‘বিশ্বমানব হবি যদি কায়মনে বাঙালি হ..’

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০১৪, ২১:২৫
বছর ঘুরে বৈশাখ আসে, আর আমরা ক্ষণিকের বাঙালি হয়ে যাই! বাঙালি হতে দিগ্বিদিক ছুটি। পহেলা বৈশাখে ঢাকা শহরে তো হাঁটার জায়গাও থাকে না। বাঙালি হতে অনেকেই ঘর থেকে ছোটেন পহেলা বৈশাখের এই দিনে। আমি একদিনের বাঙালি হতে চাই না। বৈশাখের ওই বিশেষ দিনটাতে সকালে পান্তা, শুঁটকি ভর্তা, ইলিশ খাই না। শহরে থাকলেও শরীর থেকে গাঁয়ের (গ্রামের) গন্ধ মুছে যায়নি এখনও; মন থেকে মুছে ফেলিনি বাঙালিয়ানা। ঘণ্টা, মাস, বছর ধরেই নিজেকে বাঙালি ভাবি। পূর্বপুরুষ তো যথার্থই বাঙালি ছিল। চিন্তা, উত্তর প্রজন্ম নিয়ে। আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব আর বিদেশি মিডিয়ার সর্বগ্রাসী দৌরাত্ম্যে দিন যত গড়াচ্ছে, ভাবি ছেলেগুলো বাঙালি থাকবে তো? ভিনদেশি দাপটে ওদের বাঙালি রাখাই তো কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘরে কখনো মুড়িমুড়কি, কড়িমুড়ালি, নিমকি কিংবা জিলাপি এনেছিতো আমার ছোট ছেলেটা ভেংচি কাটে। ওদের এগুলো মোটেও পছন্দ নয়। বড় ছেলেটাতো বলেই ফেলে, বাবা এগুলো ব্যাকডেটেড খাবার। রাগ করি না। ভাবি ওদের কি দোষ? আমরাই তো ওদের সাহেব বানিয়ে ফেলেছি। ওরা বলে পান্তায় নাকি লাখ লাখ ব্যাক্টেরিয়া জন্মে। আমার দাদাতো এগুলো খেয়েই ১শ ২২ বছর পার করেছেন। মৃত্যুর আগে কোন রোগবালাই দেখিনি। হাসপাতালে যাননি কখনও। জীবনের শেষ দিনের সকালেও বিনে চশমায় পত্রিকা পড়েছেন। তিনি পাট ব্যবসায়ী ছিলেন। অর্থকড়ির কমতি ছিল না। তবুও তার খাবার তালিকায় ছিল কেবলই বাঙালি খাবার। বিচিকলা, বাঙ্গী, খিরাই, মিষ্টি আলু, ডাল, ভাত ছিলো প্রিয় খাবার। আমার গিন্নী মাঝে-মধ্যে মোরগ পোলাও কিংবা কাচ্চি বিরিয়ানী পাকালে বলতেন, “ওসব ছাইপাশ দিওনা, ভাত দাও।” ভাতের মতই সোজাসাপটা কথা দাদার। বাবার মাঝেও ভাব দেখিনি কখনও। বাঙালি মেজাজেই চলেন এখনও। খাবার-দাবারেও এখনও তিনি ষোল আনা বাঙালি। দিন যত গড়াচ্ছে ভাবি, ছেলেগুলো বাঙালি থাকবে তো? ভিনদেশি দাপটে ওদের বাঙালি রাখাইতো কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘরে-বাইরে কোথাও বাঙালিআনা নেই। পাশ্চাত্য ঢং সবখানে। পোশাকে, খাবারে, চলাফেরা সবখানেই ভিনদেশি ভাব। কি সাহিত্যে, কি চলচ্চিত্রে সব জায়গায়ই বাঙালি হটাও মনোভাব। শতাধিক টিভি চ্যানেলে নাচ-গান আর নাটক সিনেমায় আমাদের বাঙালি থাকাই দায়। লাভ ইন সিংগাপুর মার্কা চলচ্চিত্র, আমাদের টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠান সবকিছুতেই কেমন যেন সাহেবী মেজাজ। এগুলো দেখে আমাদের আগামী প্রজন্ম বাঙালি থাকে কি করে? আমরা বৈশাখ এলেই একতারা হাতে ছুটে চলতে চাই কাঙালিনী সুফিয়ার মতো। ঢোল, তবলা, সারিন্দা নিয়ে গেয়ে উঠতে চাই হাছন আর লালনগীতি। গাইতে চাই আবদুল করিমের ‘গাড়ি চলে না চলে না চলে না রে’। কিন্তু বৈশাখ চলে গেলে আমরা সেই জ্যৈষ্ঠের খর রোদ্দুরে মলিন হয়ে যাই। হতাশ হয়ে যাই কালবৈশাখীর মতো জীবনের কিছু ঝড়ের কবলে পড়ে। সব যেন শেষ হয়ে যায়। ধুয়ে-মুছে যায় বাঙালিয়ানা। বাসায় মায়েরা সন্তানদের নিয়ে ভিনদেশি চ্যানেলে দেখছে ‘আউ আউ আউ’ মার্কা গান। এত গেল বাসার খবর। আমাদের নীতিনির্ধারকরাও এ ব্যাপারে বেশ উদাসীন। তারা ভিনদেশি অপসংস্কৃতিকে ভাড়ায় আনছেন। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে আনা হয় বিদেশি শিল্পীদের। আর আনবেই না কেন? বাঙালি তো আর বসে নেই। লাখো দর্শক হুমড়ি খেয়ে পড়ে মাঠে। সরাসরি টিভি চ্যানেলেও ওই অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হয়। অথচ আমাদের সরকার শত চেষ্টায়ও তাদের দেশে আমাদের টিভি চ্যানেল সম্প্রচারের সুযোগ পাচ্ছে না। ওরা আমাদের শিল্প-সংস্কৃতির শেয়ার নেবে না আর ওদেরটা আমাদের দিয়ে দেবে, তা কী করে হয়। ওদের নাটক-সিনেমার প্রভাব কিন্তু আমাদের সমাজে পড়তে শুরু করেছে। সংসারে অশান্তি, কুটিলতা, হত্যা বেড়ে গেছে। কী দেখছি আমরা এসব অনুষ্ঠানে? আজ আমাদের সংস্কৃতিতে চলছে বিদেশি খবরদারি। হাল জমানার যুবকরা হাছন রাজাকে গাইছে পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্র দিয়ে। কলুষিত করছে লালন সাঁইর সাধকীয় ভাবশৈলীকে। সবকিছুতেই বিদেশি ঢঙ। বিদেশি রঙ। যে রঙের ধাঁধায় পড়ে আমাদের উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া রঙের মাঝে মরিচা ধরেছে। একশ্রেণির কিশোর-কিশোরী যখন গিটার আর ড্রাম ছাড়া বাংলা গান কী, এ সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখে না, সেও যখন হাতে একতারা বা গলায় ঢোল বেঁধে নেয়, তখন বুঝতে হবে আকাশে ঝড়, মেঘ জমেছে। বৈশাখ মানেই বাঙালির আটপৌরে জীবনে লালের দাপট, ঝড়ের সঙ্কেত আর নতুনের আবাহনে স্টাইলিশ লাইফ। যেটা শুধুই ক্ষণিকের। আমাদের সাবধান হতে হবে। বাঙালি মনকে আরও শাণিত করতে হবে, মনের ভেতরকার জং মুছে ফেলতে হবে; আরও গভীর থেকে দেশকে ভালোবাসতে হবে, বাংলা ভাষাকে ভালোবাসতে হবে। আমি বাঙালি, এটা ভেতরে লালন করতে হবে। নিজেদের পরিচয় নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মতো শক্তি জোগাতে হবে। গুরুসদয় দত্ত তার গানে বলেছিলেন, ‘বিশ্বমানব হবি যদি কায়মনে বাঙালি হ, বাঙালি হ, বাঙালি হ।’ অর্থাত্ সাহস জোগাতে হবে। আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে নিজের ভেতরে। কেবল বৈশাখে নয়, বাঙালি হয়ে যেতে হবে প্রতি ক্ষণে ক্ষণে। যেন স্মৃতি হাতড়ে না বলতে হয়, ‘একদিন বাঙালি ছিলাম রে...। একদিন বাঙালি ছিলাম রে...।’ লেখক : সাংবাদিক। ই-মেইল[email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন