আলোকপাত

মায়ের অভাব পূরণ হয় না

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৫২
বিদুষী বাক-সিদ্ধ খনা বলতেন—“আগে হতে পিছে ভাল, যদি ডাকে মায়”। অর্থাত্ মা এমনই এক পবিত্রতার, সাত্ত্বিকতার আঁধার যে মা হতে কখনও কোন সন্তানের অমঙ্গল হয় না, হতে পারে না। কোথাও যাবার প্রাক্কালে আমরা একটা লক্ষ্য নিয়ে ভাবি, সেমত বেরোবার আয়োজন করি। ঠিক সেই মুহূর্তে হাঁচি-কাশি কিংবা কেউ পিছু ডাক দিলে স্বভাবতই মনের চিন্তা সূত্রগুলো ছিঁড়ে যায়, মনটা নিজের অজান্তেই বিরূপ হয়ে ওঠে। উদ্যমও কিছুটা কমে যায়। কেউ কেউ রাগ করে বলেও ফেলেন, দিলেতো সব বরবাদ করে, যাচ্ছিলাম একটা শুভ কাজে, আর এখনই তোমার ডাকার সময় হল? কিংবা বলে, হাঁচি দেবার আর সময় পেলে না? কেউ হয়তো যাওয়াই বাতিল করে দেয় অমঙ্গলের আশংকায়। হয়তো কখনও কখনও ফলেও যায় সে কথা। কিন্তু ঘটে না কোন অমঙ্গল, কোন অশনিসংকেতও উঁকি দেয় না কারও মনের আকাশে, যদি গর্ভধারিণী মা তার সন্তানকে পিছু ডাকে। কারণ মার অন্তর সর্বদাই থাকে সন্তানের কল্যাণ কামনায় কাতর, তাই মা যদি পিছু ডাকেন, নিশ্চয়ই সেখানে সন্তানের কোন না কোন ভালই লুকিয়ে আছে। জগতে মা’র অভাব কেউ কোনদিন পূরণ করতে পারে না, মার ঋণ সন্তান কখনও শোধ করতে পারে না। এযেন অতল করুণার সাগর, যার কূল নেই, কিনারা নেই, মার অন্তর হতে যেন স্নেহধারা অবিরাম উত্সারিত হচ্ছে, সন্তানেরই চলার পথের যত আপদ-বালাই ধুয়ে-মুছে দিতে। যেন সন্তান যেখানেই থাকে, সুখে থাকে, শান্তিতে থাকে। কিন্তু সন্তানেরা তা বোঝে না, অনেকে বুঝতেও চায় না। আজকের নতুন প্রজন্ম বাবা-মা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন, এর কারণ বহুবিধ, যেমন একান্নবর্তী পরিবার এখন নেই বললেই চলে, আগে একেকটি পরিবারে মা-বাবা, ভাই-বোন ছাড়াও অনেকেই থাকতেন, মায়েরা সারাটি দিন সংসারের কাজকর্মেই ব্যস্ত সময় কাটাতেন। সন্তানেরা ছুটে এসে মার কোলেই ঝাঁপিয়ে পড়তো পরম নিশ্চিন্তে। কিন্তু বর্তমানে তেমন দৃশ্য অত্যন্ত বিরল, নারীরা আজ ঘরে মমতাময়ী মা, বাইরে তেমনি নিজ যোগ্যতায় রাখছে প্রতিভার স্বাক্ষর পুরুষের পাশাপাশি। আজ আর কোন ক্ষেত্রেই পিছিয়ে নেই নারী। তথাপি তার মাতৃপরিচয় কিন্তু এতটুকু ম্লান হয়ে যায়নি। শত ব্যস্ততায়ও মা ঠিকই সন্তানের পরিচর্যা করে তাকে সুসন্তান হিসেবে গড়ে তোলার প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যান। এভাবেই মার আত্মত্যাগ তাকে মহিমান্বিত করে তোলে। ইতিহাস পড়ে যত মনীষীদের কথা জেনেছি, তাঁরা সবাই মা-ভক্ত ছিলেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মাতৃভক্তির কথা কে না জানে। ঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব মাকে দেবী জ্ঞানে ভক্তি করতেন। বালক বায়েজিদ পানির পাত্র হাতে সারারাত মায়ের শিয়রে দাঁড়িয়েছিলেন, কখন মা জেগে উঠে পানি পান করবেন এই আশায়। মহানবীও তাঁর মাকে অত্যন্ত ভক্তি করতেন। আজকের প্রজন্ম এই অচলা শ্রদ্ধাভক্তির পথ থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে। তারা আজ কথায় কথায় মা-বাবার সাথে তর্কে লিপ্ত হয়, এমনকি কটু কথা বলতেও ইতস্তত করে না। তারা আনন্দ-ফূর্তির এক নতুন বলয় সৃষ্টি করে নিয়েছে, যেখানে বাবা-মার ভূমিকা গৌণ, তারা শুধু অর্থ যোগানের কর্মশালা তাদের সন্তানদের কাছে। অনেক সন্তানই ভেবে দেখে না বাবা-মা কি কষ্ট স্বীকার করে অর্থ উপার্জন করে, শুধুমাত্র সন্তানদের ভবিষ্যত্ গড়ার নিমিত্তে। এভাবে চলতে চলতে অনেক বাবা-মাই সর্বস্বান্ত হয়ে যান, তবু তাদের মুখে হাসি থাকে অমলিন, সন্তানের শুভ কামনাই করে যান প্রতিনিয়ত। অতন্ত্র প্রহরীর মত মা-ই সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রাখেন সন্তানের গতিবিধির দিকে, বাবাও কম কিছু করেন না, তবে নানা ব্যস্ততায় মা’র মত নিবিড় পর্যবেক্ষণ তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না, তাছাড়া বাবা স্বভাবত একটু মেজাজী হন বিধায় সন্তানেরা মা’র দিকেই ঝোঁকে বেশি। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বের অতি আধুনিকতা, তাদের পারিবারিক বন্ধনহীনতা ইত্যাদির প্রবল প্রভাবে আমাদের দেশের অনেক সন্তান এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। বাবা-মা যদি দূরে থাকে, ছুটি-ছাটায় তাদের কাছে যাবার তাড়াও ক্রমে কমে আসছে সন্তানের, সে সময় তারা হয়তো বন্ধু-বান্ধব মিলে অন্য কোথাও আনন্দের জোয়ারে ভাসছে। অনেকে এমন পরিবেশে নানা রকম কু-উপসর্গে জড়িয়ে পড়ে, ফলে অর্থনাশ যেমন হতে থাকে, তেমনি স্বাস্থ্যনাশ ও বুদ্ধিনাশও হয় তাদের। শরীরস্থ মায়া-মমতা কর্পূরের মত উবে যায়। মায়ের কথা মনেই থাকে না। যদি কখনও মা খবর পাঠান, কিংবা কথা বলতে চান, শুনতে চান সন্তানের প্রিয় কণ্ঠস্বর, আকুল হয়ে জানতে চান সন্তান ভাল আছে কি-না, ওদিক থেকে হয়তো একরাশ বিরক্তিই ঝরে পড়ে। ভাল করে হয়তো কথাই বলে না মার আদরের সন্তান। মা’র বুক তখন ভেঙে-চুরে দুমড়ে-মুচড়ে যায়, দু’চোখে ঝরে অবিরল অশ্রুধারা। হায় হতভাগা সন্তান, তারা বোঝে না একমাত্র মা’র স্নেহ-ভালবাসাই তাদের চলার পথের একমাত্র পাথেয়। মিছে মরীচিকার পিছে ঘুরে পথভ্রান্ত সন্তানেরা জীবনের কানাগলিতে কেবলই হোঁচট খেতে থাকে, মায়ের পিছু ডাক শুনতে পায় না। মা যে অবিরাম ডেকে চলেছেন করুণ সুরে, স্নেহ-মমতায় জড়ানো সে কণ্ঠস্বরে কোন অমঙ্গলের নিশানা নেই, নেই কোন অকল্যাণ, মা’র কণ্ঠ নিঃসৃত সে পিছুডাক সদা-সর্বদা থাকে সন্তানেরই মঙ্গল কামনায় বিভোর। লেখক :প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা, বাউফল কলেজ, বাউফল,পটুয়াখালী [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন