গণতন্ত্র, প্রশাসন ও দারিদ্র্য

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৩৩
অর্থবহ গণতন্ত্র, কার্যকর প্রশাসন ও দারিদ্র্য এক সাথে চলিতে পারে কিনা তাহা একটি কঠিন প্রশ্ন। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দায়িত্বশীলতা গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত। ইহাকে কার্যকর করিতে হইলে প্রশাসনকে সর্বদা নিয়ম-নীতির মধ্যে চলিতে হয়। কিন্তু প্রশাসনের নিয়ম-কানুনের মধ্যে থাকিয়া কাজ করিবার ক্ষেত্রে দেশে দারিদ্র্য একটি প্রকাণ্ড বাধা বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে। যেকোন গণতান্ত্রিক দেশে নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সরকার গঠিত হয়। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলি নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করে। ইহার মাধ্যমে উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় অর্থনৈতিক সামর্থ্য বিবেচনা করা হয় না। ভোটের রাজনীতিতে সফল হইবার জন্য অবাস্তব ও কল্পনাতীত প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরিও চলে। যেনবা সাতনরীর হার হইতে শুরু করিয়া দুধের নহর কিংবা আকাশের চাঁদও পাওয়া যাইবে। এইসব শ্লোগান জনপ্রিয়ও হইয়া থাকে। নির্বাচনের পর অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ইশতেহারের কথা নেতারা যেমন ভুলিয়া যান, তেমনি জনগণেরও তাহা নিয়া ভাবিবার তেমন ফুরসত্ থাকে না। অন্য ও বড় বড় ইস্যু আসিয়া তাহা ঢাকিয়া ফেলে। বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশের ইহাই সাধারণ চিত্র। তবে ইশতেহারে ঘোষিত প্রতিশ্রুতির উল্লেখযোগ্য অংশও যদি বাস্তবায়ন করিতে হয় এবং দিতে হয় ন্যূনতম সুশাসন, তাহা হইলে একমাত্র পথ প্রশাসনকে নিয়মতান্ত্রিক পথে পরিচালনা করা। একটি দরিদ্র দেশে আসলে চাওয়ার কোন শেষ নাই। অনুরূপভাবে তাহা পাওয়ার জন্য হেন কোন পথ নাই যাহা অবলম্বন করা হয় না। সাধারণত যাহারা ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন, তাহারা অলিখিতভাবে দলীয় কর্মীদের মূল্যায়ন করিতে বাধ্য হন। ন্যায় বা অন্যায় পথে যেইভাবেই হউক, তাহাদের মধ্যে সরকারি নানা সুযোগ-সুবিধা বন্টন করিতে হয়। ইহাতে অনেক সময় জাতীয় স্বার্থ বিঘ্নিত হয়। কিন্তু এই মূল্যায়ন না করিলে নিজ দলের কর্মী ও সমর্থক হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়িবার আশঙ্কা তৈরি হয়। এইভাবে মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের মূল্যায়িত হওয়ার নামে তাহাদের নানা আবদার মিটাইতে হয়। তাহারা অনেক সময় দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এতটাই বেপরোয়া হইয়া উঠে যে নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলিয়া যায়। তাহাদের ক্ষমতার অপব্যবহার নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়। রাজধানীর চাইতে ইহার বাহিরে তাহাদের দৌরাত্ম্য অধিক আঁঁচ করা যায়। তাহারা এমন ক্ষমতাও রাখে যে, স্থানীয় প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদেরও বদলি করিয়া দিতে পারে কথায় কথায়। এই ক্ষেত্রে বাঁশের চাইতে কঞ্চিই বড় হইয়া দেখা দেয়। তাহারা ক্ষমতাসীন দলের বড় কোন পদে আসীন না হইয়াও হরহামেশা ক্ষমতার দাপট দেখাইয়া চলে। এই প্রবণতা বা সংস্কৃতি হালে অনেক বাড়িয়া গিয়াছে এবং ইহার কারণে প্রশাসনের লোকজনের মধ্যে দেখা দেয় হতাশা। তাহারা পদে পদে তটস্থ। এইভাবে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের ম্যানেজ করিয়া চলিতে গিয়া প্রশাসনের নিয়মমাফিক কাজ করা কঠিন হইয়া পড়ে। বলাবাহুল্য, এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ দারিদ্র্য। এই কয়েকদিন আগেও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জি ইয়ং কিম এক ভাষণে বলেন যে, বিশ্বের দরিদ্র মানুষের ৬ শতাংশ বাস করে বাংলাদেশে। তবে এই কথাও সত্যি যে, প্রশাসনিক নিয়ম-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত না হইলে আমাদের সার্বিক অবস্থার পরিবর্তন কখনই হইবে না। তাই প্রশাসনকে দলীয় রাজনীতির বাড়াবাড়ি হইতে মুক্ত রাখিবার জন্য রাজনৈতিক নীতিনির্ধারক মহলের মনোযোগী হওয়া উচিত। তৃণমূলের যেইসব নেতা-কর্মী সীমালংঘন করিতেছে তাহাদের লাগাম টানিয়া ধরিতে হইবে। সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষার জন্যই দ্রুত এই ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন