নকল ও ভেজাল স্যালাইন

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০১৪, ২১:২৭
‘ডায়রিয়া’ শব্দটি কয়েক দশক আগেও এই জনপদে এক আতঙ্কের নাম ছিল। যেই ব্যাকটেরিয়া দূষিত পানি দ্বারা বাহিত হইয়া মানুষের শরীরে প্রবেশ করে, অতঃপর পরিপাকতন্ত্রে ঝড় তুলিয়া ঘন ঘন নিষ্ক্রান্ত হইবার সময় বাহির করিয়া দেয় শরীরের জলীয় অংশ এবং হইয়া ওঠে প্রাণঘাতী—সেই ভয়ঙ্কর রোগটি আরোগ্য হইয়া যায় অতি সহজ এক দাওয়াইয়ে, যাহা ‘ওর স্যালাইন’ নামে পরিচিত। সহজ, সস্তা ও অনায়াস প্রয়োগের ফলে খাবার স্যালাইন এক অর্থে জীবনদানেরই প্রতিরূপ হইয়া উঠিয়াছে। সেই জীবনদায়ী স্যালাইন যদি, শুধুমাত্র অধিক মুনাফার আশায়, বিষাক্ত রাসায়নিক দিয়া তৈয়ার করা হয়, তবে তাহা প্রাণ না বাঁচাইয়া প্রাণ কাড়িয়া লইতেই অধিক ভূমিকা রাখিবে। অনেকদিন ধরিয়াই ভেজাল বা নকল স্যালাইন তৈয়ারির কথা পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়া আসিতেছে। গ্রীষ্মের শুরুতে ডায়রিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধি ঘটায় আসলের সহিত নকলের রমরমা বাজার সৃষ্টি হয়। কয়েকদিন পূর্বে রাজধানীর উত্তর বাড্ডার সাতারকুলে ধরা পড়িয়াছে নকল স্যালাইন তৈয়ারির জরাজীর্ণ একটি টিনশেড কারখানা। সেইখানকার নোংরা পরিবেশ, ছড়াইয়া থাকা স্যালাইন তৈয়ারি বিষাক্ত রাসায়নিক উপকরণ ও বর্জ্য দেখিয়া আমাদের প্রাণ আঁতকাইয়া উঠে। কেননা, এই সকল দূষিত ও বিষাক্ত উপকরণ দিয়াই তৈয়ারি হইতেছিল উদরাময়ের জীবনরক্ষাকারী আইসিডিডিআরবি সিলযুক্ত রাইস স্যালাইন, যাহা রাজধানীর মিটফোর্ড হইয়া সারাদেশে ছড়াইয়া পড়িত। স্যালাইনে ব্যবহূত পটাশিয়াম ক্লোরাইড পরীক্ষায় জানা গিয়াছে, তাহা খাদ্য হিসাবে উপযুক্ত নহে, বিপজ্জনক। বিপদের কথা হইল—মুনাফা একটু বেশি করিবার লোভে কিছুটা অল্প দামে নকল স্যালাইন ক্রয় করিয়া বিক্রয় করিতেছে অসংখ্য খুচরা ঔষধের বিক্রয়ের দোকান। অবশ্য আইসিডিডিআরবি-র বিরুদ্ধেও অভিযোগ রহিয়াছে যে, তাহাদের স্যালাইনেরও আইনগত বৈধতা নাই। সকল ঔষধ উত্পাদন ও বাজারজাত করিতে দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশন গ্রহণ বাধ্যতামূলক হইলেও, আইসিডিডিআরবি-র কর্মচারী সমিতির তৈয়ারি রাইস স্যালাইনটিরও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কোনো রেজিস্ট্রেশন নাই। তাহারা বড় প্রতিষ্ঠানের ছত্রছায়ায় এই স্যালাইন উত্পাদন করে বিধায় ইহার মান লইয়া সম্ভবত প্রশ্ন উঠে নাই। কিন্তু এই সুযোগটিই গ্রহণ করিয়াছে বেশকিছু অসাধু চক্র। নকল ও ভেজাল স্যালাইন তৈরির দুষ্কর্মটি অসাধু চক্রের ব্যবসায়ীরা মাসের পর মাস ধরিয়া করিয়া আসিতেছিল। তথ্যানুযায়ী, রাজধানীর উত্তর বাড্ডার সাতারকুলে একটিমাত্র কারখানা হইতেই যদি প্রতিদিন দৈনিক আট হাজার প্যাকেট স্যালাইন তৈরি করিয়া বাজারজাত করা হয়, তাহা হইলে এক মাসে প্রায় আড়াই লক্ষ রোগীর কাছে পৌঁছায় এই বিষাক্ত স্যালাইন! বাণিজ্যের হিসাবে, ওই নকল কারখানা প্রতি প্যাকেটে তিন টাকা লাভ করিয়া থাকে। সেই হিসাবে শুধুমাত্র ওই একটি জীর্ণ কারখানার মাসিক নীট মুনাফা প্রায় সাত লক্ষ টাকার কাছাকাছি! জীর্ণ ছোট্ট কারখানা হিসাবে এই টাকার অঙ্ক অনেক বড় হইলেও জীবন নষ্টের অঙ্কের কাছে তাহা অতি নগণ্য। যাহারা প্রাণধ্বংসের খেলায় মাতেন সামান্য লাভের আশায়, তাহাদের একটিমাত্র শব্দে ‘গণশত্রু’ বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। তাহারা নিকৃষ্টতম। ইহা কি তাহারা ও তাহাদের ব্যবসায়িক সহযোগীরা বোঝেন?

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন