প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নৈতিকতা

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০১৪, ২২:৪৮
যদি কোনো পরীক্ষার পরীক্ষার্থীকে টোপ দেওয়া হয় আসন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ক্রয় করিবে কিনা—তাহা হইলে খুব সম্ভবত অতি অল্পসংখ্যক পরীক্ষার্থীই সেই প্রস্তাব ফিরাইয়া দিবে। তাহার মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণ আমরা কমবেশি বুঝিতে পারি। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অভিভাবকদেরও প্রচ্ছন্ন সমর্থন থাকে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিভাবকরাই সুযোগ সন্ধান করিয়া প্রশ্নপত্র যোগাড়ের ব্যবস্থা করেন। ইহাকে পরীক্ষার্থীরা অপরাধ হিসাবে গণ্য করেন না। যেকোনো পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র অত্যন্ত কঠোর নিয়মের ভেতরে সুরক্ষিত থাকে। তাহার পরও তাহা ফাঁস করিবার যে বাণিজ্যপ্রবণতা দেখা যায়, তাহার কারণ এই বাণিজ্যে বিপুল গ্রাহকের চাহিদা। অর্থাত্ আমাদের পরীক্ষার্থীদের বৃহত্ একটি অংশ নৈতিকভাবে এতটাই নাজুক যে, যেনতেন প্রকারে প্রশ্নপত্র পাইলেই—তাহা সঠিক নাকি বেঠিক, তাহা সম্পূর্ণ প্রশ্নপত্র নাকি অংশমাত্র—কোনো দিকে না তাকাইয়া অর্থের বিনিময়ে লুফিয়া লইতে ব্যাকুল থাকে। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় আমরা দেখিয়াছি, কোমলমতি শিশুদের পরীক্ষাও এই অনৈতিক জালে জড়াইয়া গিয়াছে। গত বত্সর নভেম্বরে অনুষ্ঠিত পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার দুইটি বিষয়ের প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণ মিলিবার অভিযোগ রহিয়াছে। ওই পরীক্ষার বাংলা বিষয়ের ৫৩ শতাংশ এবং ইংরেজির ৮০ শতাংশ প্রশ্ন ফাঁস হইয়াছিল বলিয়া প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্তে প্রমাণও মিলিয়াছে। এই বত্সর ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষার গণিতের প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ রহিয়াছে। কয়েকটি গণমাধ্যমে সেই প্রশ্নের হুবহু কপিও প্রকাশ করা হইয়াছে। পাঁচ হইতে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি হইয়াছিল ওই প্রশ্ন। ফাঁস হওয়া প্রশ্ন সংগ্রহ করিতে হুমড়ি খাইয়া পড়িয়াছিলেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এইবারের এইচএসসি পরীক্ষা শুরুর আগের দিন গত ২ এপ্রিল রাতে দেশের বেশ কয়েকটি জেলায় প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠে। প্রশ্ন ফাঁসের সহিত জড়িত থাকিবার অভিযোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তিন জন, শেরপুরে চারজনকে গ্রেপ্তারও করিয়াছে পুলিশ। এই প্রবণতা যে আত্মঘাতী তাহা বলিবার অবকাশ রাখে না। কেননা, যেই পরীক্ষার্থীরা আজ প্রশ্নপত্র পাইয়া বা নকল করিয়া বাঁকা পথে বা দুর্নীতির আশ্রয় লইয়া ভালো ফলাফল করিতে ব্যগ্র, ভবিষ্যতে তাহারাই যেকোনো কিছুর কার্যসিদ্ধি অনিয়ম ও অসততার হাত ধরিয়া করিতে মরিয়া হইবে। এই মানসিকতাই আমাদের সমাজকে ঘুণপোকার মতো কুরিয়া কুরিয়া খাইতেছে। এই কারণেই তাহারা চাকুরী পাইবার সময়ও তদ্বিরকেই শেষ উপায় মনে করেন। এবং তদ্বিরপ্রথাও আমাদের দেশে বহালতবিয়তে রাজত্ব করে তাহাদেরই পরম্পরায়। যাহারা কিছু করিতে চায়, তাহাদের ভিতরেও এই দূষিত মানসিকতা সংক্রমিত হইতে থাকে তীব্রভাবে। কেননা, সমাজের সততাসম্পন্ন অংশটি যদি দেখেন যে, অসত্ উপায়ে তদ্বির বা উত্কাচের মাধ্যমেই সহজে চাকুরী পাওয়া সম্ভব হয়, তাহা হইলে শ্রম দিয়া পড়ালেখা করিয়া কী হইবে? একটি সার্টিফিকেট পাইলেই তো নিয়মমাফিক চাকুরীর আবেদন করা যাইবে। এবং তদ্বিরের বা ঘুষের মাধ্যমে চাকুরীরও সন্ধান মিলিবে। সুতরাং ফাঁস প্রশ্নপত্রে কিংবা নকল করিয়া সেই সার্টিফিকেট পাইলে ক্ষতি কী? সুতরাং তাহাদের কাছে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বড় গুরুত্ব রহিয়াছে বটে। এই কর্কট রোগের সমাধান করিতে হইবে সমাজের মানসিকতার পরিবর্তনের মাধ্যমে। যেই অভিভাবক আজ অন্যায়ের প্রশ্রয় লইয়া সন্তানের অগ্রিম প্রশ্নপত্রের অর্থ জোগান দেন, সহযোগিতা করেন সর্বতোভাবে, সেই সন্তানই যখন বড় হইয়া অভিভাবক হইবেন, এই নৈতিক অবক্ষয় তাহাকেও তাহার সন্তানের ভিতরে সঞ্চার করিতে দ্বিধা করিবে না। অন্যদিকে, প্রশাসন যদি ‘চেক অ্যান্ড এরর’-এর ভিত্তিতে এই সমস্যার সমাধান করিতে আন্তরিক না হয়, কোন সর্ষেদানায় ভূতটি লুকাইয়া রহিয়াছে, তাহা বাহির করিবার কার্যকর ব্যবস্থা না গ্রহণ করে—তাহা হইলে যতই তদন্ত কমিটি গঠন করা হউক না কেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের দুষ্কর্মটি চলিতেই থাকিবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন