প্রশাসনকে দলীয়মুক্ত রাখার জন্যই ব্যুরোক্রেসি বা আমলাতন্ত্রের সৃষ্টি। প্রশাসনকে যদি ক্ষমতাসীন দল বা রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করে তাহা হইলে প্রশাসন নিরপেক্ষভাবে বা আইন ও নিয়ম-কানুন মোতাবেক চলিতে পারে না। অথচ, প্রশাসন যাহাতে আইন-কানুন মোতাবেক চলে সেইজন্যই আমলাতন্ত্রের উদ্ভব হয়। রাজনীতির কী প্রয়োজন উহা কাহার না জানা আছে। কিন্তু আমরা দীর্ঘদিন যাবত্ দেখিয়া আসিতেছি, প্রশাসনকে ক্রমান্বয়ে রাজনীতি তথা ক্ষমতাসীন দলের ইচ্ছামাফিক চলিতে হইতেছে। প্রশাসনকে নিরপেক্ষ এবং নিয়ম-কানুন মাফিক চালাইবার জন্য প্রশাসনের যে বিভাগ রহিয়াছে তাহারাও প্রশাসনের সহিত সম্পৃক্ত অন্যদেরকে রাজনীতির নির্দেশে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ও ক্ষমতাসীনদের রাজনীতির স্বার্থে ব্যবহার করিতেছেন। অবশ্য, রাজনীতিমুক্ত একটি প্রশাসনের কথা এক্ষেত্রে আমরা বলিতেছি না। আমরা বুঝিতে পারি না, ক্ষমতাসীন রাজনীতির শুরু ও শেষটা কোথায়? পরিস্থিতি যদি এমন অবস্থায় পৌঁছায় যে, ক্ষমতাসীন দলের যাহারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় আছেন কেবল তাহাদের কথামতোই বা তাহাদের পছন্দমাফিকই প্রশাসনকে চলিতে হইবে ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে হইবে, তাহা হইলে প্রশাসন নামক কোনকিছুর থাকার প্রয়োজন আদৌ থাকে কি? প্রশাসনের উপর রাজনীতির এই জাতীয় প্রভাব বৃদ্ধি পাইতে পাইতে এক্ষণে এমন এক পর্যায়ে আসিয়া ঠেকিয়াছে বলিয়া আমাদের বিশ্বাস যে, আগামীতে দেশে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নৈরাজ্য সৃষ্টি যেন অনিবার্য এবং ইহা হইতে পরিত্রাণ লাভের কোন পথই বোধকরি আর খোলা থাকিবে না।
রাজধানীতে এই অবস্থার গভীরতার আঁচ যতটুকু উপলব্ধি করা না যায়, রাজধানীর বাহিরে উহা উপলব্ধি করিতে খুব বেগ পাইতে হয় না। কেননা, রাজধানীর বাহিরে রাজনীতির ও প্রশাসনের অবস্থা এমন যে, সেইখানে অনেকাংশেই তাহারা ‘বারো ভুঁইয়াদের’ হুকুম তামিল করিতে বাধ্য হইতেছে মাত্র। তবে এ অবস্থা হইতে পরিত্রাণের জন্য প্রশাসনের যে কোন দায়-দায়িত্ব ছিল না এমনটা না বুঝিবার মতো বেয়াক্কেল দেশে খুব কমই আছে নিশ্চয়ই। এই কথা অস্বীকার করিবার উপায় নাই যে, বর্তমানে প্রশাসন তাহার নিরপেক্ষ অবস্থান এবং আইন-কানুন ও নিয়ম-নীতি মানিয়া চলিবার পথ হইতে অনেকটা দূরে সরিয়া আসিয়াছে। আবার রাজনীতিবিদেরাও প্রশাসনের পথ চলাকে দীর্ঘতর করিতেছে। এমতাবস্থায়, রাজনীতি ও প্রশাসনের এই দ্বন্দ্ব বা দুর্বলতায় শুধু আইন-কানুন ভাঙ্গিয়া পড়িয়া নৈরাজ্য সৃষ্টির আশংকাই প্রবলতর হইতেছে না বরং দেশের সম্পদ-সম্পত্তিরও বিপুল ক্ষতি সাধিত হওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত হইতেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনকে নিয়ম-কানুনের মধ্যে রাখিবার কোন বিকল্প নাই। মোদ্দা কথা, প্রশাসনকে সম্পূর্ণভাবে রাজনীতির আজ্ঞাবহ করিয়া রাখা কোন অবস্থাতেই ঠিক নহে।
