(গতকাল প্রকাশের পর)
ব্যবসায়ের ক্ষেত্র সমপ্র্রসারণ:
সামাজিক ব্যবসা প্রবর্তনের পর বাজার হঠাত্ করেই যেন একটা কিছু অভিনব ও আগ্রহ উদ্দীপক বিকল্প খুঁজে পায়, ক্রমে এ ব্যবসা হয়ে উঠে আরও কৌতূহলোদ্দীপক, আকর্ষণীয় ও প্রতিযোগিতামূলক। সামাজিক ব্যবসার প্রচারণার বিষয়টি সমান মর্যাদায় বাজারে এসে যায়, অনেক ক্ষেত্রেই বিজ্ঞাপন বা প্রচারণায় অর্থব্যয় ছাড়াই।
সামাজিক ব্যবসা একই বাজারে মুনাফামুখী ব্যবসার পাশাপাশি তার তত্পরতা চালাবে। অনেক সময় এ ব্যবসা সনাতন ব্যবসার সাথে প্রতিযোগিতায় নামবে, আর সনাতন মুনাফামুখী ব্যবসাকে কৌশলগতভাবে পিছু হটিয়ে দেবেও হয়তো। আর তাদের কাছ থেকে বাজারের ভাগও খসিয়ে নেবে ঠিক আর সব প্রচলিত ব্যবসার মতোই। যদি কোনো সামাজিক ব্যবসা কোনো একটি বিশেষ পণ্য বা সেবা বাজারে নিয়ে আসে যা মুনাফামুখী ব্যবসাও তৈরি ও বিক্রি করে তাহলে সেক্ষেত্রে গ্রাহক ঠিক করবে কাদের পণ্য কিনবে বা কাদের সেবা গ্রহণ করবে। যেমনটি এখন তারা বিভিন্ন প্রতিযোগী মুনাফামুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্য থেকে বাছাই করে থাকে। তারা বিচার-বিবেচনা করে দেখবে পণ্য বা সেবার দাম, গুণমান, সুবিধা, প্রাপ্যতা, ব্রান্ড ভাবমূর্তি ইত্যাদি চিরাচরিত বিষয় যা গ্রাহকদের পছন্দকে প্রভাবিত করে থাকে। এক্ষেত্রে একটি অতিরিক্ত বিষয় বা কারণ গ্রাহককে প্রভাবিত করবে সেটা হলো সামাজিক ব্যবসা যেসব সামাজিক উপকার নিয়ে আসে। সামাজিক ব্যবসা কোম্পানিগুলো নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করবে। কোনো ব্যবসায়ী কত বেশি দক্ষতার সঙ্গে সমাজের সমস্যার সমাধান দিতে পারে তার উপর নির্ভর করবে প্রতিযোগিতার সাফল্য। যদি একই বাজারে দুই বা ততোধিক সামাজিক ব্যবসা কোম্পানি ব্যবসা পরিচালনা করে তাহলে সেটা গ্রাহক ঠিক করবে কোন্ কোম্পানিকে তারা বেছে নেবে। এখানে আবার বেশিরভাগ গ্রাহকের জন্য প্রধান সিদ্ধান্ত নির্ধারক হবে পণ্য ও সেবার মান। তবে সামাজিক ব্যবসাসমূহের মধ্যে যে প্রতিযোগিতা হবে সেটা হবে বন্ধুত্বপূর্ণ, পরস্পরের প্রতি সম্মান দেখিয়ে, যে এগিয়ে যাবে তাকে অন্যরা বাহবা দেবে। কারণ তাদের লক্ষ্য এক—সমাজের মঙ্গল করা। এই প্রতিযোগিতা সনাতন ব্যবসার প্রতিযোগিতার মতো পরস্পর বিধ্বংসী প্রতিযোগিতা হবে না।
বিনিয়োগ আকর্ষণ করার ব্যাপারেও সনাতন ব্যবস্থার মধ্যে প্রতিযোগিতা হয়। মুনাফামুখী কোম্পানিগুলো মূলধন বা বিনিয়োগ পাবার জন্য প্রতিযোগিতায় নামে। এখানে তাদের মধ্যে যে বিষয় নিয়ে প্রতিযোগিতা হয় তা হলো ভবিষ্যতে আরও বেশি মুনাফা করার সম্ভাবনা কার কত বেশি, সমপ্রসারণের সুযোগ কার কত বেশি ইত্যাদি। যদি বেশিরভাগ বিনিয়োগকারী মনে করে, দুই কোম্পানির মধ্যে ‘ক’ কোম্পানি ‘খ’ কোম্পানির চেয়ে বেশি মুনাফা করতে সক্ষম তাহলে বিনিয়োগকারীর দল ‘ক’ কোম্পানির শেয়ার কিনতে ছুটবে। তারা আরও আশা করে যে, তারা কোম্পানির শেয়ার মূল্য বাড়ার কারণেও লাভবান হবে। কোম্পানির সম্পদ বাড়ার কারণে শেয়ারের মূল্যমান বেড়ে যাবে। এ বিষয়টি ইতিবাচক একটা চক্রের সূচনা করে, যার কারণে ‘ক’ কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়ে চলবে ও তাতে বিনিয়োগকারীরা খুশি হবে।
এর উল্টো ঘটনা ঘটে সামাজিক ব্যবসার ক্ষেত্রে। যখন দুটি সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগকারী পেতে প্রতিযোগিতায় নামে তাদের ঐ প্রতিযোগিতা সর্বাধিক ভবিষ্যত্ মুনাফা করার ভিত্তিতে হয় না, প্রতিযোগিতা হয় কে কী পরিমাণ সামাজিক উপকার নিশ্চিত করতে পারবে তার ভিত্তিতে। প্রতিটি সামাজিক ব্যবসায় দাবি করবে যে, সমাজ ও পৃথিবীর জনসাধারণকে তারা তাদের প্রতিযোগীর চেয়ে আরও ভালো সেবা প্রদান করতে পারবে, সামাজিক সমস্যা দ্রুত ও নিশ্চিত সমাধান দিতে পারবে। আর এ ব্যবসা তাদের দাবির সপক্ষে একটা ব্যবসায় পরিকল্পনা গড়ে তুলে তার পক্ষে প্রচারণা চালাবে। সামাজিক ব্যবসায়ের বিনিয়োগকারীরা বিভিন্ন সামাজিক ব্যবসার পরিকল্পনাগুলো পুংখানুপুংখরূপে যাচাই করে দেখবে। কারণ তারা তো তাদের অর্থ বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা করেছে সমাজের উপকারের জন্য। তারা নিশ্চিত হতে চাইবে তাদের বিনিয়োগ সর্বাধিক কল্যাণ নিয়ে আসবে। যেমন মুনাফা প্রত্যাশী বিনিয়োগকারীরা আগামীতে সবচেয়ে বেশি মুনাফা প্রত্যাশা করে, প্রত্যাশা করে তাদের স্টক-শেয়ারের দামও বাড়বে, তেমনি একজন সামাজিক বিনিয়োগকারীও চাইবে তার কোম্পানি, যেটি সমাজের কোন সমস্যা সমাধানে নিয়োজিত, সেটি যেন লক্ষ্যের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছুতে পারে।
এমনিভাবে, প্রতিযোগী সামাজিক ব্যবসা তাদের দক্ষতা বাড়াতে পরস্পরের সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হবে এবং আরও ভালোভাবে মানুষ ও পৃথিবীর সেবা করবে। সামাজিক ব্যবসার এটা এক বিরাট শক্তি। সামাজিক ব্যবসা মুক্তবাজার প্রতিযোগিতার সুবিধাগুলো নিয়ে আসে সামাজিক উন্নয়নের ভুবনে।
সামাজিক ব্যবসায় বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য আমি একটা আলাদা স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান প্রস্তাব করছি। যে স্টক এক্সচেঞ্জ ‘সামাজিক স্টক মার্কেট’ নামে পরিচিত হবে। আর এ বাজারে তালিকাভুক্ত থাকবে কেবল সামাজিক ব্যবসার কোম্পানিগুলো। সামাজিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার কেনাবেচার জন্য এরকম একটি বাজার থাকলে তা থেকে অনেক উপকার পাওয়া যাবে। এই বাজার তারল্য তৈরি করবে, নগদায়ন সম্ভব হলে শেয়ার মালিকদের পক্ষে সামাজিক ব্যবসায়ে প্রবেশ ও প্রয়োজনে বেরিয়ে যাওয়া সহজ হবে। যেমন মুনাফামুখী ব্যবসাগুলোর বেলায় তা সম্ভব তাদের স্টক এক্সচেঞ্জ থাকার কারণে। সামাজিক স্টক এক্সচেঞ্জ এর মাধ্যমে সম্ভব হবে সামাজিক ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলোর জনযাচাই ও মূল্যায়ন। ফলে একটা স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা গড়ে উঠবে সরকারি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার পরিপূরক হিসেবে এর ফলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে, বাজারের সম্ভাব্য সমস্যা, যেমন প্রতারণা, মিথ্যা প্রতিবেদন, ফাঁপিয়ে তোলা দাবি, ছদ্ম ব্যবসা ইত্যাদি সামাল দিতে পারবে, আর এতে জনসমক্ষে সামাজিক ব্যবসা ভাবমূর্তির উন্নতি হবে। আসবে আরও অর্থ, আরও উদ্যম, বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা, উভয় পক্ষ থেকেই।
দুই ধরনের সামাজিক ব্যবসা
সামাজিক ব্যবসার ধারণা বিকশিত হবার এই প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা এ ব্যবসার সাধারণ একটা রূপরেখা মাত্র পেতে পারি। কাল পরিক্রমায় একদিন সামাজিক ব্যবসা গোটা পৃথিবী জুড়ে গড়ে উঠবে, আর সুনিশ্চিতভাবেই এ ব্যবসার বৈশিষ্ট্য ও আকার-আঙ্গিকগুলো সুসমন্বিতভাবে দাঁড়িয়ে যাবে। এখন আমি দুই ধরনের সামাজিক ব্যবসার কথা তুলে ধরছি।
প্রথম ধরনের ব্যবসার কথা আমি ইতিমধ্যেই বলেছি। এ কোম্পানিগুলো তার মালিকের জন্য সর্বোচ্চ মুনাফা করার পরিবর্তে সামাজিক উপকার সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাবার ওপর মনোনিবেশ করে। এ দারিদ্র্য হ্রাস, গরিবের জন্য স্বাস্থ্য পরিচর্যা, সামাজিক ন্যায় বিচার, টেকসই প্রযুক্তি ইত্যাদিকে লক্ষ্য করে এসব ব্যবসা গড়ে উঠবে। এ ব্যবসার বিনিয়োগকারীরা আর্থিক দিক থেকে পুরস্কৃত হবার চেয়ে আত্মিক সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দেয়।
দ্বিতীয় ধরনের ব্যবসা ভিন্ন ধরন ও শৈলীতে পরিচালিত হবে। এগুলো হবে সর্বোচ্চ মুনাফাকারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিন্তু এর মালিকানা থাকবে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী। এ ধরনের ব্যবসার ক্ষেত্রে সামাজিক উপকারটি আসে এই যে এই ব্যবসার মুনাফা ও শেয়ারের মূল্যমান বৃদ্ধির সুফল সরাসরি গরিবদের হাতে যাবে আর তার ফলে গরিব মানুষের দারিদ্র্য কমে আসবে, কিংবা তারা পুরোপুরি দারিদ্র্যমুক্ত হবে। দরিদ্র মানুষকে মুনাফার সুযোগ দিয়ে দারিদ্র্যমুক্ত করাই হলো এই সামাজিক ব্যবসার লক্ষ্য।
এখন দুটি সামাজিক ব্যবসার মধ্যে পার্থক্যগুলো লক্ষ্য করুন। প্রথম ধরনের সামাজিক ব্যবসার বেলায় পণ্য, সেবা বা ব্যবসার পরিচালনা পদ্ধতির প্রকৃতিই সমাজ কল্যাণ সাধন করে। এ ধরনের সামাজিক ব্যবসার গরিবদের সহায়তার জন্য তাদের জন্য যথা উপযুক্ত পণ্য দিতে পারে। এ ধরনের ব্যবসা পরিবেশকে দূষণমুক্ত করতে পারে, সামাজিক বৈষম্য কমাতে পারে, মাদকাসক্তি, পরিবারিক সহিংসতা, বেকারত্ব বা অপরাধ হ্রাস বা উপশমে কাজ করতে পারে। কোনো ব্যবসা এ ধরনের লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করার পাশাপাশি পণ্য ও সেবা বাবদ আয়ের অর্থে খরচ মেটাতে সক্ষম হলে তাকে সামাজিক ব্যবসা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়। এ ব্যবসা তার বিনিয়োগকারীদেরকে কোনো মুনাফা প্রদান করে না। শুধু তারা বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পায়।
দ্বিতীয় ধরনের সামাজিক ব্যবসার আওতায় যেসব পণ্য সামগ্রী বা সেবা উত্পাদিত হয় তাতে অন্য কোনো পণ্য বা সেবা থেকে আলাদা কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। এ ধরনের কোম্পানি সামাজিক উপকার তৈরি করে শুধু গরিব মানুষকে ব্যবসার এবং সম্পদের মালিক বানিয়ে দিয়ে। এ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক হন গরিব ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষ (এই গরিব ও সুবিধাবঞ্চিতদের সংজ্ঞা আগে থেকেই নির্ধারণ করে দেয়া থাকবে)। কোম্পানির লাভ অভাবী মানুষের উপকারে যাবে।
সামাজিক ব্যবসা ও সামাজিক উদ্যোগের (স্যোশাল ইন্টারপ্রেনিয়রশিপ) পার্থক্য
অনেক লোকই সামাজিক ব্যবসার কথাটা যখন প্রথমবারের মতো শোনে তখন মনে করে ‘আমি তো এ সম্বন্ধে জানি, এটা স্যোশাল ইন্টারপ্রনিয়রশিপের আরেক নাম।’ কেননা, প্রথমবার শুনলে সামাজিক ব্যবসাকে সামাজিক উদ্যোগ বলে মনে করা হয়। আমার বন্ধু বিল ড্রেটন তাঁর অশোকা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সামাজিক উদ্যোগের ধারণাকে পূর্ণাঙ্গতা দিয়ে একটা বিশ্ব আন্দোলন গড়ে তুলেছেন।
আজ ‘সামাজিক উদ্যোগ’ একটা স্বীকৃত আন্দোলন। অশোকা ফাউন্ডেশন ছাড়াও আরও কয়েকটি ফাউন্ডেশন যেমন: জেফ স্কোল (ই’বে-র প্রথম কর্মী ও সিইও) প্রতিষ্ঠিত স্কোল ফাউন্ডেশন ও ক্লাউস শোয়াব (ওয়ার্ল্ড ইকনমিক ফোরাম-এর প্রতিষ্ঠাতা) প্রতিষ্ঠিত শোয়াব ফাউন্ডেশন ফর স্যোশাল এন্টারপ্রেনিয়রশিপসহ অনেক ফাউন্ডেশন রয়েছে যারা সামাজিক উদ্যোগ উন্নয়নে আত্মনিবেদিত। বিশ্বের সর্বত্র সামাজিক উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করা, তাদেরকে সহায়তা ও উত্সাহ দেয়াই এই ফাউন্ডেশনসমূহের মিশন।
‘সামাজিক উদ্যোগ’ ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ উভয়ের মাঝেই একটা পরিচিত ধারণা হয়ে উঠেছে। আমেরিকান বিজনেস ম্যাগাজিন ‘ফাস্ট কোম্পানি’ ফি বছর ২৫ জন সেরা সামাজিক উদ্যোক্তার তালিকা প্রকাশ করে। এটা তারা করে বিশ্বের সবচেয়ে কার্যকর সমাজ সেবা সংগঠনগুলোকে মনোযোগের উজ্জ্বল প্রদীপের নিচে এনে তাদের কয়েকটিকে তহবিলের ব্যবস্থা করে দেয়ার জন্য। ‘সামাজিক উদ্যোগ’ এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য বিষয়ের মর্যাদা পেয়েছে। আর এভাবে জ্ঞানচর্চার এ বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের আনুমানিক ৩০টি উচ্চতর ব্যবসায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রমের তালিকাভুক্ত হয়েছে। ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুকুয়া স্কুল অব বিজনেস-এ বর্তমানে শিক্ষকতায় নিয়োজিত ড. জে গ্রেগরি ডি’স এ বিষয়ে প্রথম কোর্স চালু করেন ১৯৯৫ সালে হার্ভার্ডে।
‘সামাজিক উদ্যোক্তা’ ধারণাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে সব সমস্যার মোকাবেলায় অপরিহার্যতাবোধ থাকা দরকার সে সব সমস্যার একটা কিছু হেস্তনেস্ত করতে মানুষের মনে এ ধারণা একটা শক্তিশালী ইচ্ছাশক্তির সৃষ্টি করে। এ আন্দোলন আজ এ ধারণাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বলেই আমরা আজ পৃথিবী জুড়ে দেখতে পাই যে, একটা সুবিশাল পরিসরের বহুলোক অন্য মানুষের সাহায্য-সহায়তার জন্য দারুণ সব কাজ করে চলেছে। গ্রামীণ ব্যাংক ও তার অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রায়ই এ আন্দোলনের তাত্পর্যপূর্ণ প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে।
সামাজিক ব্যবসা সামাজিক উদ্যোগেরই একটা উপশাখা। যারা সামাজিক ব্যবসার পরিকল্পনা করে সামাজিক ব্যবসা পরিচালনা করে তারা সবাই সামাজিক উদ্যোক্তা। কিন্তু সব সামাজিক উদ্যোক্তা সামাজিক ব্যবসায় নিয়োজিত নয়।
সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল কোম্পানি
সনাতন মুনাফামুখী ব্যবসায়ের ব্যবস্থাপকরা কোম্পানিকে সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল রূপে তৈরি করার চেষ্টাও করেছেন। এ প্রয়াসের অন্তর্ভুক্ত হয়ে কখনও সখনও একটা মুনাফাকারী ব্যবসা মুনাফার সাথে সাথে কিছু সামাজিক সুবিধে বা সেবা প্রদান করে। কর্পোরেশনগুলো এ পদক্ষেপ কয়েকটি কারণে নিতে পারে : কোম্পানির মালিকের বা কোনো ক্ষমতাশালী কর্মকর্তার ব্যক্তিগত মূল্যবোধ কার্যকর করার জন্য কোম্পানির জন্য একটা অনুকূল প্রচারের সুবিধে লাভের জন্য, কিংবা নীতি বা ব্যবসাগত কিছু দোষ-ক্রটি থেকে থাকলে তা নিয়ে সমালোচনা এড়ানোর জন্য; যেসব গ্রাহক বা ভোক্তা লেনদেন বা কেনাকাটার ক্ষেত্রে ব্যবসার সামাজিক ভাবমূর্তিকে গুরুত্ব দেয় তাদেরকে আকর্ষণ করার জন্য; সরকারি নিয়ামক বা আইন পরিষদ সদস্য যারা কোম্পানিকে প্রভাবিত করার মতো আইন প্রণয়নের বিষয় বিবেচনা করছেন তাদের বন্ধুত্ব ও সমর্থন লাভের জন্য; যেসব সামাজিক সংগঠন বা জনস্বার্থরক্ষা গোষ্ঠী কোম্পানির সমপ্রসারণে বাধা দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধাচরণ কমানোর জন্য;
নতুন বাজার, যে বাজার এখন অলাভজনক হলেও আগামীতে প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে এমন বাজারে জায়গা করে নেয়ার জন্য আর সেই সাথে সাধারণ জনগণের সমর্থন পাবার জন্য। হয়তো বিভিন্ন উদ্দেশ্যাবলির কোনো মিশ্রণ একটা বিশেষ কোম্পানিকে একটি বিশেষ সিদ্ধান্তে নিয়ে যায়। তবে কোম্পানিগুলো যেহেতু সর্বোচ্চ মুনাফাকারী ব্যবসা সেহেতু তাদের সিদ্ধান্ত হবে সেই মুনাফা বাড়ানোর জন্য সহায়ক। তাই এসব কোম্পানির কোনো সামাজিক কল্যাণের লক্ষ্য থাকতেও পারে, তার জন্য তারা কাজ ও করতে পারে কিন্তু সব কিছুই গৌণ হয়ে যায়, যদি তা ব্যবসার মূল লক্ষ্য অর্থাত্ মুনাফার সাথে সংঘাত দেখা দেয়।
পরিশেষে আমি বলব আমি যেসব সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে আলোচনা করেছি, যেমন: সমবায়, মুনাফাবর্জিত উদ্যোগ, বা সামাজিক পর্যায়ে দায়িত্বশীল মুনাফাকারী ব্যবসা কোনোটার মাঝেই সত্যিকার সামাজিক ব্যবসার মৌলিক শক্তি নিহিত নেই। আর সে কারণেই বিশ্বজুড়ে জোরালো আবেদন রয়েছে এই নতুন ধারণা সামাজিক ব্যবসাটা পরখ করে দেখার জন্য। যখন সামাজিক ব্যবসার ধারণা সুপরিচিত হয়ে উঠবে, আর বিশ্বের সকল দেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করবে, যখন এই নতুন ব্যবসায়ের চলার পথে নতুন সৃষ্টির ঢল নামবে তখন আমাদের এ বিশ্বের নব রূপান্তরের অমিত সম্ভাবনার পথ খুলে যাবে।
সামাজিক ব্যবসা কারা করবে?
সামাজিক ব্যবসার ধারণা এখনও নতুন, অপরিচিত। এ ব্যবসা কে সৃষ্টি করবে, কেন করবে, এ বিষয়টা গোড়ায় কল্পনা করা বেশ শক্ত মনে হতে পারে। সকলেই সনাতন ব্যবসা উদ্যোক্তাকে জানে, চেনে। আর এসব উদ্যোক্তার সুখ্যাতি বা কুখ্যাতি যা-ই থেকে থাকুক তাদের মূল্যবোধ ও লক্ষ্য আমাদের মোটামুটি জানা। সামাজিক ব্যবসার প্রতিষ্ঠাতাদের বেলায়ও এক সময় এই একই কথা একদিন প্রযোজ্য হবে কিন্তু এখন সে পরিচিতি নেই।
আমার ধারণা, সুযোগ পেলে প্রতিটি মানুষই সামাজিক ব্যবসায়ের সম্ভাবনাময় অংশীদার হতে এগিয়ে আসবে। সামাজিক ব্যবসায়ের জন্য প্রেরণার উত্স প্রতিটি মানুষের অন্তরে নিহিত রয়েছে। আমরা নিত্য মানুষের এ অন্তর্নিহিত প্রেরণার স্ফুলিঙ্গ প্রত্যক্ষ করি। মানুষ তাদের পৃথিবীর ব্যাপারে যত্নবান, তাদের পরস্পরের প্রতিও। মানুষের মাঝে পরোপকারের একটা সহজাত প্রেরণা রয়েছে। তারা তাদের নিকটজনের জীবনের উন্নয়ন কামনা করে। আর যদি সুযোগ হয় তারা চায় এমন একটা পৃথিবীতে বসবাস করতে যেখানে অভাব, রোগ-ব্যাধি, ও অকারণ দুঃখ-দুর্দশা নেই। এ কারণেই মানুষ স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে শত শত কোটি টাকা দান করে দাতব্য কর্মসূচিতে ও সমাজ সেবার উদ্যোগে। তারা এমনকি তুলনামূলকভাবে কম পারিশ্রমিক পেলেও সমাজসেবা খাতে ক্যারিয়ার গড়ায় নিজের জীবন উত্সর্গ করে। আর এই একই প্রেরণা বহু লোককেই সামাজিক ব্যবসায়ে নিয়ে আসবে যখন এই নতুন পথ সুপরিচিত হয়ে উঠবে, মানুষ একে ভালো করে উপলব্ধি করবে।
ভবিষ্যতের সামাজিক ব্যবসার সৃষ্টি যেসব সুনির্দিষ্ট উত্স থেকে হতে পারে তার প্রারম্ভিক কয়েকটির বর্ণনাঃ
সকল আকার ও আয়তনের কোম্পানি তাদের নিজস্ব সামাজিক ব্যবসা শুরু করতে চাইবে। অনেকে তাদের বর্তমান ‘সামাজিক দায়িত্বশীলতা’ (সি.এস.আর) কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে মুনাফার একটা অংশ সামাজিক ব্যবসায় বিনিয়োগ করবে। অন্যেরা সমাজের বঞ্চিতদের সাহায্য করার পাশাপাশি নতুন বাজারের সন্ধানে সামাজিক ব্যবসা সৃষ্টি করবে। তারা অন্যান্য কোম্পানি বা সামাজিক ব্যবসায় উদ্যোক্তাদের সহায়তায় ও তাদের সাথে অংশীদারিত্বে নিজেরাই সামাজিক ব্যবসা তৈরি করবে।
ফাউন্ডেশনগুলো সামাজিক ব্যবসায়ের জন্য পৃথক বিনিয়োগ তহবিল গড়ে তুলবে। ফাউন্ডেশনগুলো সাধারণত সনাতন দাতব্য কর্মক্ষেত্রে তাদের অর্থদান করে থাকে। তবে তার পাশাপাশি ফাউন্ডেশনগুলো সামাজিক ব্যবসা তহবিল গঠন করতে পারে। সামাজিক ব্যবসা তহবিলের সুবিধে হলো এই যে এ তহবিলের অর্থ কখনও শেষ হবে না, একই সঙ্গে তহবিলের টাকায় সামাজিক উপকার পাওয়া অব্যাহত থাকবে। ফাউন্ডেশনের সামর্থ্য সমপ্রসারণের জন্য এই তহবিলের অর্থ কাজে লাগানো যাবে।
বিশ্বব্যাংক এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোসহ আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় দাতারা আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে গৃহীত সামাজিক ব্যবসা উদ্যোগগুলোকে সহায়তা দেয়ার জন্য সামাজিক ব্যবসা তহবিল গঠন করতে পারে। এ ছাড়া বিশ্বব্যাংক এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলো সামাজিক ব্যবসাকে সহায়তা করার জন্য নিজ নিজ অঙ্গ প্রতিষ্ঠান বা সাবসিডিয়ারী গঠন করতে পারে, যেমন: স্যোশাল বিজনেস ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক, ইত্যাদি।
সামাজিক ব্যবসাকে সহায়তা ও এ ব্যবসাকে উত্সাহিত করার জন্য বিভিন্ন দেশের সরকার এবং স্থানীয় সরকার সামাজিক ব্যবসা উন্নয়ন তহবিল গঠন করতে পারে। সনাতন ব্যবসা এবং সামাজিক ব্যবসা- এ দুই বিকল্প পথের মধ্যে কোনটাকে ব্যক্তিবিশেষ, কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীরা বেছে নেবে? বলা বাহুল্য, শুরুতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মুনাফামুখী ব্যবসা এবং সামাজিক ব্যবসা-দুটোতেই অংশ নেবার আগ্রহ থাকবে। তাদেরকে কোনো একটাকে ছেড়ে শুধু একটাকে বেছে নিতে হবে এমন বাধ্যবাধকতায় পড়তে হবে না। তবে মুনাফামুখী ব্যবসা আর সামাজিক ব্যবসার মধ্যে ব্যক্তিবিশেষের লক্ষ্যের বিচার-বিবেচনায় বিভিন্ন অনুপাতে বিনিয়োগ হতে পারে। যেমনঃ
কোনো ব্যক্তিবিশেষের কিছু মূলধন থাকলে সে তার একটা অংশ ব্যক্তিগত মুনাফাকারী ব্যবসায় ও অবশিষ্টাংশ সামাজিক ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে পারে।
ব্যক্তিগত মুনাফাকারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক বোর্ড তাদের বছরের মুনাফার অংশবিশেষ আরেকটি মুনাফামুখী কোম্পানি কেনায় বিনিয়োগ করতে পারে যার উদ্দেশ্য হবে নতুন বাজারে তাদের ব্যবসা সমপ্রসারণ, আর বাকি অংশ একটা সামাজিক ব্যবসা শুরু করার জন্য কিংবা কোনো একটা চলমান সামাজিক ব্যবসার উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে পারে।
ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিষদ তাদের অর্থের একটি অংশ এক বা একাধিক সামাজিক ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে যেসব সামাজিক ব্যবসার লক্ষ্য আর ফাউন্ডেশনে যারা দান করে তাদের লক্ষ্য অভিন্ন। কিংবা ফাউন্ডেশন সামাজিক ব্যবসা তহবিলে বিনিয়োগ করতে পারে।
এমনকি, সারাজীবনের জন্য পেশা হিসেবে বেছে নেবার ব্যাপার হলে সামাজিক ব্যবসা এমন সব সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে যেগুলো আমাদের কাছে উপভোগ্য হবে। একই ব্যক্তি তার জীবনের একটা অংশ ব্যক্তিগত মুনাফাকারী ব্যবসায় কাজ করার জন্য ব্যয় করতে পারে; আরেক অংশ ব্যয় করতে পারে সনাতন দাতব্য, ফাউন্ডেশন বা এনজিওকর্মে অথবা সামাজিক ব্যবসায়। এই তিন রকমের কাজ ভিন্ন ভিন্ন সময়ে যেমন করতে পারে, তেমনি একই সঙ্গেও করতে পারে। এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের ব্যাপারটা নির্ভর করবে ঐ ব্যক্তির পেশা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বিশেষ আগ্রহ, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও নিজের সামাজিক ভাবনার ওপর, যা সময়ের সাথে সাথে বিবর্তিত হতে পারে।
তাই সামাজিক ব্যবসা কে বা কারা করবে, কখন করবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হবার কোনো কারণই নেই। বিনিয়োগের ক্ষেত্র বেছে নেবার বেলায়, যেমন জীবনের জন্য সিদ্ধান্ত নেবার বেলায়ও, মানুষ সিদ্ধান্ত নেবে যা তাকে সর্বোচ্চ সিষ্ট দেয়। আমরা মানুষেরা বহুমাত্রিক জীব। আর তাই আমাদের ব্যবসার কাঠামোকেও সমান বৈচিত্র্যময় হতে হবে। নতুন ধরনের ব্যবসা হিসেবে সামাজিক ব্যবসাকে পরিচিত ও উত্সাহিত করা হলে অচিরেই সংখ্যায় ও সম্ভাবনায় এটি প্রচলিত ব্যবসার সমকক্ষ হয়ে উঠবে। (সমাপ্ত)
লেখক:নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ
