খনাকে নিয়ে অনেক কিংবদন্তি। কিংবদন্তি অনুসারে কখনও তিনি আচার্যের কন্যা, কখনও সিংহলের রাজকন্যা। এমন বিপরীতমুখী কিংবদন্তি সচরাচর দেখা যায় না। খনার জন্ম সময়কাল নিয়েও রয়েছে নানান বিতর্ক। কিন্তু সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে গিয়ে বলা যায়, খনা সেই মহীয়সী নারী যার মুখ নিঃসৃত বাণী আজ পর্যন্ত কৃষিকাজ, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, দিকনির্ণয়, পশুপালন, জনস্বাস্থ্য, শুভাশুভ বিচারের ক্ষেত্রে হাজার বছর ধরে একইভাবে পালিত হয়ে আসছে। মুখ নিঃসৃত বাণী বলছি এজন্য যে, খনার বচনের কোন পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ নেই, খনা কতগুলো বচন রচনা করেছিলেন সে সম্পর্কে সঠিক পরিসংখ্যান নেই। খনা তাঁর নিজের জন্ম এবং কাজ সম্পর্কে দুটি বচন উচ্চারণ করে গেছেন তার একটি হচ্ছে , ‘আমি অটনাচার্যের বেটি । গণা বাছায় করে না আটি।’ অন্যটি হচ্ছে , ‘ভাষা বোল পাতে লেখি । বাচাহুব বোল পড়ি সাথি। ’ বোল অর্থ বুলি। অর্থাত্ বোল তিনি পাতায় লিখতেন এবং এভাবে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন। খনা যে তালপাতা বা ভুর্জ্যপত্রে বোলগুলো লিখতেন এমন কথা অনেক বই-পুস্তকে পাওয়া যায় কিন্তু সেই ধরনের কোন সংগ্রহ আছে বলে আমার জানা নেই।
বৌদ্ধ ভিক্ষু লুই পা, কানহুপা প্রমুখের লেখা বাংলাভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদ ১০০০-১২০০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে নেপালের রাজ গ্রন্থাগার থেকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবিষ্কার করেন। ধারণা করা হয় খনার বচনগুলো ৮০০-১২০০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যকার। অর্থাত্ চর্যাপদের চেয়ে পুরোনো। সেই সময়ে জোতিষশাস্ত্র এদেশে প্রচণ্ড সমাদৃত ছিল। রাজদরবারে রাজজ্যোতিষীর পদ ছিল। রাজা-রাজড়া আমির অমাত্য থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত জ্যোতিষ গণনায় একচ্ছত্রভাবে বিশ্বাসী ছিল। আর এই সময়ে জন্ম নিয়েছিলেন কয়েকজন বিখ্যাত জ্যোাতিষ, গাণিতিক, পন্ডিত। কিংবদন্তি অনুসারে খনার শ্বশুর ‘বরাহ’ তাদের অন্যতম। তিনি ছিলেন উজ্জয়িনীর রাজা বিক্রমাদিত্যের ‘নবরত্ন’ সভার প্রধান জ্যোতিষ। তিনি ‘শূন্য’ এবং ‘পাইএর’ আবিষ্কর্তা। সমকোণ, ্সূক্ষ্মকোণ এবং ত্রিকোণমিতির কিছু ফর্মূলা তার আবিষ্কার। খনার স্বামী ‘মিহিরও’ ছিলেন একজন নামকরা জ্যোতিষ। ভারতের প্রথম জ্যোতির্বিদ ও গণিতবিদ আর্যভট্টর নাম সবারই জানা। তিনি সূর্যগ্রহণ, চন্দ্রগ্রহণ এবং পৃথিবীর ঘূর্ণনের উপর কাজ করে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। দক্ষিণ ভারতীয় গাণিতিক মহাবীরের জন্মকাল ধরা হয় ৯০০ খৃষ্টাব্দ। তিনি ভগ্নাংশের সমীকরণ, (-) সংখ্যার বর্গমূলের ফলাফল যে ধনাত্মক হয় এই থিওরি আবিষ্কার করে কালজয়ী হয়ে আছেন।
খনাকে স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য তার জিভ কেটে দেয়া হল, তার পরপরই খনা মারা যান। কিন্তু খনাকে স্তব্ধ করা যায়নি। আজও এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে খনার বচন অনুসরণেই প্রতিপালিত হচ্ছে কৃষিকাজ গোপালনসহ প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা। খনার বচন অনুসরণ করছে তিব্বত, শ্রীলঙ্কা, উড়িষ্যা, নেপাল, আসাম এবং বাংলাদেশের চাষিরা । অসমিয়া ভাষায় রয়েছে খনার বচনের বিশাল সংগ্রহ। উড়িষ্যায় এখনও বাদ্যযন্ত্র সহকারে খনার বচন গাওয়া হয়, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে খোদাই করে রাখা হয়। আমাদের দেশে কয়েক বছর আগে দিনাজপুর ময়মনসিংহ কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায় নির্বিশেষে কয়েকটি গ্রামে নির্ধারিত প্রশ্নমালার ভিত্তিতে একটি জরিপ কাজ পরিচালনা করা হয়েছিল। তাতে দেখা গেছে এখনও গ্রামাঞ্চলের কৃষকদের ৯৮ ভাগের জীবনযাত্রা খনার বচন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।
এ কথা সত্য , ইতিহাসে খনার স্থানটি যেভাবে হবার কথা ছিল তা হয়নি। খনা তাঁর কালজয়ী বচনে কৃষিতত্ত্বজ্ঞান সমাজের সামনে বেদবাণীর মতোই উপস্থাপিত করেছেন। জ্যোতির্বিদ বরাহ তার ‘বৃহত্সংহিতায়’ কৃষির প্রয়োজনে বৃষ্টিপাত, ঝড়, শিলাবৃষ্টি ইত্যাদি সম্পর্কে তথ্যাবলি পরিবেশন করেছেন। আর্যভট্ট থেকে মুসলিম শাসনামল পর্যন্ত বহু জ্যোতির্বিদ কৃষি সংক্রান্ত আবহবার্তা নিজ নিজ গ্রন্থে লিখে গেছেন। কিন্তু ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্রের ইতিহাসে বিদূষী খনার নাম সেভাবে নেই। কেউ উল্লেখ করলেও তা দায়সারা গোছের। অথচ প্রাচীনকালে কৃষি সম্পর্কে খনার মত অত তথ্যবহুল কথা কোন পন্ডিত বলেননি। অত ব্যাপক অঞ্চল জুড়ে সুদীর্ঘকাল যাবত্ খনার বচনের মত কারো কথা অত জনপ্রিয়ও হয়নি। এককালে খনার বচন অশোক অনুশাসনের মত কিংবা চানক্যের শ্লোকের মত ব্যাপকভাবে হয়তবা প্রচার হয়েছিল, নইলে ভারতবর্ষের সমগ্র পূর্বার্ধ জুড়ে একজন মহিলার কথা সমগ্র জনসাধারণের জানার কথা নয়। একসময় খনাকে পুরুষরূপে প্রতিপন্ন করারও চেষ্টা হয়েছিল। একজন নারীর মুখ নিঃসৃত বাণী এতটা জ্ঞানগর্ভ হতে পারে এটা মানতে অনেকরই ছিল আপত্তি। কিন্তু খনার জ্ঞান অমর করেছে তাঁকে। সে সময়ের বিখ্যাত সেসব জ্যোতিষ গণিতবিদদের অবস্থান কতিপয় শিক্ষিত মানুষের অন্তরে। কিন্তু খনাকে চেনে এক ব্যাপক জনগোষ্ঠী। খনার অবস্থান শিক্ষিত অশিক্ষিত সর্বশ্রেণীর মানুষের অন্তরে। যতদিন মানবসমাজে কৃষি আর পশুপালনের অস্তিত্ব থাকবে ততদিন বেঁচে থাকবে খনার বচন।
লেখক:কথাশিল্পী
email:parveenwriter@ yahoo.com
