সমুদ্র সৈকতে মর্মান্তিক মৃত্যু ও সচেতনতা

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৩৪
সমুদ্র সৈকতে আসিয়া সকল বয়সের মানুষই কি শিশু হইয়া যায়? সমুদ্রের বিশালতার কাছে তাহাদের উচ্ছ্বাসের বাঁধ কি ভাঙিয়া যায় নিরন্তর ছুটিয়া আসা ছোট-বড় ঢেউয়ের তোড়ে? যাহারা বয়সে তরুণ, তাহারা কি প্রতিযোগিতায় নামেন তারুণ্যের উচ্ছলতার চূড়ান্ত সীমায় লইয়া যাইতে? বাহ্যজ্ঞান কি এতটাই শূন্য হইয়া যায় যে, তাহারা বিপদাপদের কথা ভাসাইয়া দেয় সমুদ্রের উর্মির উচ্ছ্বাসের কাছে? ঢাকার আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের যেই ৩৪ জন ছাত্র বাংলা সনের প্রথম সূর্যোদয় দেখিতে সেন্টমার্টিন গিয়াছিলেন, ধারণা করা হয় অনেকটা সচেতনতার অভাবেই তাহাদের নয়জন সমুদ্রে নামিয়া ভাসিয়া যান। পাঁচজনকে উদ্ধার করা সম্ভব হইলেও নিখোঁজ রহিয়াছেন অন্য চার মেধাবী ছাত্র। পত্রিকান্তরে যেই সকল কারণ প্রকাশিত হইয়াছে, তাহাতে সন্দেহ করা হইতেছে, যেই পয়েন্টে ওই ছাত্ররা সমুদ্রে অবগাহন করিতে নামিয়াছিলেন, সেইখানে স্রোতোচ্ছ্বাস ছিল সাধারণ মানুষের জন্য বিপজ্জনক। আর, সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হইল—তখন সমুদ্রে ভাটা চলিতেছিলো। সাঁতার না জানিয়াও কিছু কিছু সৈকতে সতর্কতার সহিত নিয়ম মানিয়া স্নান করা যায় বটে। কিন্তু সাঁতার জানা থাকিলেও ভাটার সময় সমুদ্রে নামিয়া প্রাণসংশয় দেখা দিতে পারে। এবং শুধুমাত্র এই কারণেই কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে গত কয়েক দশকে অসংখ্য পর্যটকের মৃত্যু হইয়াছে, যাহার ভিতরে রহিয়াছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীরা। এই সকল দুর্ঘটনা রোধ করিতে কক্সবাজারে একটি সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটি রহিয়াছে। তাহারা পর্যটকদের নিরাপত্তার ব্যাপারে বিভিন্ন নির্দেশনাও প্রদান করেন—কখন সমুদ্রে নামা নিরাপদ, কখন নিরাপদ নহে ইত্যাদি। বিপদের কথা হইল, পর্যটক হিসাবে যাহারা সেন্টমার্টিনে যান, তাহাদের নিয়ন্ত্রণের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা নাই। তাই, যেই পয়েন্টে পর্যটকেরা অবগাহনে সমুদ্রে নামেন, সেই স্থান নিরাপদ নাকি বিপজ্জনক, তাহা না জানিয়াই তাহারা নিশ্চিন্তে অবকাশযাপনে আত্মমগ্ন থাকেন। সুতরাং সেন্টমার্টিনসহ বাংলাদেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলিকে নিরাপদ করিবার লক্ষ্যে আরও মর্মান্তিক মৃত্যুর পূর্বেই সকল প্রকার সতর্কতামূলক ব্যবস্থা অতিসত্বর গ্রহণ করিতে হইবে। ইহা খুব ব্যয়বহুলও নহে। ধরিয়াই লইতে হইবে, সকল পর্যটকই অসচেতন। তাহাদের সচেতন করিতে এমনভাবে সতর্কতার বাণী ও ব্যবস্থাপনা পর্যটনকেন্দ্রসমূহে রাখিতে হইবে, যাহাতে পর্যটকরাও নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরা গ্রহণ করিবারও দিক-নির্দেশনা পান। পর্যটনকে নিরাপদ ও জনপ্রিয় করিতে এই সকল ব্যবস্থাপনার বিকল্প নাই। যেই সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে সমুদ্র ভ্রমণে যান, তাহাদের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেরও কিছু দায়-দায়িত্ব থাকে বৈকি। আর ব্যক্তিগত উদ্যোগে যাহারা দলবাঁধিয়া সমুদ্র অবকাশে ছুটে যান, তাহাদের মনে রাখিতে হইবে—সংখ্যায় তাহারা অধিক হইলেই তাহা সমুদ্রের বিপদকে দূরে ঠেলিয়া দিতে পারিবে না। বরং অধিক সংখ্যায় একসঙ্গে সকলে গা ভাসাইলে দায়িত্বজ্ঞান লোপ পাইবার সম্ভাবনা থাকে। সেই সুযোগে ওত পাতিয়া থাকা বিপদের ফাঁদে তাহারা জড়াইয়া পড়েন, যাহার পরিণতিতে দেখা দিতে পারে প্রাণসংশয়। সেন্টমার্টিনের মৃত চার তরুণের একজন সাব্বির হাসান তাহার ফেসবুকে বন্ধুকে লিখিয়াছিলেন—‘চলে যাচ্ছি দোস্ত, নেটওয়ার্কের বাইরে’। তিনিসহ আরও তিনজন আমাদের অশ্রুসজল করিয়া চিরতরে চলিয়া গিয়াছেন নেটওয়ার্কের বাহিরে। জীবন হইতে অধিক দামি আর কী আছে? তাই শিক্ষিত তরুণকেও সতর্ক থাকিতে হইবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে। তারুণ্যের অবারিত উচ্ছলতায় ভাসিয়া যাইবার পাশাপাশি নিজস্ব সচেতনতাই চৌকসতাকে পূর্ণমাত্রা দেয়। মনে রাখা দরকার, সচেতনতা নিজেদের ভিতরে প্রোথিত করিতে না পারিলে ভবিষ্যতে এই ধরনের মর্মান্তিক দুর্ঘটনা বার বার ঘটিতে পারে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন