[ রা জ নী তি ]

কে প্রথম, কে আসল এবং কে নকল!

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৪১
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সবসময়ই ‘কে প্রথম, কে আসল এবং কে নকল’—এই লড়াইটা বেশ জমজমাট। স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা কম-বেশি এমন ধরনের লড়াইয়ে নিজেদেরকে জড়িয়েছেন। অবশ্য মাত্রাগত দিক থেকে তা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সম্প্রতি বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান বঙ্গবন্ধুকে ‘অবৈধ প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। আর এই বিতর্কের সূত্র ধরে গত ১০ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে তারেক রহমান। অল্প কিছুদিন আগেই জিয়াউর রহমানকে দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দাবি করেছিল তারেক রহমান এবং তার সাথে সুর মিলিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াও ওই একই দাবি জানান। এ কথা আমরা সবাই জানি, দীর্ঘদিন থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ লেগেই আছে। তবে দেশের সাধারণ সচেতন মানুষের চিন্তা-চেতনায় স্বাধীনতার প্রশ্নে এমন কোনো দ্বিমত দেখা যায়নি। কে স্বাধীনতার প্রকৃত ঘোষক কিংবা কে আসল, কে নকল তা নিয়ে রাজনৈতিক পর্যায়ে বিশেষত আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে টানাপোড়েন লেগে থাকলেও সচেতন মহলে এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে। আমি প্রায়ই আমার বিভাগের শিক্ষার্থীদের মৌখিক পরীক্ষায় স্বাধীনতার ঘোষণা বিষয়ে প্রশ্ন করলে খুব নিরপেক্ষভাবে কিছু সচেতন এবং ন্যায্য উত্তর পেয়ে যাই। সেখানে কোনো পক্ষপাতিত্ব থাকে না এবং থাকে না কোনো গোঁড়ামি কিংবা অন্ধত্ব। কিন্তু রাজনীতিবিদদের কাছে ‘স্বাধীনতা কিংবা মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব ও অবদান’ নেহায়েতই রাজনৈতিক। এমনও অনেক রাজনৈতিক নেতাকে দেখেছি যারা বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে রাজনীতিতে এসে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছে। আওয়ামী লীগের নেতা বা কর্মী হিসেবে তারা এক ধরনের বক্তব্য দিয়েছে আবার ওই নেতা বা কর্মীরাই দল ত্যাগ করে পরবর্তীতে বিএনপির সাথে যোগ দিয়ে তার ঠিক উল্টো বক্তব্যে নিজেদেরকে আনন্দিত করেছে। এতে একটি বিষয় খুব পরিষ্কার যে, মূলত দলের প্রধানকে সন্তুষ্ট করার মানসিকতা থেকে এসব রাজনৈতিক মিথ্যাচার কিংবা অপবাদ দেয়া হয়ে থাকে। কখনো দলের শীর্ষ নেতারা এসব মিথ্যাচারের রাজনীতিকে বন্ধের চেষ্টা করেনি। রাজনীতির গোড়া থেকেই যদি তা বন্ধের উদ্যোগ গ্রহণ করা হতো তাহলে এখন হয়তোবা এমন মিথ্যাচার কিংবা অপবাদের রাজনীতির মুখোমুখি আমরা হতাম না। রাজনৈতিক বিবেচনা থেকেই বেশিরভাগ সময় এসব নেতিবাচক চর্চা হয়। কাজেই এ বিষয়টি যে আমাদের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত লজ্জা এবং ঘৃণা তা বলার অপেক্ষাই রাখে না। বর্তমানে রাজনৈতিক ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর থেকে। জিয়াউর রহমানের জীবদ্দশায় স্বাধীনতার ঘোষণা প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমানের অবদানের যথাযথ অবস্থানই মূল্যায়ন করা হয়েছে। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে বিএনপি বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতাসীন হওয়ায় বিএনপি দলীয় চাটুকাররা বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার একক নায়ক হিসেবে স্বীকৃতিদানের অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। এমনকি বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ও তাঁর অবদানের কথা প্রায়শই অস্বীকারের মতো ঔদ্ধত্য দেখাতে লিপ্ত হয় অনেক চাটুকার। যা মোটেই প্রকৃত ইতিহাসকে সমর্থন করে না। সাম্প্রতিককালে ‘জিয়াউর রহমানকে দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং বঙ্গবন্ধুকে অবৈধ প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে তারেক রহমান আখ্যা দিয়েছেন। এ দাবি থেকে স্পষ্টত প্রমাণিত হচ্ছে যে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ও রাজনীতিবিদদের মনে যথাযথ রাজনৈতিক কৃষ্টি গড়ে ওঠেনি। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের প্রতিক্রিয়া দেখে আরো স্পষ্ট হয়েছে যে, এখানে সহনশীলতার ঘাটতি ব্যাপকভাবে বিদ্যমান। এমন বক্তব্য কোনো রাজনৈতিক পক্ষ নির্দ্বিধায় অকপটে প্রচার করাটা যেমন যুক্তিসঙ্গত নয় ঠিক তেমনি অন্যদিকে আরেকটি পক্ষ তা গ্রহণ করে রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টির বিষয়টিও অতটা যুক্তিসঙ্গত নয়। এটি গণতন্ত্রের কোনো নমুনা হতে পারে না। হামলা, মামলা অন্যায্য যুক্তিতর্ক কোনোটিই গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কৃষ্টির বৈশিষ্ট্য নয়। আওয়ামী লীগকে একটি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে, তারেক রহমানের এমন বক্তব্যকে দেশের মানুষ খুব ভালোভাবে নেয়নি। বর্তমান সময়ে দেশবাসী কম-বেশি ইতিহাস জানে। এমন নেতিবাচক প্রবণতা কখনোই ভালো কিছু বহন করতে পারে না। বিএনপিকেও এ বিষয়ে আরো সচেতন হওয়া দরকার। একজন রাজনীতিবিদ বিদেশের মাটিতে বসেই বাংলাদেশের নতুন ইতিহাস রচনার চেষ্টা করছেন। আর দেশে অন্য রাজনীতিবিদরা অনেকেই তা সমর্থন করছেন আবার অনেকেই তা নিয়ে সমালোচনায় লিপ্ত। কোনোকিছুই গণতান্ত্রিক কৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। জিয়াউর রহমানকে দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতির দাবিকে দেশের তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নিঃসংকোচে শিকার করে নিয়েছেন। তবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক পরিবারতন্ত্রে অনেক কিছু সম্ভব তা আমাদের সবারই জানা। কারণ দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল ‘বাংলাদেশকে’ নিজেদের সম্পদ হিসেবে মনে করে। একটি ইতিহাসকে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের মতো করে সাজানোর চেষ্টা করে। সরকারের পালাবদল হলে ইতিহাসের পালাবদল হয়ে যায়। স্কুল কলেজের পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের পরিবর্তন ঘটে। এ কী নোংরা রাজনৈতিক সংস্কৃতি! ভবিষ্যতের পরিণতি নিয়ে আমরা রীতিমতো শংকিত এবং চিন্তিত। পাঠ্যপুস্তকে আর কতইবা ইতিহাস পরিবর্তিত হবে। কেউ স্বাধীনতার প্রাণপুরুষকে সম্মান দিতে ব্যস্ত আর কেউ সেই সম্মানকে কেড়ে নিয়ে নিজের মতো করেই সাজানোর কাজে ব্যস্ত। এই অপসংস্কৃতি রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল ছাড়া কিছু নয়। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরেও কে দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি আর কে বৈধ কিংবা অবৈধ তা বিতর্কের বিষয়ে পরিণত হয়, সেই দেশের রাজনৈতিক মূল্যবোধকে বহির্বিশ্ব কীভাবে মূল্যায়ন করবে? তবে এটা সত্য যে, বাংলাদেশ এতোদিনেও ইতিহাস বিকৃতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারলো না। এখন দেশের ইতিহাসকে ইচ্ছামতো বাজারে গিয়ে কেনা যায়। কারণ বাজারে যেসব ইতিহাস বিক্রি হয় সেগুলোর অনেকটিই এসব রাজনীতিবিদের দৃষ্টিকোণ থেকেই রচিত হয়েছে। কোনো বইতে বঙ্গবন্ধু দেশের স্বাধীনতার নায়ক, আবার অনেকেই বই রচনা করেছেন জিয়াউর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধের মুখপাত্র হিসেবে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমান উভয়েরই যে ভূমিকা রয়েছে তা যারা আদৌ স্বীকার করতে চায় না, তারা প্রকৃত ইতিহাসকে কিছুটা হলেও লুকাতে চায়। কাজেই উভয় দলের নেতাদেরকে বলতে চাই- যার যতটুকু মর্যাদা তা যথাযথভাবে দিয়েই রাজনীতিকে পরিষ্কার রাখা যেতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক দলের প্রধানরা সেই কাজটি থেকে অনেক দূরে। যেমন তারেকের ঘোষণার পর বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া মুক্তিযোদ্ধা সমাবেশে বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ মুক্তিযোদ্ধার দল নয়, জিয়াউর রহমানই স্বাধীনতার ঘোষক।’ তবে বিএনপির চেয়ারপার্সন এটি বলেননি যে, জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগের নেতারা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন। সেটি তিনি বলবেন না। কারণ, বললে মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের অবদান স্বীকার করা হয়। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন চলছে অস্বীকারের এবং মিথ্যার রাজনীতি। লন্ডনে দু’দফায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অবৈধ প্রধানমন্ত্রী দাবি করে বক্তব্য দেবার পর দেশে-প্রবাসে আলোচনার টেবিলে ঘুরে-ফিরে উঠে আসছে বিষয়টি। কেন এমন বিতর্ক সৃষ্টি করছেন তারেক রহমান? লক্ষ্যবস্তু কেন বঙ্গবন্ধু কিংবা বিভিন্ন জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে কেবল একটি বিষয়েই মনোনিবেশ করেছেন তারেক, এমন প্রশ্নই এখন সবার মনে। ধারণা করা হচ্ছে- ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপির নেতাকর্মীরা এখন ভুগছেন প্রচণ্ড হতাশায়। মাঠে নেই কর্মীরা, নেই চোখে পড়ার মতো কোনো কর্মসূচিও। নেতারা ব্যস্ত ফটো আর টকশোর রাজনীতিতে। আর বিএনপিকে যুদ্ধাপরাধীদের সমর্থক শহীদ জিয়াউর রহমানকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে সরকারি একচ্ছত্র প্রচারণায় প্রভাব পড়ছে দেশের তরুণ সমাজের কাছে। যা বিএনপির ইমেজকে করছে ক্ষতিগ্রস্ত। এমন প্রেক্ষাপটে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে প্রথম রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে প্রচার করে একদিকে দলের নেতাকর্মীদের ভাঙ্গা মনোবল চাঙ্গা করার চেষ্টা করছেন তারেক। অন্যদিকে জিয়াউর রহমানকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরে মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান এবং বিএনপির মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অবস্থানকে জনমনে সংহত করতে চাইছেন তিনি। এমনকি এমন হতে পারে যে, তিনি মনে করছেন এভাবেই বিএনপির রাজনীতিতে আরো জনপ্রিয়তা আনা সম্ভব। এছাড়াও সাম্প্রতিক এ বিতর্কে দেশ ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় আশাতীত কাভারেজও পেয়েছেন তারেক রহমান। ইতিহাসের পাতা সামনে নিয়ে ফের উঠে এসেছেন আলোচনার কেন্দ্রে। বিষয়টি দল ও নিজের জন্যও ইতিবাচক মনে করতে পারেন তিনি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, রাজনীতি কিংবা ইতিহাস রাতারাতি তৈরি করা যায় না। রাজনীতিতে সুনাম ধীরে ধীরে অর্জন করতে হয়, আর ইতিহাস ক্রমাগত গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে মিথ্যাচার ও অপবাদের যে অপসংস্কৃতি রয়েছে তা রাজনীতিবিদদেরই দূর করতে হবে। একজন দোষারোপ করলেই সেই দোষ মাথা পেতে নিতে হবে, তা ঠিক নয়। লন্ডনে বসে কোনো রাজনীতিবিদ অন্যায্য কোনো বক্তব্য দিলেই যে জাতীয় সংসদে তা নিয়ে আলোচনার ঝড় তুলতে হবে, অশ্রাব্য অসাংবিধানিকভাবে তা মোকাবিলা করতে হবে, সেটি নিশ্চয়ই কোনো ইতিবাচক রাজনীতির ধারায় পড়ে না। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে সহনশীলতা, ধৈর্য ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে যেকোনো কিছু মোকাবিলা করতে হবে। আওয়ামী লীগ এখন সরকারে আছে, তাদেরকে ভুলে গেলে চলবে না, অন্য কোনো রাজনৈতিক দল যেকোনোভাবেই যেকোনো কৌশলে রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চাইবে। এক্ষেত্রে সরকারকে সেদিকে সতর্ক থেকে সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে। রাজনীতিবিদদের ‘কে প্রথম, কে আসল এবং কে নকল’—এই প্রতিযোগিতা বন্ধ করে যা সত্য, যা ইতিহাস তাই মেনে নেয়ার মানসিকতা গড়তে হবে। লেখক: সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। E-mail: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন