত তিনঘন্টা আগে সিডনি এয়ারপোর্টে পৌঁছে কাস্টমসের জন্য দম নিচ্ছিলাম। চা না হলে আমার কোন যাত্রাই সম্পূর্ণ হয় না। চা পান আর সৈয়দ মুজতবার বই পড়তে পড়তে দেখি সময় প্রায় হয়ে এসেছে। গিন্নীকে সাথে নিয়ে পা বাড়ানোর পরই শুরু হল হুজ্জুতের প্রাক পর্ব। নাইন ইলেভেন নামে পরিচিত দুনিয়া বদলে যাবার ঘটনাটির পর থেকে মানুষের গেটআপও সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এককালে দাড়ি-গোঁফওয়ালা মানুষরা সাধু-সন্ত বা দরবেশের মত সম্মান পেতেন। তাঁদের দেখলে বাসে, ট্রেনে জায়গা ছেড়ে দেয়া হতো। বিমানবন্দরে দেয়া হতো স্পে্শাল ট্রিটমেন্ট। এখনও দেয়, তবে তা বিপরীত দিক থেকে। সিকিউরিটি কর্মকর্তা কটমট করে তাকিয়ে বলে, “এই যে তুমি! ওদিকে যাও. কাঁচের ঘরে ঢোক।” গিন্নীর চেহারা তখন দেখার মত। আমি কিন্তু ঘাবড়াই না। এর আগেও এই বিশেষ আদর পাবার সৌভাগ্য হয়েছে আমার। মেলবোর্ন যাত্রাকালীন পাশের আসনে বসা ইউরোপিয়ান ভদ্রমহিলার দৃষ্ট জীবনেও ভুলবো না আমি। নাইন ইলেভেন তখন দগদগে। আমার ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি-গোঁফ আর এশিয়ান চেহারা দেখে তাঁর আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার যোগাড়। সারা পথ একবার আমার দিকে তাকায় আর চোখ বুঁজে কি যেন বিড় বিড় করে। তার বদ্ধমূল ধারণা-আমি এই বলাকা ছিনিয়ে অন্য কোথাও নিয়ে যাবার মিশনে যাত্রী হয়েছি। আমি ভেতরে মজা পেলেও উপরে উপরে গম্ভীর ভাব ধরে বসে রইলাম। মনে মনে বলি, “ওরে বুড়ী তুমি জানো না তোমার চেয়ে আমার আল আরো খারাপ। তালেবান সুযোগ পেলে আমার হাড্ডি দিয়ে কাবাব বানিয়ে খাবে”। আসলে সে থেকে ভ্রমণের আনন্দ আসলেই পানসে হয়ে গেছে। একাধিকবার বসন খোলা, জুতো খোলা, দু’হাত উপরে তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে চেকিং-এর কবলে পড়া যাত্রীদের মনে আগের আনন্দ নেই আর। সে যাই হোক, গম্ভীরমুখো কর্মকর্তা অনেক কষ্টে রাজি হলেন বা নিজেকে বোঝাতে পারলেন যে আমি নিরাপদ। ছাড়া পেয়ে আমি পা বাড়ালাম উড়োজাহাজের পথে। রাতের আকাশ ভ্রমণ আরো কিছু কারণে ঝক্কিপূর্ণ। পা ছড়িয়ে না বসে মানুষ কি ঘুমোতে পারে? ফলে আধো ঘুম আধো জাগরণেই পার করতে হবে পুরো রাত। এর মধ্যে আছে অতি উত্সাহীদের আলো জ্বালিয়ে বই পড়া বা ভিডিও দেখার ধূম। মনে মনে ভাবি যে পথে রওয়ানা হয়েছি তাতে কোন কিছুই কোন কিছু নয়। নিচে প্রশান্ত মহাসাগর আর ওপরে অজানা মহাআকাশ। ভোরের আলো না ফোটা পর্যন্ত আমি আসলে কারো নই। আর পা হড়কালে নাম-নিশানা মুছে লিষ্টে ওঠা এককালের কেউ। তাই কষ্ট-কল্পিত ভোরের জন্য নিদ্রার ভান করাই ভালো। কখন যে চোখ বন্ধ হয়ে এসেছিল টের পাইনি। দীপার কঠিন ধাক্কায় চোখ মেলে দেখি- আলো জ্বলে উঠেছে। সীট বেল্ট বেঁধে নেবার ঘোষণা চলছে অর্থাত্ হনলুলুর আকাশে এসে পড়েছি আমরা। বলাবাহুল্য সারারাত ঘুমিয়ে ঠিক সময়ে উঠে যাবার রেকর্ডে অপরাজিত গিন্নীর বজ্রহুংকার- “তোমার আর আক্কেল হলো না খালি ঘুম আর ঘুম”। আরে বাবা! আমিতো সারারাত জেগেই ছিলাম। মিনিট দশেকের তন্দ্রার জন্যে ঝাড়ি খাবার পুরনো রেকর্ড বজায় রেখেই তৈরি হতে শুরু করলাম। তখনো আকাশে সূর্যের দেখা নেই। জানালায় চোখ রেখে মন জুড়িয়ে গেল। এমন সুন্দর দৃশ্য প্রকৃতি ভিন্ন কারো দ্বারা সৃজন হবার নয়। নিচে একপাশে নীল জলের প্রশান্ত সাগর ঘুমিয়ে আছে। যতদূর দেখা যায় নীল কার্পেট মোড়ানো জলরাশি। আরেকদিকে সাপের মত বেঁকে যাওয়া হনলুলু। আকাশ থেকেই বোঝা যাচ্ছিল এই শহর বিস্তৃত আর আলোয় আলোয় উজ্জ্বল। রাত পোহাবার আগেই গাড়ির সারি চলেছে পথ বেয়ে। দমকা হাওয়ার মত ঝাঁকি দিয়ে বিশাল উড়োজাহাজটি তার ডানা গুটিয়ে পা রাখলো হনলুলু বিমানবন্দরে। যৌবনে দেখা হাওয়াই ফাইভোর স্বপ্নময় মাটিতে নামার সময় মনে মনে বললাম:ওরে আটলান্টিক না হলেও এটা আমেরিকা। প্রশান্ত পাড়ার একদা আদিবাসী রাজার দেশটি কবেই ঈগলের দেশে পরিণত হয়ে গেছে। বিমানবন্দরের শুরুতেই লেখা: “ওয়েলকাম টু আমেরিকা”—মানে হে বত্স, হাতের ছাপ, আঙ্ুলের ছাপ আর নিরাপত্তার জন্য তৈরি হও। কাঁধের ব্যাগটি আলতো করে ঝুলিয়ে মুখে হাসি হাসি ভাব বজায় রেখে পা বাড়ালাম। হাজার হোক আমেরিকা দি বস বলে কথা! (সিডনী থেকে)

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন