ভারতের লোকসভা নির্বাচন এবং বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০১৪, ২১:২৫
ভারতে নির্বাচন শুরু হয়েছে। বলা হচ্ছে এই ভোট গ্রহণ হচ্ছে বিশ্বের সর্ব বৃহত্ গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চা। গত ৭ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া ভোট গ্রহণ চলবে ১৬ মে পর্যন্ত। ৫ সপ্তাহের জাতীয় নির্বাচনে যারা প্রথম ভোট দেন তাদের মধ্যে আছে উত্তর পূর্বাঞ্চলের প্রত্যন্ত আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যের ভোটাররা। ৮১ কোটি ৪০ লক্ষের বেশি নিবন্ধীকৃত ভোটার সংসদের নিম্ন কক্ষের সদস্য বেছে নিচ্ছে। ভারতের নির্বাচনের দিকে এখন বাংলাদেশের দৃষ্টি। কারণ বিশ্বের বৃহত্তম এই গণতন্ত্রের অতিনিকট প্রতিবেশী বাংলাদেশ। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের রয়েছে ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সম্পর্কে আর তাই প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসাবে ভারতের জাতীয় নির্বাচন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে কতখানি প্রভাবিত করবে তা-ই দেখার বিষয়। এই নির্বাচন আমাদের সাথে ভারতের পারস্পারিক সম্পর্ককে কিভাবে প্রভাবিত করবে তা আগে থেকেই অনুমান করা দুষ্কর। ভারতের সাথে আমাদের সীমান্ত সংযোগসহ অন্যান্য যে সকল বিষয়ে দ্বন্দ্ব আছে সে সকল দ্বন্দ্বের কি কোন বাস্তবিক চিরস্থায়ী সমাধান আসতে যাচ্ছে আসন্ন এই নতুন সরকারের আমলে? ভারতের সাথে আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারে বর্তমান সরকার বরাবরই ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু তারপরও তিস্তার পানি বণ্টনসহ নানা দ্বিপাক্ষিক বিষয়ে ভারতের সাথে আমাদের মত বিরোধ আছে। ধারণা করা হচ্ছে ভারতের সরকার পরিবর্তন বাংলাদেশের সাথে ভারতের আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ককে কিছুটা হলেও প্রভাবিত করবে। বিজেপি, কংগ্রেস না দুর্বল কোনো কোয়ালিশন? ৭এপ্রিল ভারতের লোকসভার প্রথম পর্বের নির্বাচনের শুরুতে সেখানে যেমন এটি আলোচনার বিষয়, ঠিক তেমনি বাংলাদেশেও তাই। কারণ বাংলাদেশের নাগরিকরা নিজেদের মত করে ভাবেন যে, ভারতের নতুন সরকারে কারা আসলে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের হিসেবটা কেমন হবে। আর তাতে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোন প্রভাব পড়বে কিনা? এখন দেখার বিষয় হচ্ছে যে, কোন দলটি আসলো ভারতের নবনির্বাচিত প্রধান মন্ত্রী হয়ে? কংগ্রেস নাকি বিজেপি? কংগ্রেস এবং বিজেপি উভয় দলই তাদের নির্বাচনী প্রচারণাই বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কের ব্যাপারে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করেছে। লোকসভার ৫৪৩ আসনের জন্য নির্বাচন হচ্ছে। আবারও এক জরিপ মতে, বিজেপি আগামী লোকসভা নির্বাচনে তার সর্বোত্তম ফলাফল লাভ করতে যাচ্ছে। এবিপি নিউজ-এসি নেলসন জরিপ মতে, বিজেপি ২১০টি আসন পেতে যাচ্ছে, অপরদিকে কংগ্রেস পেতে যাচ্ছে মাত্র ৮১টি আসন, যা এ পর্যন্ত কংগ্রেসের সর্বনিম্ন ফলাফল। জরিপ অনুসারে, বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট পেতে যাচ্ছে ২২৬টি আসন। সমপ্রতি প্রকাশিত আরো দুটি জরিপেও অনুরূপ ফলাফলের পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। সেই সাথে ধারণা করা হচ্ছে গুজরাটে ধর্মীয় মৌলবাদ ও গণহত্যায় অভিযুক্ত নরেন্দ্র মোদি ভারতের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পথে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে যে, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ জোট পাবে ১০১টি আসন, বামপন্থী দলগুলো ৩০টি আসন, বাকি ১৮৬টি পাবে অন্যান্য দলগুলো, যারা এনডিএ, ইউপিএ বা বাম কোন জোটেরই অংশ নয়। জরিপে যে দলগুলো ১৮৬ টি আসনে জয়ী হবে, তাদের দলগত তালিকা প্রকাশিত হয়নি। তবে আম আদমি পার্টি ১১টি আসন পাবে বলে উল্লেখ করা হয়। জরিপে এনডিএ এর শক্তিশালী অবস্থান দেখানো হয়েছে ভারতের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে। পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে গুজরাট, মহারাষ্ট্র ও মধ্যপ্রদেশ বিশেষভাবে উল্লেখ্য, যেখানে এনডিএ ১১৬টি আসনের ৮২টিতেই জয়লাভ করার কথা বলা হয়েছে। উত্তরাঞ্চলেও এনডিএ জোট শক্তিশালী, যেখানে তারা ১৫১টি আসনের মধ্যে ৮২টিতে জয়ী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিজেপি নেতৃত্বাধীন এই জোট পূর্বাঞ্চলে ১৪২ আসনের মাঝে ৪৩টি আসনে এবং দক্ষিণাঞ্চলে ১৩৪ আসনের মাঝে ১৯টি আসনে জয়ী হবে বলে জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে। অপরদিকে, ইউপিএ জোট জরিপ অনুসারে পূর্বাঞ্চলে ২২টি, পশ্চিমাঞ্চলে ২৮টি আসন পেতে পারে। দক্ষিণাঞ্চলে তারা ১৩৪ আসনের মাঝে ৭৬টিতে জয়ী হতে পারে। গত দুই লোকসভা নির্বাচনে জয়ের ক্ষেত্রে তামিলনাড়ু এবং অন্ধ্র প্রদেশে তাদের সমর্থন বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল, যে অবস্থান বর্তমানে নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। জরিপ অনুসারে, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে ৫৩ শতাংশ ভোটারের সমর্থন রয়েছে নরেন্দ্র মোদির পক্ষে, অপরদিকে রাহুল গান্ধীর পক্ষে সমর্থন ১৫ শতাংশের, অরবিন্দ কেজরিওয়াল-এর রয়েছে ৫ শতাংশের সমর্থন। আর ২৭ শতাংশের সমর্থন রয়েছে অন্যদের প্রতি। অনেকেই হয়তো অপেক্ষায় রয়েছেন লোকসভা নির্বাচনে মোদি-রাহুলের দ্বৈরথ দেখার। কিন্তু কংগ্রেস সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধী চোখ রাখছেন ২০১৯ সালের নির্বাচনে। রাহুল চাইছেন আগামী পাঁচ বছরে তরুণদের মাঝে কাজ করে নতুন প্রজন্মের কংগ্রেসী তৈরি করতে, নতুন করে রাজ্য শাখাগুলো সাজাতে। এজন্য তিনি নির্বাচনে নতুন মুখদের প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করানোর কথাও বলছেন। রাহুল দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন বলে সমপ্রতি এক জনসভায় তিনি উল্লেখ করেছেন। তার কথাতে জরিপের সত্যতাই প্রমাণিত হয়। কারণ তিনি জানেন জনসমর্থন তাদের সাথে নেই, গত দুইবারের শোষণ-শাসনের হিসেব তাদের দিতে হবে। যে হিসেব তাদের হাতে নেই। আর তাই তারা আগামী নির্বাচনে পরাজয়ের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন। তাই রাহুলের টার্গেট ২০১৯ সালের নির্বাচন। তরুণদের পার্টিতে ধরে রাখতে তিনি পার্টিকে নতুন মুখদের নির্বাচনে দাঁড় করতে অনুরোধ করেছেন। এক জনসভায় কংগ্রেস সহ-সভাপতি রাজ্যসভা, লোকসভাসহ সকল নির্বাচনেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণদের প্রার্থী করার জন্য পার্টির প্রতি আহ্বান জানান। রাহুলের চিন্তার প্রতিফলন ঘটানো হলে, বিভিন্ন রাজ্যের অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ নেতারা নির্বাচনের মনোনয়ন পাবেন না। আমলা-মুত্সুদ্দি পুঁজিপতিদের এই রাজনৈতিক দলে এর বিরূপ প্রতিক্রিয়াও তৈরি হতে পারে। অবশ্য কংগ্রেসের ভেতর থেকেই এর একটি সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে বলা হচ্ছে বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাদের সন্তানদের নতুন প্রজন্মের নেতা হিসেবে তুলে ধরার কথা। রাহুল সম্প্রতি নাগরিক সমাজ ও লেখকদের সাথে মতবিনিময় করার পর তার দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কথাই উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, কেবল নির্বাচনে জয় নয়, দরকার হলো নতুন নেতৃত্ব তৈরি করা। আর এজন্য নাগরিক সমাজ ও লেখকদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য মতে, ‘এই মানুষদের (নাগরিক সমাজ ও লেখক) কংগ্রেসে যোগ দিতে হবে না, কংগ্রেসকে সমর্থনও করতে হবে না তাদের, কিন্তু তাদের মতামতকে অবশ্যই গুরুত্ব সহকারে দেখতে হবে’। রাহুল গান্ধী বিশাল সমাবেশের মতো প্রচলিত নির্বাচনী প্রচারণা বাদ দিয়ে পূর্বের ন্যায় ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এবং রাস্তার মোড়ে মোড়ে সভা করে প্রচারণা চালানোর কথা বলেন তার দলের নেতা-কর্মীদের। মূলত কর্মীরাই বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা চালান, আর নেতারা বিশাল সমাবেশেই মজে থাকেন। সূত্র মতে, কংগ্রেস খুব শিগগিরই তার নতুন পরিকল্পনার প্রথম ঘোষণা দিতে যাচ্ছে। আর সেখানে রাহুল গান্ধীর চিন্তার প্রতিফলন দেখা যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভারতের নির্বাচন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। ১৯৭১ সালে মুজিব নগর সরকার গঠনের পর থেকেই কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক দিয়ে বাংলাদেশকে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে এসেছে কংগ্রেস সরকার। আর তাই স্বাভাবিকভাবেই ভারতের নির্বাচনের দিকে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় দলেরই দৃষ্টি রয়েছে। ভারতের নির্বাচনের প্রভাব বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বাংলাদেশের সাথে ভারতের অনেক অমীমাংসিত সমস্যার সুরাহা হয়নি। এর মধ্যে সীমান্ত চুক্তি ও ছিটমহল বিনিময় এবং তিস্তার পানি বণ্টনের মতো বিষয় রয়েছে। ছিটমহল বিনিময় নিয়ে বিজেপি খুব বেশি আগ্রহী না-ও হতে পারে। কারণ বিজেপির পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় অভিযোগ করা হচ্ছে আসামে অনেক বাংলাদেশি নাগরিক অবস্থান করছে। বিজেপির নির্বাচনী প্রচারণাতেও বাংলাদেশ ইস্যু ছিল। এমনকি এমন মন্তব্যও করা হয়েছে বাংলাদেশীরা ভারতীয়দের রিজিক হরণ করছে। অপর দিকে তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়ে মমতা ব্যানার্জির অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি। এখন পর্যন্ত জনমত জরিপ বলছে, পশ্চিমবঙ্গে মমতা তার শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখবেন। মমতাকে বাদ দিয়ে নরেন্দ্র মোদির সরকার এ সমস্যার সমাধানে আগ্রহী হবেন তা ভাবার কোনো কারণ নেই। বিজেপি ক্ষমতাসীন হলে ভারতের স্বার্থরক্ষার জন্য দেশটি বাংলাদেশের ওপর আরো বেশি চাপ প্রয়োগ করতে পারে। কারণ ভারত ভালো করেই জানে বাংলাদেশে বৈধতার সঙ্কটে থাকা একটি দুর্বল সরকার ক্ষমতাসীন। স্বাভাবিকভাবে এই সুযোগ ভারত নেয়ার চেষ্টা করবে। বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোর ইচ্ছা-অনিচ্ছা আরো বেশি গুরুত্ব পেতে পারে, যা বাংলাদেশের জন্য দু’দেশের সম্পর্কে জটিলতা বাড়াতে পারে। ভারতীয় রাজনীতির নানা হিসাব-নিকাশ শুরু হবে নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর। আঞ্চলিক দলগুলো নিয়ে কেন্দ্রে সরকার গঠনের লক্ষ্যে মমতার একটি প্রচেষ্টা না এগোলেও নির্বাচনের পর তার দল তৃণমূল কংগ্রেসের আসন প্রাপ্তি নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি করতে পারে। এমনকি তৃণমূল কংগ্রেস সরকার গঠনে বিজেপিকে সমর্থন দিলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। তবে এ কথা সত্য যে, ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন বাংলাদেশ নীতিতে অবশ্যই ভারতের আমলাদের বড় ধরনের প্রভাব থাকবে। যাদের বড় একটি অংশ বাংলাদেশের ব্যাপারে কংগ্রেসের নীতিকে সমর্থন করে থাকে। এ ক্ষেত্রে বিজেপি ক্ষমতাসীন হলে বাংলাদেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখবে এমন নয়। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষমতাসীনদের প্রতি কংগ্রেসের যে সর্বাত্মক সমর্থন তাতে কিছুটা ছেদ পড়বে তা নিশ্চিত করে বলা যায়। বিজেপি দিল্লির ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের অবস্থান কী হয় তা দেখার বিষয়। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার সব সময় এই ধারণা দিয়ে আসছে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিপক্ষে তারা নীতিগত অবস্থান নিয়েছে। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে কঠোরভাবে দমন করেছে। কিন্তু সেকুলার রাষ্ট্রের দাবিদার ভারতে সামপ্রদায়িক ও ধর্মবাদী একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষমতাসীন হওয়ার সম্ভাবনার ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা নীরব ভূমিকা পালন করছেন। এই নীরবতা তাদের কথিত নীতিগত অবস্থানের বিপরীত। বর্তমান সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় সেকুলার ভারতকে অনুসরণ করে আসছে কিন্তু ভারত এখন সাম্প্রদায়িক উগ্রবাদী রাজনীতির মডেল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ভারতের সেকুলার রাষ্ট্রের ধারণা কার্যত ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারপরও ধারণা করা হচ্ছে স্বার্থ রক্ষা হলে বৈদেশিক নীতিতে কোন পরিবর্তন আনবে না ভারত। লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়