মনস্তত্ত্ব

২৫ বছর বয়সের মধুর স্মৃতি

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০১৪, ২১:১২
মধুর স্মৃতি আমাদের মনে যেভাবে দাগ কাটতে পারে, তার চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই। আর সবচাইতে মধুর স্মৃতির ভাণ্ডার নাকি পঁচিশ বছর বয়সেই পূর্ণ হয়ে যায়! এমনটিই বলেছে নিউ হ্যাম্পশায়ারের একদল বিজ্ঞানী। তাঁদের মতে, জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলির বর্ণনা করতে বললে মানুষের যত বয়স বাড়ে ততই তারা যে সময়টিতে মূলত ঘুরে ফিরে বার বার ফিরে যান—তা ওই পঁচিশ বছরের স্মৃতির ভিতরেই থাকে কোথাও না কোথাও। এর কারণ কী, তা অনুভব করা বোধহয় খুব কঠিন নয়। একজন মানুষ ২৫ বছর বয়সের ভেতরেই তার যৌবনের উচ্ছলতা, উদ্দাম, বেপরোয়া মানসিকতার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি যুক্ত থাকে। এটা ওই বয়সেরই স্বাভাবিক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ বলে মনে করা হয়। শৈশব ও যৌবনের স্মৃতি মানুষের মনে দাগ কেটে থাকার কারণ বোধহয় ওই বয়সের নির্ভার জীবন। তাই শৈশব যৌবনকালে আমরা আসলেই ‘সবাই রাজা’র মানসিক রাজত্বে বসবাস করি। সংসারের কঠিন অঙ্কের হিসেব-নিকেশ পাতার পর পাতা কষে যাবার বিষয়টি তখনও উপলব্ধির জগতে ঢোকার সুযোগ পায় না। অতি নিম্নবিত্ত কিংবা পিতৃমাতৃহারা শিশু ছাড়া বেশিরভাগ মানুষই সংসার জীবনের কঠিন দায়ভার থেকে মুক্ত থাকে শৈশব-কৈশোর ও যৌবনের উদ্দাম সময়ে। সাংসারিক কূটচালকে নগণ্য জ্ঞানে ফুত্কারে উড়িয়ে দেবারই বয়স সেটা। কারণে-অকারণে প্রেমের পথও খোলা থাকে অবারিতভাবে। সে কারণে ওই বয়সে বাঁধভাঙা জোয়ারে নিজেকে ভাসাতে কষ্ট হয় না কারও। এরপর যখন সংসার জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, দায়িত্বভার চেপে বসে ঘাড়ে, তখন থেকেই সংসারের ঘানিতে নিষ্পেষিত হতে থাকে মধুর স্মৃতির ভাণ্ডার। তারপর বয়স যত ত্রিশ-চল্লিশ হতে থাকে ততই চালসে হতে থাকে জীবন। পঞ্চাশ পার করার পর মনে হতে পারে, এবার জীবন সূর্য পশ্চিম দিকে হেলতে শুরু করেছে। যাবার সময় চলে এল। যদিও পশ্চিমা বিশ্বে বয়স সত্তর হলেও তারা মানসিক ভাবেও ধরে যে জীবনসূর্য এখন মাঝগগনে মাত্র। তারা আশি পার হলেও মনে করেন না যে, জীবনটা হয়ে গেল ধুলিধূসরিত পরিবর্তনহীন অচলায়তন মাত্র। কিন্তু আমরা যদি একটু চিন্তা করি সিরিয়া কিংবা আফ্রিকার গৃহযুদ্ধ ও দারিদ্রযুদ্ধে বিধ্বস্ত সেই সব শিশুর কথা, যাদের শৈশব বলে কিছু নেই! তাদের কৈশোর যৌবন যেন কয়লার চেয়েও বেশি কালো। তাহলে তাদের মধুর স্মৃতির কী হবে? মধুর স্মৃতি বলে কি কিছু থাকবে না তাদের? কোনো জনপদে যদি অস্থিরতা না থাকে কয়েক যুগ ধরে, কিংবা যদি দেশে জাতি-দাঙ্গার দাবানল না জ্বলে, যদি অন্ন-কষ্টে মানুষের প্রাণ না যায়, যদি শিশুরা রাস্তায় ভিক্ষে না করে বা এক মুঠো ভাতের জন্যে বারো চোদ্দ ঘণ্টা কায়িক শ্রম করার বদলে স্কুলে যেতে পারে পেট পুরে খেয়ে, তা হলে আজ যে শিশুটি জন্মগ্রহণ করল, সে এই সামাজিক সুখের স্মৃতিকেই স্বাভাবিক ভাবে জানতে পারবে, অনুভব করতে পারবে। এর থেকেই ব্যক্তিগত সুখের অনভূতি আর কী আছে! এই নিশ্চয়তা যেসব রাষ্ট্র দিতে সেসব রাষ্ট্র মানব জাতিরই মঙ্গল সুনিশ্চিত করে।  লেখক : সাংবাদিক, শিক্ষক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন