ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশপথের অব্যবহিত পূর্বে রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান হইল শাহবাগ, নীলক্ষেত আর চানখারপুল। এই তিনটি স্থানের গুরুত্ব ভিন্ন মাত্রা পাইয়াছে বিশ্ববিদ্যালয়-নির্ভরতার কারণে। এই তিনটি স্থানের ব্যবসা-বাণিজ্যের রমরমা অবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয়ের কারণেই। তবে নীলক্ষেতের সহিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক পারস্পরিক নির্ভরতার। নীলক্ষেতেই রহিয়াছে নূতন-পুরাতন গ্রন্থের বিপণি, অনুলিপি ছাপিবার মেশিন, অভিসন্দর্ভ প্রতিলিপি ও বাঁধাই করিবার কারখানা এবং হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ বিবিধ বিপণিকেন্দ্র। এই পরস্পরনির্ভরশীলতা একটি স্বাভাবিক ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্কের মধ্য দিয়া চলিবার কথা। কিন্তু প্রায়শই এই সম্পর্কে চিড় ধরে, মাঝে-মধ্যে দেখা যায় ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে সংঘর্ষ বাধিয়াছে। শনিবারের সংঘর্ষের ঘটনাটি হইল তাহার সর্বসামপ্রতিক উদাহরণ। অনুমান হয়, লেনদেনের সম্পর্কের কদাচিত্ ভারসাম্য নষ্ট হয়, তাই সংঘর্ষের সৃষ্টি হইয়া থাকে। কিছু ঘটনা অনুসরণ করিলে ইহা বুঝিতেও কষ্ট হয় না যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দিক হইতে ব্যত্যয়ের ঘটনা বেশি ঘটিয়া থাকে।
প্রথমত: সাধারণ শিক্ষার্থী না হউক, বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারি ছাত্রসংগঠনের কিছু উচ্ছৃঙ্খল ছাত্র নীলক্ষেত অঞ্চলে চাঁদাবাজি ও ‘ফাও’ খাওয়াসহ নানান উত্পাতের ঘটনা ঐতিহাসিকভাবে ঘটাইয়া আসিতেছে। উপরন্তু, সাধারণ শিক্ষার্থীরাও তারুণ্যের কারণে প্রায়শই বচসায় প্রবৃত্ত হয় দোকানপাটে গিয়া। দোকানিরাও ঠকাইবার চেষ্টা কম করে না। শেষের দুই ঘটনায় সবসময়ই সীমা লঙ্ঘনের ঝুঁকি থাকে। শনিবার তাহাই হইয়াছে। মামা-ভাগিনার প্রলেপযুক্ত ক্রেতা-বিক্রেতার সম্পর্ক নিমিষেই প্রতিপক্ষের সম্পর্কের রূপলাভ করিয়াছে। বচসা হইল এক দোকানে, দোকানি ও এক ছাত্রের মধ্যে, কিন্তু ইহা অকারণে ফুলিয়া-ফাঁপিয়া দোকানিসমাজ ও ছাত্রসমাজের সংঘর্ষে রূপান্তরিত হইয়াছে। প্রায় আধাঘণ্টাব্যাপী তুমুল সংঘর্ষে পুরা এলাকা ভয়াল এক চেহারা পায়, যানজটে নাকাল হয় আশপাশের এলাকার মানুষগুলি। সংঘর্ষে কে জিতিয়াছে বলা মুশকিল, আহতের পাল্লা ছাত্রদের দিকে বেশি; তবে ক্ষয়ক্ষতি হইয়াছে দোকানিদের, বিশেষত বাহিরের ফুটপাতের সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত হইয়াছে বেশি।
আহতদের তালিকায় দেখা যায় সকল ছাত্রই জহুরুল হক হল ও এ এফ রহমান হলের, যেই দুইটি হল নীলক্ষেতের নিকটতম। যেই ছাত্রের সঙ্গে দোকানির প্রথম বচসা হয় তিনি ছিলেন জহুরুল হক হলের ছাত্র। পুরানা এক বই ফেরত দিয়া নূতন বই লইবার প্রস্তাবে দোকানি বলিয়াছিল, এই বিনিময়ে অতিরিক্ত ৬০টি টাকা গুনিতে হইবে। ছাত্রের ইহাতে আপত্তি ছিল। বচসার শুরু এইখানে, অত্যন্ত মামুলি ছিল বিষয়টি। বচসা হইতে হাতাহাতি, ইহার পর ছাত্রসমাজ ও দোকানিসমাজের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং সংঘর্ষ। বলা দরকার, আহত ছাত্রদের সবাই প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র, বেশিরভাগই প্রথম বর্ষের। সংঘর্ষে তাহাদেরই অংশগ্রহণ বেশি ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনেক উত্তেজনা ও অঘটনের জন্ম দেয় প্রথম বর্ষের ছাত্ররা। মায়ের কোল ও পিতার শাসন হইতে মুক্ত হইয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীনতার স্বাদ তাহারা পুরাপুরি গ্রহণ করিতে গিয়া মাত্রা-জ্ঞান হারাইয়া ফেলে। বয়স ও অভিজ্ঞতা বাড়িবার সঙ্গে সঙ্গে তাহাদের এই উত্তেজনা কমিতে থাকে।
খেয়াল করিবার বিষয় হইল, এইসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদের ভাবমূর্তি সঙ্কটে নিপতিত হয়। সমাজে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রের এক সময় যে সমীহ জাগানো ভাবমূর্তি ছিল, তাহা যেন ক্ষয়প্রাপ্ত হইতেছে। ইহার জন্য ছাত্ররা নিজেরাই অনেকখানি দায়ী। দোকানি তাহার মতো শিক্ষিত নহে, তাহার নিকট হইতে পরিশীলিত আচরণ কেহ আশাও করে না। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর নিকট হইতে মানুষ যুক্তিশীল আচরণ কামনা করে। কিন্তু তাহারা হট্টগোল, বচসা, সংঘর্ষ ইত্যাদির জন্ম দিয়া নিজেদের সম্মানই খোয়াইয়া চলিতেছে প্রতিদিন। আর ছাত্ররাজনীতির কথা তো বলাই বাহুল্য। লেজুড়বৃত্তি আর ধান্দাবাজির রাজনীতি করিতে করিতে বড় ছাত্রসংগঠনগুলি নিজেদের এক দুর্বৃত্তের সংগঠনে পরিণত করিয়াছে। সর্বোপরি বলিতে হয়, সম্পর্ক যদি হয় পরস্পরনির্ভরশীলতার, তবে উভয়কেই সহিষ্ণু ও ত্যাগী আচরণ করিতে হইবে। এইক্ষেত্রে ছাত্রদের দায়ই বেশি, কারণ তাহারাই সমাজের অগ্রবর্তী অংশ এবং দেশের ভবিষ্যত্ নেতৃত্ব তাহাদের হাতেই থাকিবে।
