সমুদ্রে সলিল সমাধি

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০১৪, ২২:৪৯
আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের ৩৪ জন ছাত্রের একটি দল নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষে সোমবার (পহেলা বৈশাখ, ১৪ এপ্রিল) সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ভ্রমণে যায়। বেলা দুইটার দিকে কয়েকজন ছাত্র দ্বীপের জেটি ঘাটের উত্তর-পূর্ব পাশে প্রিন্স হ্যাভেন পয়েন্ট দিয়ে গোসলে নামে। এসময় স্রোতের টানে ভেসে যেতে থাকলে তারা ডাক-চিত্কার শুরু করে। স্থানীয় লোকজন এবং কোস্টগার্ড সদস্যরা ৫ জনকে উদ্ধার করে। তাদের স্পিডবোটে করে টেকনাফ উপজেলা হাসপাতালে আনা হলে সাড়ে ৩টায় চিকিত্সক দুইজনকে মৃত ঘোষণা করেন। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী আরও দু’জন ছাত্রের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখনো তিনজন ছাত্র নিখোঁজ রয়েছেন। সমুদ্রের পানিতে ভেসে ভেসে এক সপ্তাহ বেঁচে থাকার রেকর্ড আছে ঠিকই কিন্তু সেজন্য ভালো সাঁতারু হতে হবে অথবা ভেসে থাকার মতো অবলম্বন (কাঠ বা তেমন কিছু যেটা ভাসে) থাকতে হবে। নিখোঁজ চারজনের মধ্যে কয়জন ভালো সাঁতার জানে বা মোটেই সাঁতার জানে না সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমার ধারণা ভুল না হয়ে থাকলে, বেশিরভাগই সাঁতার জানে না (এটাই স্বাভাবিক। কারণ এরা গ্রামের ছেলেমেয়েদের মতো ছোটবেলা থেকেই পুকুর বা বিলে সাঁতার কেটে অভ্যস্ত নয়)। যেহেতু এটা কোন লঞ্চ ডুবি বা তেমন ধরনের দুর্ঘটনা নয়, স্বাভাবিকভাবেই পানিতে ভেসে থাকার মতো অবলম্বন পাবার সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। কোস্ট গার্ড এবং নৌবাহিনী উদ্ধারের চেষ্টা চালালেও বাকি তিনজনের কাউকে জীবিত পাবার সম্ভাবনা কম। প্রার্থনা করি যেন অলৌকিকভাবে হলেও সবাইকে জীবিত উদ্ধার করা যায়। এই প্রসঙ্গে আমার কিছু ব্যক্তিগত অনুরোধ আছে বাবা-মা’দের প্রতি। যদিও তরুণ বয়সের ছেলেমেয়েরা সমুদ্র সৈকত বা পানি আছে এমন জায়গায় বেড়াতে গেলে বাবা-মা’রা অতি নিশ্চিতভাবেই তাদেরকে সাবধান করে থাকেন, কিন্তু আমার জীবদ্দশায় এ পর্যন্ত অগুনতি সলিল-সমাধির কাহিনী জানা আছে। প্রতিটা মানুষই এমন ঘটনা অহরহ দেখে থাকেন, শুনে থাকেন, পেপারে পড়েন। আমার ভাইয়ের সাথে একই প্রতিষ্ঠানে চাকরিরত একজন শিক্ষকের দুটি তরুণ ছেলে ক’বছর আগে কক্সবাজারে একই সাথে পানিতে নেমে মারা গেলো। ঐ বাবা-মা এক সাথে দুটি ছেলে হারিয়ে কোনদিন কি আর মানসিকভাবে স্বাভাবিক হতে পারবেন? এমন আরও অনেকগুলো উদাহরণ আছে শুধুমাত্র আমার চেনাজানা মানুষজনের মাঝেই। কিন্তু, দুঃখের কথা, লজ্জার কথা, দায়িত্বহীনতার কথা হলো যে এই অকালমৃত্যুগুলো সবই ছিলো নিবারণ-যোগ্য! সমুদ্র সৈকতে আনন্দ করতে যাবো কিন্তু পানিতে নামবো না, এটা কি হতে পারে? বাবা-মা’র কাছে যতই কিরা কাটা আর প্রতিজ্ঞা করাই হোক না কেন তা কোনদিনই রাখা সম্ভব নয়। তাহলে কি কেউ আর সৈকতে যাবে না? না, তা কেন হবে। অবশ্যই যাবে তবে নিয়ম অনুসারে। প্রথম কথা হচ্ছে ‘সাঁতার শেখা না পর্যন্ত সৈকতে যাওয়া যাবে না।’ যদিও প্রশ্ন থাকে যে সাঁতার শেখার পরিবেশ বা পানির আধার, সুইমিং পুল, ইত্যাদি অপ্রতুল ঢাকা শহরে। হ্যাঁ তা ঠিক। কিন্তু তাই বলে তো আর গোরস্থানের টিকিট হাতে ধরিয়ে ছেলেমেয়েকে আমি পানিতে পাঠাবো না! বাংলাদেশ নদীর দেশ, পানির দেশ (যদিও ভারত-মাতার সুযোগ্য সন্তানেরা আজ সেই পানি কেড়ে নিয়ে মরুভূমি বানাচ্ছে আমাদের দেশটাকে!); সবারই কোন না কোনভাবে উপায় আছেই পানির কাছে যাবার। সেটা নিজের গ্রামের পুকুর হোক বা ঢাকা শহরের হাতেগোনা কয়েকটি মাত্র সুইমিং পুল-ই হোক। মানুষ চাইলে পারে না এমন কিছুই তো নেই। আমি ব্যক্তিগত ভাবে বিশ্বাস করি যে, একটি শিশুকে স্কুলে পাঠাবার আগে সাঁতার শেখানো হচ্ছে বাবা-মা’র অবশ্য করণীয় একটি কাজ। শিক্ষার চাইতেও জীবন বড়! সেই মাঝি আর বাবু’র কথা কেবল আমরা মজা করে ছোটবেলায় পড়েই ক্ষান্ত দিয়েছি, কাজে লাগাই নাই। তাইতো আজ সত্যিই ‘ষোল আনা মিছে’ প্রমাণিত হচ্ছে আর একের পর এক তাজা প্রাণগুলো অকালে ঝরে পড়ছে! অন্যের ছেলে আজ মরেছে বলে দুঃখ করছি কিন্তু কাল বা পরশু আমার ছেলেটা যে সেই কাতারে দাঁড়িয়ে আছে মরার জন্য সেটা ভাবছি না। কি অবাক কাণ্ড! দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, ‘সাঁতার জানা থাকলেও সমুদ্রের পানিতে নামতে অবশ্যই লাইফ-জ্যাকেট পরে নামতে হবে।’ এর কোন অন্যথা করা যাবে না। সুইমিং পুল বা ছোট-খাট পুকুর বা খালে সাঁতার জানা মানুষের পক্ষে ডুবে মারা যাবার সম্ভাবনা কম কিন্তু সমুদ্রের পানিতে নামা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত একটি ব্যাপার এটি সবাইকে মানতে হবে এবং সেভাবেই সরকারি এবং বেসরকারি উদ্যোগে জন-অবহিত করতে হবে। জনপ্রিয় সৈকতগুলোতে পর্যাপ্ত এবং দৃষ্টি আকর্ষণ-যোগ্য সতর্কতামূলক নোটিস-ব্যানার-প্লেট লাগাতে হবে। একটি অকালমৃত্যু একটি পরিবারকে চিরকালের জন্য পঙ্গু করে দেয়। প্রতিটি বাবা-মা যেমন চান তাদের সন্তান সুশিক্ষিত হোক, স্বাস্থ্যবান হোক; ঠিক তেমনই একই সাথে তাদের অবশ্যম্ভাবী ভাবে সন্তানকে সাঁতার শেখানো প্রয়োজন। অন্যথায় মফিজুল, অঙ্কুর, সাব্বীর, শাহরিয়ার, উদয়, বাপ্পি যে সুদীর্ঘ তালিকাতে আজ যুক্ত হলো, আমার আপনার সন্তানেরাও যে কোনদিন সেটাতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে! লেখক :এপিডেমিওলজিস্ট, আটলান্টা, জর্জিয়া, আমেরিকা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন