দেশের সার্বিক পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টিক্ষেপন করিলে যে কেহই বুঝিতে পারিবেন যে, এইখানে এমন একটি গেরো লাগিয়াছে যাহা খোলা খুব সহজসাধ্য নহে। উপরন্তু, গিট্টুটি ঠিক কোন জায়গায় লাগিয়াছে উহা শনাক্তকরণ সম্ভব হইলেও উহা খুলিবার ব্যাপারে দেশের বিদ্যমান পক্ষগুলি আদৌ ইচ্ছুক কিনা সেই বিষয়েও নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হইতেছে না। এমন এক জটিল পরিস্থিতির আবর্তে যখন আমরা সকলেই নিক্ষিপ্ত, ঠিক তখনই, কোন কোন দেশ পরিচালক কিংবা উহাদের বিরোধী পক্ষ হইতে কখনও কখনও এমন সব কথাবার্তা শোনা যায় কিংবা আচার-আচরণ দৃষ্টিগোচর হয় যাহা ঔপনিবেশিক আমলের মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ মাত্র! ‘ধরাকে সরা জ্ঞান’ করা এবং নিজেদেরকে জনগণের প্রভুরূপে প্রতিষ্ঠিত রাখার কাজেই ইহাদেরকে সর্বক্ষণ সাতিশয় ব্যস্ত থাকিতে দেখা যায়। অথচ, দুনিয়া যে বদলাইয়া গিয়াছে এবং যাইতেছে এই বাস্তব উপলব্ধি তাহাদের ঘটে নাই। ফলে আমরা দেশের প্রশাসনের সহিত সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গের মাঝে জমিদারী ভাব ও গদাই লস্করী চাল দেখিতে পাইতেছি। তাহারা হয়তো ধরিয়াই লইয়াছেন যে, ‘এ্যায়সা দিন হামেশাই রাহেগা।’ কিন্তু না, ইহা ভাবিয়া থাকিলে সন্দেহাতীতভাবে যে তাহারা ভ্রান্ত পথে চলিতেছে ইহাতে কোনই ভুল নাই। ইতিহাসের পাঠ যাহারা গ্রহণ করে না তাহারা এমন ধারণা পোষণ করে এবং উহার মধ্যেই আত্মপ্রসাদ লাভ করে। কিন্তু সমাজ-অভ্যন্তরে যাবতীয় অব্যবস্থা, কু-শাসন-অবিচারের বিরুদ্ধে যে ধূমায়িত জনরোষ ধিকি ধিকি করিয়া জ্বলিতে থাকে উহা এক সময় জ্বালামুখের সন্ধান পাইতেই ভিসুভিয়াসের অগ্নিস্রাবীরূপ পরিগ্রহ করে এবং তখন এই সকল জমিদার বা মোড়ল উহাতে দগ্ধীভূত হয় আর ইহারা তখন পালাইবার পথ পায় না। ইহাই ইতিহাসের শিক্ষা! দেশে দেশে কালে কালে এমন নজীর রহিয়াছে ভুরি ভুরি। এমনকি আমাদের দেশেও জনতাসাগরে উর্মি জাগিয়াছে এবং উহার তোড়ে সাম্প্রতিক অতীতে সয়লাব হইয়া গিয়াছে বলদর্পীদের উদ্ধত অহংকার। সুতরাং, প্রশাসনের সহিত সম্পর্কিত ব্যক্তিবর্গের প্রতি আমরা ইতিহাসের আলোকে এই সতর্ক সংকেতের কথা উচ্চারণ করিতে চাহি যে, জনগণকে দুর্ভোগের অন্ধকারে নিমজ্জিত করিয়া যাহারা নিজেদের জাগতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হইয়া যাহা ইচ্ছা তাহাই করিতেছে তাহাদের জন্য ‘এ্যায়সা দিন হামেশা নেহি রাহেগা।’ নিজেদের চৌহদ্দীর বাহিরে যাইয়া যাহারা অপরিসীম ক্ষমতা দেখাইতে বড়ই আনন্দ লাভ করিয়া থাকে তাহাদেরও সতর্ক হওয়া আশু কর্তব্য! সীমা লংঘনকারীকে আল্লাহ্ পছন্দ করেন না, এ কথা জানা সত্ত্বেও যাহারা নিত্যদিনই সীমা লংঘন করিয়া চলিয়াছে তাহারা হয় বুরবুক নয় বুঁজদিল।
‘অতি চালাকের গলায় দড়ি’-এই প্রবাদ বাক্যটির সহিত এতদিন সকলের পরিচয় থাকিলেও আজকের দিনের নবপ্রজন্মের নিকট হয়তো ইহা অপরিচিত আর বর্তমানের বৃদ্ধরা তো ইহা প্রায়-ভুলিতেই বসিয়াছে। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থা, সমাজ ব্যবস্থা, পারিবারিক ব্যবস্থা, ব্যবসায়িক বা ব্যাংকিং ব্যবস্থা হইতে শুরু করিয়া সর্বক্ষেত্রেই যাহারা পরিচালকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হইয়াছেন তাহারা অতি চালাকিতেই পারদর্শিতা অর্জনের জন্য উঠিয়া-পড়িয়া লাগিয়াছেন। কিন্তু ইহার পরিনাম কি দাঁড়ায় বা দাঁড়াইতে পারে উহা কিন্তু একবারের জন্যও ভাবিয়া দেখার অবকাশ তাহাদের জীবনে নাই। কেননা, কর্তৃত্ব, মোক্ষ, অর্থ-বিত্ত ইত্যাদিই যেখানে মুখ্য সেখানে অন্যকিছু ভাবিবার সময় কোথায় এবং ইহার আবশ্যকতাই বা কী?
তবে জানিয়া রাখা দরকার যে, ইহারা জনস্বার্থবিরোধী যাহা কিছু করে বা ইহাদের পূর্বতনরা যাহা কিছু করিয়া গিয়াছে দেশের ১৬ কোটি মূর্খ-শুক্য মানুষ তাহার কিছুই আঁচ পায় না বা বোঝে না ইহা মনে করার কোন কারণ নাই। মনে রাখিতে হইবে যে, এই স্বাধীন দেশের কোটি কোটি মানুষ কর্মোপলক্ষে, শিক্ষা উপলক্ষে দেশ-বিদেশ দেখিয়াছে এবং দেখিতেছে। সুতরাং, ইহাদেরকে আহাম্মক ঠাওরাইবার মতো দুর্বুদ্ধি আর কি হইতে পারে! বৃহত্ জনগোষ্ঠীর মানস ভঙ্গির এই বাস্তবোচিত পরিবর্তন যাহাদের দৃষ্টি পথে পড়ে না তাহারা নিশ্চয়ই অন্ধ ও বধির!
