সমাজ ব্যবস্থার পরিকাঠামো এমন একটি সমাজীয় আবহাওয়া করে যেখানে সমাজস্থ মানুষের সামগ্রিক কর্মময় জীবনের উত্থান-পতনের সার্বিক চিত্রপট কখনো পরিকল্পিত আবার কখনো বিশৃঙ্খলার চাদরে মোড়ানো। অপরিকল্পনা বা বিশৃঙ্খলার নিয়মিত অনিয়ম জনসাধারণের কোনো কোনো উদীয়মান অংশকে অপরাধের মত অপ্রত্যাশিত বা অনভিপ্রেত কালিমায় আবদ্ধ করে নিজ জীবনকে যেমন বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত করে তেমনি সমাজ বা রাষ্ট্রকে উন্নয়নের সুনিপুণ স্তর নির্মাণে বিভিন্ন বাধার সৃষ্টি করে। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় সামাজিক সমস্যার তালিকা প্রতিনিয়ত দীর্ঘায়মান। আর অপরাধ সেই তালিকাকে নতুন করে কলঙ্কের আবরণে আবৃত করে সমাজের সম্প্রীতি (Social Harmony) ও সমাজীয় উন্নয়নকে চ্যালেঞ্জের মুখে ধাবিত করে।
গবেষণায় প্রমাণিত কিশোর অপরাধ এমন একটি অবস্থা বা পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয় যা সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামোর কার্যগত বৈকল্যের বা শিথিলতার মারাত্মক বিপর্যয়। এ বিপর্যয় থেকে কিশোর-কিশোরীদের মুক্ত করে উন্নয়নের মূল স্রোতের সাথে সম্পৃক্তকরণের লক্ষ্যে বিশ্ব সভ্যতার বিচার ব্যবস্থার সাথে সঙ্গতি রেখে কিশোর-কিশোরী অপরাধীদের ‘সংশোধন তথা উন্নয়ন’ নামক বিচার ব্যবস্থার প্রচলন শুরু হয়। এ ব্যবস্থাকে আরো মজবুত সমাজীয়করণে সর্বময় গ্রহণযোগ্য প্রবেশন, প্যারোল, আফটার কেয়ার প্রভৃতি বিষয়ে সাংগঠনিক প্রচলন আমাদের সমাজে সমাজ ও আইনী দৃষ্টিভঙ্গির যৌথ সংমিশ্রণে প্রতিপালিত হচ্ছে। সমাজের উদ্দেশ্যগত তাত্ত্বিক ব্যাখ্যায়নে এটি স্বীকার্য, সমাজ ও রাষ্ট্র তার নাগরিকের জীবনমান উন্নয়নে প্রতিষ্ঠিত ও প্রজ্বলিত সমাজ সংগঠনের (Social Agency) মাধ্যমে নাগরিকের প্রতি সমাজীয় ভূমিকা পালনে সচেষ্ট। এর কার্যকারণিক বক্তব্য হল সমাজ হবে অপরাধমুক্ত, সমাজ হবে শান্তির জয়গানের উপযুক্ত ময়দান, আর সমাজের মানুষের বৈশিষ্ট্য হবে পারস্পরিক সমপ্রীতি ও বন্ধনের চির অমলিন আলিঙ্গন ও সম্পর্কের মরীচিকাবিহীন নিত্য নতুন আবেগীয় পরিবেশ যেখানে মানুষের বিচার মানবিক মানদণ্ডে।’
সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংগঠনের কার্যক্রমের ভিন্নমুখিতা ও রাজনৈতিক দলের তথাকথিত উন্নয়নে মানব সমাজের পৈশাচিক ব্যবহার মানুষের মধ্যকার ‘অপরাধ আত্মার’ রহস্য উন্মোচিত করে। যে সকল বিষয় বাংলাদেশে কিশোর অপরাধের জন্য দায়ী তার একটি মনো-সামাজিক সার্জারী করলে বিষয়টি এভাবে উপস্থাপন করা যায়: (ক) আমরা পাঠ্যপুস্তকে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বন্ধু-বান্ধব (peer group), আত্মীয় পরিজন প্রভৃতি সমাজীয় প্রতিষ্ঠানের যে ধরনের ভূমিকার সাথে পরিচিত বাস্তব অবস্থায় সেই ধরনের ভূমিকায় অনেক প্রতিষ্ঠানই নিজেদের পরিচিত করতে পারছে না। পরিবার হবে শান্তির জয়গান সম্মিলিত সুরে গাইবার জায়গা, কিন্তু সেখানে আমাদের দেশে অধিকাংশ পরিবার সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিশৃঙ্খলার তীর্যক আবরণে আবৃত। আর এই বিশৃঙ্খলা কিশোর-কিশোরীদের অপথে পরিচালিত করার প্রয়োজনীয় উপাদানের যোগান দেয় এবং উত্সাহিত করে। আমাদের দেশে যে বয়সে পিতা-মাতা, আত্মীয় পরিজন, শিক্ষক প্রমুখ ব্যক্তিকে ‘বন্ধু’ রূপে সন্তানরা পেতে চায় সেই প্রমুখ ব্যক্তিরা ‘ভয়ংকর বা তথাকথিত অভিভাবক’ হিসেবে সন্তানদের সামনে তাদের নিজস্ব ক্ষমতা প্রকাশে আরাম বোধ করে। যে সন্তান ‘পরিবার গণতন্ত্র’ কোনদিন তার পরিবারে দেখে নাই সে কীভাবে অন্যের গণতান্ত্রিক মতাদর্শের সাথে নিজের ব্যক্তিত্ব কেন্দ্রিক বৈশিষ্ট্যের সম্মিলন ঘটাবে। আমাদের দেশে বিভিন্ন চ্যানেলে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় আনন্দ উপকরণে বিনোদন জগত্ ভরপুর। একটি বিষয় স্বীকার্য যে, আমাদের সময়ে যে সময় অতিক্রম করার পর ‘নীল ছবি’ কনসেপ্টটি বুঝতাম এখন সেই বয়সের অনেক পূর্বেই এখনকার কিশোর-কিশোরীরা তা বুঝতে পারে। এটি একদিক থেকে ‘উপলব্ধিগত উন্নয়ন’ অন্যদিকে শিল্পায়ন ও সামাজিক পরিবর্তনের কারণে এ ধরনের ও এ সম্পর্কিত অন্যান্য উন্নয়ন অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার সৃষ্টি করে। যেমনটি করেছিলো ঐশীর ক্ষেত্রে।
রাষ্ট্রযন্ত্র সমাজ কাঠামো ও মানুষের মধ্যকার মানবিক বোধকে মানব তাড়নায় ধারালো করার মত উপযুক্ত কর্মসূচির প্রচলন ঘটাতে পারেনি। আমাদের দেশে রাষ্ট্রযন্ত্রের সাইনবোর্ডে ক্ষমতাসীন বা অ-ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল কিশোর-কিশোরীদের ধ্বংসাত্মক কর্মসূচির কর্মধারক হিসাবে ব্যবহার করে। অথচ রাজনৈতিক দল সমাজ জীবনের চলমান সকল অবাঞ্ছিত অবস্থা দূর করে একটি স্বস্তির পরিবেশ তৈরি করার কথা যেখানে মানুষের মানবিক মর্যাদা সমুন্নত হবে ‘মানুষ’ পরিচয়ে, তৈরি হবে পারস্পরিক মেলামেশার মজবুত প্ল্যাটফর্ম অথচ ভূমিকা ভিন্ন মাত্রায় বহমান।
আমাদের দেশে রাষ্ট্র ও সমাজ সমাজস্থ মানুষের মধ্যে ‘আমরা বা আমাদের তত্ত্ব’ বাস্তবায়নের পরিবর্তে ‘আমি তত্ত্ব’ বাস্তবায়নের সুযোগ করে দিয়েছে বেশি মাত্রায়। সমাজস্থ মানুষের মধ্যে যখন ‘সমষ্টি চেতনা’ অতি মাত্রায় কাজ করবে, তখন পারস্পরিক খোঁজ-খবর নেয়ার প্রবণতা বাড়বে যা সকলকে পরিচ্ছন্ন জীবন উপহার দেয়ার ক্ষেত্রে অকল্পনীয় ভূমিকা রাখবে। আমাদের দেশে আমরা অধিকাংশ জনগণই ‘আত্ম মেজাজী মনোভাব’ নিয়ে অন্যদের মূল্যায়ন, কিংবা গ্রহণ বর্জন করে থাকি। যার প্রভাব কিশোর-কিশোরীদের উপর গিয়ে বর্তায়। এভাবে কারণ তাত্ত্বিক (Etiological) ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করলে বহু কারণের দেখা মিলবে। তবে বিষয়টি পরিত্রাণ করার নিমিত্তে দৃষ্টি আবদ্ধ করলে এ বিষয়টি স্বীকার্য যে, রাষ্ট্র, সমাজ তথা রাষ্ট্রনৈতিক ও সমাজীয় প্রতিষ্ঠান যদি ‘প্রকৃতপক্ষে’ সমাজবান্ধব কর্মসূচি বা এমন ধরনের পরিবেশ তৈরি করতে পারে সেখানে অপরাধ থাকবে কিন্তু মাত্রা এবং সংখ্যা খুবই কম হবে, মানুষের অমানবিক আচরণ থাকবে কিন্তু তা মানবিকতার জয়গানে ‘সমাজ আবর্জনা’ হিসাবে মিলিয়ে যাবে, যেখানে জীবন হবে জীবনের, মানুষ হবে মানুষের, সমাজ ও রাষ্ট্র হবে সকলের, কর্মের সুর উদ্ভাসিত হবে মানবতার জয়গানে। তবেই কিশোর-কিশোরীরা নিজেদের নির্মাণের সূত্র ধরেই সমাজ ও দেশ নির্মাণের উজ্জ্বল বাতিঘর হবে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক
সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনষ্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
e-mail: [email protected]
