নৌ ও সমুদ্র পথের নিরাপত্তা

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০১৪, ২২:৩৫
পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও আধুনিক অবকাঠামোগত সুবিধা না থাকায় সমুদ্র উপকূলে ঝুঁকি নিয়া নৌ চলাচল করিতেছে। গত মঙ্গলবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক খবরে জানা যায়, দেশের দক্ষিণ উপকূলভাগের কুয়াকাটা, নিঝুম দ্বীপ, ঢালচর ও দুবলার চরসহ বঙ্গোপসাগরের উপকূল সন্নিকটবর্তী দ্বীপ বা উপদ্বীপে কোথাও কোন লাইটহাউস বা বাতিঘর নাই। সেন্টমার্ির্টন, কুতুবদিয়া ও কক্সবাজারে লাইটহাউস থাকিলেও তাহা বহু পুরাতন। সিংহভাগ যন্ত্র জরাজীর্ণ ও বিকল। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল) পরিচালিত মংলা ও ছিলিমপুর রেডিও স্টেশনের অবস্থাও বেহাল। নামেই আছে স্টেশন, প্রকৃতপক্ষে যন্ত্রপাতি ও জনবল নাই। নাই স্থলভিত্তিক প্রয়োজনীয় অবকাঠামো সুবিধাও। সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক জাহাজগুলি নিয়মিত মনিটরিং করা দরকার। কিন্তু এইজন্যও যথেষ্ট অবকাঠামো ও লোকবল নাই। ফলে সমুদ্রে চলাচল করিবার সময় জাহাজগুলির সহিত কোন প্রকার যোগাযোগ রক্ষা করা যায় না। জাহাজগুলি দস্যু কবলিত হইলে বা কোন প্রকার দুর্যোগ-দুর্বিপাকে পড়িলে উদ্ধার করা কঠিন হইয়া পড়ে। সনাতনী ভেসল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও সতর্কীকরণ পদ্ধতি আর তেমন কাজে আসিতেছে না। শুধু সমুদ্রই নহে, আমাদের অনেক সাধারণ নদীপথও অরক্ষিত। সেইখানে পর্যাপ্ত বয়াবাতি নাই। নাই প্রয়োজনীয় দিক-নির্দেশনা। কোথাও কোথাও আছে নাব্যতা সংকট। সুন্দরবনের অনেক নদ-নদীতে বিদেশি পর্যটকরা চলাচল করেন। কিন্তু সেইখানেও পর্যাপ্ত নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নাই। আন্তর্জাতিক নেভিগেশন রুলস অনুযায়ী নৌপথে সড়ক পথের ন্যায় অনেক সাইন-সিম্বল ব্যবহারের নিয়ম রহিয়াছে। রহিয়াছে চ্যানেল মার্কার। কোথায় নদীর গভীরতা বেশি, সতর্কতার সহিত ও ধীরে চলিতে হইবে তাহারও নির্দিষ্ট সাইন আছে। আছে ড্যাঞ্জার জোন চিনিবার উপায়। নৌকা বা জাহাজে প্রয়োজনে বিশেষ ফ্ল্যাগ ব্যবহারেরও নিয়ম আছে। এইখানে প্রশ্ন উঠিতে পারে, যেইখানে সড়ক পথই নিরাপদ নহে, সেইখানে নৌ ও সমুদ্র পথ নিয়া আমাদের এত ভাবনা কিসের? কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে আমাদের নৌপথগুলিতে নানা মাত্রিক ঝুঁকি ও দুর্ঘটনা বাড়িয়া যায়। তাহাছাড়া জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য, ভৌগলিক নিরাপত্তা ইত্যাদি নানা কারণে বর্তমান বিশ্বে সমুদ্র পথের গুরুত্ব সর্বাধিক। ইংরেজরা ভারতীয় উপমহাদেশের অরক্ষিত নৌব্যবস্থার সুযোগ নিয়াই এই দেশের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে। সমুদ্রসীমানার মীমাংসায় ইতোমধ্যে আমরা সফল হইলেও এখন তাহা রক্ষার কথা ভাবিতে হইবে। নৌবাহিনীর উন্নয়নের পাশাপাশি নৌ ও সমুদ্র পথকে ঝুঁকি ও কণ্টকমুক্ত করিতে হইবে। বাংলাদেশ জাতিসংঘের ‘কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য সি অ্যান্ড সেফটি অব লাইফ অন দ্য সি’ তে স্বাক্ষরকারী দেশ। সেই অনুযায়ী সমুদ্র পথের নিরাপত্তা বিধান ও আন্তর্জাতিক মান অর্জনে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর উন্নয়নে রহিয়াছে বাধ্যবাধকতা। আশার কথা হইল, এই সংক্রান্ত একটি প্রকল্পের অনুমোদন চূড়ান্ত পর্যায়ে রহিয়াছে। ইহার নাম জিএমডিএসএস (গ্লোবাল মেরিটাইম ডিসট্রেস অ্যান্ড সেফটি সিস্টেম) ও ইন্টিগ্রেটেড মেরিটাইম নেভিগেশন সিস্টেম প্রকল্প। এই পরিকল্পনার আওতায় দেশের অভ্যন্তরে সমুদ্র তীরবর্তী সাতটি স্থানে পৃথক নৌনিরাপত্তার জন্য অবকাঠামো, নিরাপত্তা প্রহরা ও টহল ব্যবস্থা স্থাপন করা হইবে। ইহাতে বেতার যোগাযোগের জন্য স্থাপনা নির্মাণ করা হইবে এবং আধুনিক ভেসল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, শিপ রিপোর্টিং সিস্টেম (জাহাজের তথ্য প্রদান পদ্ধতি), নৌ চালনায় সহায়তা, জাহাজের নিরাপত্তা সতর্কীকরণ পদ্ধতি, দূরবর্তী জাহাজ চিহ্নিতকরণ ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ইত্যাদির উন্নয়ন ত্বরান্বিত হইবে। আমরা এই প্রকল্পটির দ্রুত অনুমোদন ও বাস্তবায়ন কামনা করি। আর যেইসব লাইটহাউস অকার্যকর অথচ তাহার প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ পাওয়া যাইতেছে না তাহা বাতিল করিয়া নূতন লাইটহাউস স্থাপনও জরুরি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন