‘জিন’ তাড়ানোর নামে শিশু হত্যার অভিযোগ আমরা প্রায়শই শুনি। ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার দোহারের পানকুন্ডু গ্রামের ৬ বছরের শিশু হোসেন এমন একটি নির্মম পরিস্থিতির শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে সম্প্রতি। জিনের আছর দূর করবার নামে কথিত ওঝা ঝাড়ফুঁক-এর পর শিশু হোসেনের বুকে দীর্ঘক্ষণ পা দিয়ে পাড়া দিয়ে রাখেন। কিছুক্ষণ পরই মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে হোসেন। নবাবগঞ্জের বালেঙ্গা গ্রামে কথিত ওঝা জসিম উদ্দিন কর্তৃক এই পাশবিক, লোমহর্ষক নৃশংস ঘটনাটি ঘটে। হোসেনের সমস্যা ছিল, হোসেন চঞ্চল ছিল। সময়মত খাওয়া-দাওয়া করত না। ঘর থেকে সময় অসময়ে বের হয়ে যেত। পরিবার হোসেনের এই আচরণ দূর করবার জন্য ওঝার শরণাপন্ন হন। তারপরই ঘটে এমন মর্মান্তিক ঘটনা। এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। অহরহ শোনা যায় এমন সংবাদ। শুধু শিশু নয়, নারী-পুরুষ সকলেই এমন পরিস্থিতির শিকার হন। তবে এর মাঝে শিশু ও নারীর সংখ্যা বেশি। আবার শহরের চাইতে গ্রাম ও মফস্বলে এ ধরনের নির্মম ঘটনা বেশি পরিলক্ষিত হয়। শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত বা প্রতিবন্ধিতার কারণে আচরণে এ ধরনের বৈকল্য বা ডিজঅর্ডার দেখা দিতে পারে। আবার চঞ্চলতা বা ঠিকমত খাওয়া-দাওয়া না করাও অনেকটা শিশুসুলভ আচরণ। বয়সের সাথে সাথে তার চঞ্চলতার মাত্রা কমে আসতে পারে এবং খাওয়া-দাওয়ার প্রতি তার আগ্রহ সৃষ্টি হতে পারে। আবার বিশেষ পরিচর্যা, বিশেষ শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও থেরাপী দ্বারা এই সীমাবদ্ধতা বা প্রতিবন্ধিতাকে দূর করা সম্ভব হতে পারে। হতে পারে নয়, বলা যায় হয়। কিন্তু অনেক অভিভাবক এ বিষয় নিয়ে বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েন। সন্তানের এই আচরণ সংশোধনে মরিয়া হয়ে ওঠেন। বিশেষত উপযুক্ত শিক্ষা অর্জিত হয়নি এমন অভিভাবকগণ সন্তানের এই আচরণ মেনে নিতে পারেন না। আশ্রয় নেন শিক্ষা বর্জিত শ্রেণিগোষ্ঠীর দ্বারে। যারা উপযুক্ত শিক্ষা গ্রহণ না করেই সম্মোহনী শক্তি বলে সাধারণ মানুষকে বাস্তবচ্যুত করে ঠকিয়ে নিজেদের ফায়দা লুটেন।
বিষয়টি খুব আতংকের। বিজ্ঞান, প্রযুক্তির আধুনিক বিশ্বে এমনতর ঘটনা মেনে নেয়া যায় না। এ ধরনের ঘটনা বর্তমান বাংলাদেশের অসচেতন সমাজ ব্যবস্থার বিষয়টি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। বুঝতে হয় যোগাযোগের আধুনিক পরিকল্পনা বা তত্পরতায় সাধারণ মানুষের একটি অংশ এখনও বহিরাগত হয়ে আছে। কিন্তু শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অধিকার বিষয়ে জনসচেতনতায় প্রতিটি সরকার, বেসরকারি সংগঠনগুলোর বেশ সক্রিয়তা আমরা দেখতে পাই। আরও দেখি এক্ষেত্রে নিজেদের ভূমিকা জনমনে প্রতিষ্ঠিত করতে কাজের তুলনায় প্রচারে যেন সব প্রতিষ্ঠানই কমবেশি প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছে। যা অত্যন্ত দুঃখজনক। প্রচার সর্বস্ব উন্নয়ন সচেতন তত্পরতা কোন কোন সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে সেলিব্রেটির মর্যাদাও দিয়েছে। এতে মুষ্টিমেয় ব্যক্তির স্বার্থ হাসিল হয়েছে মাত্র। উল্লেখ করতে হয় যে, স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে বেসরকারি সংগঠনগুলো সরকারের প্যারালালে সাধারণ দরিদ্র মানুষের উন্নয়নে কাজ করে চলছে অদ্যাবধি। এই দীর্ঘ পরিক্রমায় একটি মাত্র কর্মসূচি আকাশচুম্বী হয়েছে। কর্মসূচিটি হলো, ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি। ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম যে ভাবে প্রসার লাভ করেছে, শীর্ষে ঠাঁই পেয়েছে, অন্যান্য কার্যক্রম সেই অনুপাতে অনেক পিছে পড়ে আছে। সম্ভবত ক্ষুদ্রঋণের সুদ বিষয়টি প্রতিষ্ঠানের স্থায়ীত্বশীলতা এনে দেয় এবং প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা, কর্মচারীদের আশানুরূপ প্রয়োজন মেটায় বলেই হয়ত ঋণ কার্যক্রম নিয়ে বেসরকারি উন্নয়ন সংগঠনগুলো বেশি তত্পর। অপরদিকে সাধারণ দরিদ্র মানুষকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতন করতে এবং সেবাদানে প্রতিষ্ঠানের স্থায়ীত্বশীলতার জন্য তেমন লাভজনক হয় না। ফলে ক্ষুদ্রঋণের প্রতি যে আগ্রহ, সক্রিয়তা তা যেন স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় দেখা যায় না। যা আছে তা অনেকটাই প্রচারমুখী। আর তাই বোধহয় অসচেতনতার কারণে স্বাস্থ্যবিষয়ক সেবা পেতে দরিদ্র মানুষ ওঝা বা কবিরাজ শ্রেণির কাছে জীবনটা বরাদ্দ করে দেয়। জীবন রক্ষার জন্য উক্ত পেশার মানুষ কতটা নিরাপদ বা জ্ঞানসম্পন্ন, দক্ষতাসম্পন্ন তা প্রশ্নাতীত থেকে যায় এখানে। বলতেই হয় দেশের গ্রামাঞ্চলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজ করছে এমন দাবিদার সংগঠনের সংখ্যা কম নয়। কম হলো প্রকৃত দায়বদ্ধতার।
সচেতনতার অভাবেই ওঝা বা কবিরাজ গ্রামাঞ্চল বা মফস্বল শহরের দরিদ্র সাধারণ মানুষের কাছে অভয় জন। চিকিত্সা বিজ্ঞানের ব্যাপক বিস্তার থাকলেও ওঝা বা কবিরাজ শ্রেণি রয়ে গেছে। সরল মানুষগুলোকে সম্মোহনে বশ করে তাদের উপর সম্পূর্ণ নিজস্ব কৌশলে সমস্যা দূর করবার যে কায়দা তা কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনের কাছে অজানা নয়। শিশুর বুকের উপর পা দিয়ে চটকিয়ে জিন তাড়াবার ঘটনায় শিশুর মৃত্যু হয়েছে এমন সংবাদও নতুন নয়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই মৃত্যুর প্রতিবাদ অন্যান্য মৃত্যুর প্রতিবাদের মত হতে দেখি না। শাস্তির দাবিও জোরালো হয় না। যেটুকুন হয় তা পরিবার থেকে। বিভিন্ন সময়ে প্রচার মাধ্যমে এ সংক্রান্ত লোমহর্ষক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে পাঠক ও দর্শকদের মনে আতংক তৈরি হয় মাত্র। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন, সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিরোধমুখী কর্মতত্পরতা তদ্রূপ হয় না। যেন আধুনিক সমাজবোধ শহরকেন্দ্রিক। সমাজসেবীরা তাদের সেবার দৌরাত্ম্যকে শহুরে করে রেখেছেন। এতে গ্রামের মানুষেরা আধুনিকায়নে নিজেদের সম্পৃক্ত করবার সুযোগ পাচ্ছে না।
বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য, উপাত্ত সংগ্রহ, গবেষণার ঘাটতি নেই আমাদের দেশে। প্রচুর কাজ হয় এসবে। আয়োজনও ব্যাপক। কিন্তু ‘জিন’ তাড়াবার ঘটনায় শিশু, নারীর মৃত্যুর কোন তথ্য, উপাত্ত বা গবেষণা কোথাও সংরক্ষিত আছে কিনা আমার জানা নেই। শিশু ও নারীর অধিকার বিষয়ক অনেক চিন্তা, ভাবনা, গবেষণা, পরিকল্পনা, প্রতিবাদ, অঙ্গীকার ইত্যাদি দেখি, শুনি। অনেক নিবেদিত সক্রিয় শক্তিও আছে তাতে। কিন্তু এ বিষয় নিয়ে কোন শব্দ ধ্বনিত হতে দেখি না। সামাজিক সুস্থতার আন্দোলনে সক্রিয়দের আড়ালেই যেন এমন নির্মম মৃত্যু ঘটে চলেছে। অজপাড়া গাঁয়ে এমন নৃশংসতার প্রতিরোধে কে এগিয়ে আসবে প্রশ্ন সেটা।
ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে যদি শহর, আর নগর বোঝায় তাহলে প্রশ্নটা অবান্তর থেকে যায়। ডিজিটাল বাংলাদেশে এ ধরনের চিকিত্সাকর্ম চলবে অবলীলায়, কারোর কিছু করা নেই অবস্থা এমন হলেও প্রশ্নটা অবান্তর থেকে যায়। শিশুর বুকের উপর পা রেখে আচরণ পরিবর্তন বা সমস্যা দূর করবার চেষ্টাকে অমানবিক বলব না, বরং এটা ফাঁসি যোগ্য অপরাধ এবং প্রকাশ্যে তার ফাঁসি কার্যকর হওয়া বঞ্ছনীয়। সেই সাথে যারা এহেন কাজে সাধারণ মানুষকে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে প্রভাবিত করছে বা করবে তাদেরও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার।
অজ্ঞতা দূর করবার দায়িত্ব সর্বপ্রথম যেমন রাষ্ট্রের, তেমন প্রতিটি মানুষের জীবন রক্ষার দায়িত্বও রাষ্ট্রের। মানুষের জীবননাশক দিকগুলো যদি রাষ্ট্রের কাছে দৃশ্যমান না হয়, তাহলে রাষ্ট্রযন্ত্রের সক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পাশাপাশি সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো যারা বেসরকারি পোশাকে উন্নয়ন ধারায় সম্পৃক্ত তাদেরও দায়িত্বশীল হওয়া বাঞ্ছনীয় এ বিষয়ে। মানুষের প্রাণরক্ষার নামেই কেবল তারা সক্রিয় থাকবে, কাজে নয় এমন স্বার্থান্বেষী আচরণ আর প্রশ্রয় দেয়া ঠিক নয়। আমাদের উপযুক্ত পরিকল্পনা, ভাবনা, চেতনা, ব্যবস্থার অভাব থেকে যে অজ্ঞতার জন্ম এবং যার নির্মম শিকার নিষ্পাপ শিশুরা, সেই অভাব দূর করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
লেখক:উন্নয়ন কর্মী
