স্বাগত পহেলা বৈশাখ

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৫২
সময়ের আর্বতনে বছর ঘুরে আবারো ফিরে এসেছে পহেলা বৈশাখ। কালের গর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে আরো একটি বাংলা বছর ১৪২০। সামনে এসে উপস্থিত হয়েছে ১৪২১। স্বাগত ১৪২১। তোমাকে বরণ করে নেয়ার জন্য তোমারই প্রতীক্ষায় আমরা। এসো মঙ্গলবারতা নিয়ে। পুরনো, জীর্ণতা, ক্লেদ ধুয়ে-মুছে তুমি চলে এসো এদেশের আমজনতার প্রাণখোলা হাসি আর বাহারী সব রঙ নিয়ে। দেশের সর্বত্র এখন চলছে চৈত্র সংক্রান্তি এবং পহেলা বৈশাখকে বরণ করে নেয়ার প্রস্তুতি। বিশেষত ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের কাছে চৈত্র সংক্রান্তির দিনে সব ধুয়ে-মুছে অশুচি দূর করে পবিত্রতা আনা এবং শুভাকাঙ্ক্ষী, শুভার্থীদের মিষ্টি মুখ করার জন্য হালখাতার আয়োজনে ব্যস্ত তারা। এই চৈত্র সংক্রান্তির মাধ্যমে চলমান বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে আবহমানকাল ধরে বাঙলার গ্রাম-গঞ্জ, শহর, নগরীতে চলে আসছে এই আয়োজন। কাল থেকে কালান্তরে চৈত্র সংক্রান্তি এবং পহেলা বৈশাখ পালিত হয়ে আসছে স্বকীয় বাঙালিত্বে। বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ নামেই সমধিক পরিচিত। ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর পৃথিবীর বুকে স্বগৌরবে ফুটে উঠা বাংলাদেশে বহুজাতিক নৃগোষ্ঠীর বসবাস হলেও পহেলা বৈশাখ সার্বজনীন উত্সব হিসেবে বাঙালি মনন মানসে স্থান করে নিয়েছে। হিন্দু, বৌদ্ধ খ্রিষ্টান, মুসলমান সবাই পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে আনন্দ হিল্লোলে মেতে উঠে। বাঙালি সহজাতভাবেই উত্সব প্রিয়। সনাতন ধর্মপন্থিদের বারো মাসে তের পূজা বা পার্বণ এই উত্সব প্রিয়তার নির্দশন। মুসলিমদের প্রধান ধর্মীয় উত্সব দু’টি, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা। অন্য ধর্মপন্থিদেরও এক বা একাধিক উত্সব রয়েছে। তবে বাঙালির সার্বজনীন উত্সব একটি, সেটি হচ্ছে বাংলা নববর্ষ যা পহেলা বৈশাখ। এই উত্সব নিদির্ষ্ট কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নয়। সার্বজনীন বলতে যা বুঝায়, পহেলা বৈশাখ হচ্ছে তেমনি একটি উত্সব। এই পহেলা বৈশাখের উত্সবে বাংলার হিন্দু, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রীষ্টান, বাংলার মুসলমান সবাই যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী পালন করে। নতুন পোশাক কেনে, পিঠা, পায়েস, খৈ, মুড়ি ইত্যাদি দিয়ে অতিথি আপ্যায়নের যথাসাধ্য চেষ্টা করে। গ্রাম-গঞ্জ, নগরে মেলা বসে। নাগরদোলা, ঘোড়া- হাতির পিঠে চড়া, সাপ খেলা, বাহারি রঙের চুরি, ফিতার পসরা সাজানো দোকান ইত্যাদি গ্রামীণ মেলার চিরায়িত বৈশিষ্ট্য। বাঙালি চৈত্রসংক্রান্তি প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরনো সংস্কৃতি। বাংলা সন বা পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ইতিহাস সে তুলনায় প্রাচীন নয়। মোগল সম্রাট মহামতি আকবরই ফসল কাটার মৌসুমে খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তখন থেকেই বাঙালি পহেলা বৈশাখ পালন করে আসছে। চৈত্রসংক্রান্তি এবং পহেলা বৈশাখ বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির উত্সব। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও তাদের কর্মজীবীদের ছুটি দিয়ে থাকে। আমরা বলবো শুধুমাত্র ছুটি নয়, উত্সব পালনে অর্থ সংযোগ থাকে। তাই উত্সবে প্রণোদনার জন্য উত্সব ভাতা প্রদান করতে। আর এটা করা হলে উত্সবেও বহুমাত্রা যুক্ত হবে। বাঙালি মাত্রই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে বাংলা নতুন বছরকে বরণ করে নেয়ার জন্য। আমরা প্রতিনিয়ত নিত্য নতুন সংস্কৃতিতে যুক্ত হলেও ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, চৈত্র সংক্রান্তি বা পহেলা বৈশাখ বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি। বাঙালি এই সংস্কৃতি ঐতিহ্যের সঙ্গে ধরে রেখেছে। পহেলা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উত্সব। দিন দিন এই উত্সবের বহুমাত্রিকতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। নতুনত্বে পুলকিত হওয়া মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। নতুনের উত্সব মনুষ্য চিত্তে আনন্দের ঢেউ খেলে, মনকে দোলা দেয়। মনুষ্য চিত্তের আন্দোলিত চিত্রকল্প লক্ষ্য করা যায় হাটবাজার এবং বিপণি বিতানে। বিগত কয়েক দশক ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে অন্যসব ধর্মীয় উত্সবের মতো এই উত্সবেও মানুষজন সামর্থ্য অনুসারে কেনাকাটা করছে। ব্যবসায়ীরাও তাদের পসরায় পণ্যে বৈশাখকে ধারণ করছে। নগর জীবনের নাগরিকরা পহেলা বৈশাখে হাল ফ্যাশনের শিলীগুর তুলির নরম ছোঁয়ায় আঁকা জামা কাপড় পরিধান করার জন্য পছন্দের পোশাকটি হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন। আমরা ছোট্টবেলা থেকেই দেখছি এই পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে গ্রামে-গঞ্জে মেলার আয়োজন করা হয়। গ্রামের ধনী-গরিব সবাই এই মেলার জন্য অপেক্ষা করে। আনন্দে মেতে ওঠে। বৈশাখের প্রথম দিবসটি আবহমান কাল থেকেই আমাদের সত্তায়, চেতনায় ও অনুভবের জগতে এক গভীরতর মধুর সম্পর্ক নিয়ে বিরাজ করছে। বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ পুরনো জীর্ণকে ঝেড়ে ফেলে আমাদের যাপিত জীবনে নতুন সম্ভাবনা ও নতুন প্রত্যাশা জাগিয়ে তুলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে একাকার হওয়ার প্রেরণাও জোগায়। তাই পহেলা বৈশাখই হচ্ছে বাঙালির জীবনে সবচেয়ে বড় অসাম্প্রদায়িক আবহমান উত্সব। বাঙলা ও বাঙালির লোকজ সংস্কৃতির মূল বিষয়টি হল, উত্সবের মধ্য দিয়ে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ। পহেলা বৈশাখের মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায় বাঙালি জাতির হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গৌরব। মানুষ স্বভাবতই উত্সব প্রিয়। নিত্য যাপিত জীবনে একগুয়েমি পরিহার করে মানুষ নতুনত্বে শামিল হতে চায়। নতুন মানে সবার কাছে নতুন আনন্দ। তাই পহেলা বৈশাখ মানেই নতুন দিন, নতুন বছর। নতুন বছরের প্রথম দিনে আমাদের চিত্ত বিনোদনে পাশের লোকটির মুখ যেনো মলিন না থাকে, আসুন আমরা সেদিকেও দৃৃষ্টি রাখি। পহেলা বৈশাখ যেনো আভিজাত্যের মধ্যে আটকে না থাকে। সার্বজনীন উত্সবের সার্থকতা এখানেই নিহিত। লেখক :প্রাক্তন শিক্ষার্থী, গণবিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা email: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন