প্রায় দুইদিন কর্মবিরতিতে থাকিয়া অবশেষে কাজে ফিরিয়াছেন বারডেম হাসপাতালের চিকিত্সকেরা। ইতোপূর্বে ১৩ এপ্রিল রাতে সিরাজুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তির মৃত্যুতে তাহার স্বজন পরিচয়ে ৬০-৭০ জনের একটি দল চিকিত্সকদের ওপর হামলা চালায় বলিয়া বারডেমের চিকিত্সকেরা অভিযোগ তোলেন এবং মঙ্গলবার সকাল হইতে সকল রকম চিকিত্সাসেবা বন্ধ করিয়া দেন। এই সময় তাহারা সড়ক অবরোধ এবং মানববন্ধনও করেন। গত বুধবার সকালে বারডেম হাসপাতাল মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করিয়া তাহারা দাবি জানান, চিকিত্সকদের মারধরের ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত তাহারা কাজে ফিরিবেন না। ওই ঘটনায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাসুদ হোসেন ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ানের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ইন্ধন দেন বলিয়া অভিযোগ করেন চিকিত্সকেরা। তাহারা এই দুইজনের বিচার চান। তাহাদের চাপের মুখে বুধবার বিকালে মাসুদ হোসেনকে প্রত্যাহার করা হইয়াছে এবং এই খবরে চিকিত্সকেরাও কর্মবিরতি প্রত্যাহার করিয়া নিয়াছেন। বলাই বাহুল্য যে, গত দুইদিন বারডেম হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিত্সাসেবা বন্ধ থাকায় ব্যাপক দুর্ভোগে পড়েন রোগীরা। কারণ, প্রতিদিন বারডেমের বহির্বিভাগে সাড়ে চার হাজার রোগী সেবা নেন।
চিকিত্সাক্ষেত্রে ধর্মঘটের ঘটনা প্রায় নিয়মিত হইয়া উঠিয়াছে। চলতি মাসেই, মাত্র কয়েকদিন পূর্বে, রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শিক্ষানবিশ ডাক্তারদের কর্মবিরতি চলিতেছিল। গত মাসেও আমরা দেখিয়াছি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেন্টাল অনুষদের চিকিত্সকেরা দুই সপ্তাহ ধর্মঘট চালাইয়া অবশেষে কর্মক্ষেত্রে যোগ দিয়াছেন; অন্যদিকে এক চিকিত্সককে কারাগারে পাঠাইবার প্রতিবাদে রাজশাহী মহানগরীর সরকারি-বেসরকারি সকল চিকিত্সা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট আহ্বান করা হইয়াছিল। অর্থাত্ নানাবিধ কারণেই চিকিত্সাকর্মীরা তাহাদের দাবি-দাওয়া পূরণ করিতে ধর্মঘট ডাকিয়া চিকিত্সাপ্রার্থীদের ভোগান্তি বহুগুণে বাড়াইয়া তুলিতেছেন। তবে ধর্মঘটের একটি প্রধান কারণ হইল চিকিত্সকদের ওপর ক্রমবর্ধমান হামলা। চিকিত্সকদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) বলিতেছে, গত এক বছরে চিকিত্সকদের উপর কয়েকশ হামলার ঘটনা ঘটিয়াছে। তন্মধ্যে ৫০টি ঘটনা গুরুতর। এই সকল হামলায় আহত হইয়াছেন শতাধিক চিকিত্সক ও নার্স, অনেক মূল্যবান যন্ত্রপাতিও নষ্ট হইয়াছে। বিএমএ এবং প্রাইভেট হসপিটাল এন্ড ক্লিনিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারা বলেন, দোষী সাব্যস্ত হইবার আগেই রোগীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে চিকিত্সক-নার্সদের ওপর হামলা কোনভাবেই কাম্য নহে। চিকিত্সাধীন কোনো রোগীর মৃত্যু হইলেই স্বজনেরা অভিযোগ করেন, ভুল চিকিত্সা কিংবা চিকিত্সকের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু হইয়াছে। ইহার পরেই শুরু হয় হাসপাতালে ভাঙচুর, চিকিত্সকের ওপর হামলা-মারধর। শুধু দেশের প্রত্যন্ত এলাকার হাসপাতালেই নয়, খোদ রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালেও এই ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটিতেছে।
তবে ইহা মুদ্রার এক পিঠ মাত্র। অন্য পিঠে তাকাইলে আমরা দেখিতে পাইব, সমগ্র চিকিত্সা ক্ষেত্রেই চলিতেছে বেহাল দশা। দালালদের খপ্পর ডিঙাইয়া যদিওবা রোগীরা যথাযথ চিকিত্সাকেন্দ্র ও চিকিত্সকের নাগাল পান, অনেক ক্ষেত্রেই ভুল চিকিত্সা ও অবহেলায় রোগীর অবস্থা সঙ্গিন হইয়া উঠে। প্রতিটি পাড়া-মহল্লাতেই এইরকম চিকিত্সা বিড়ম্বনার অজস্র কাহিনী পাওয়া যাইবে। তদুপরি ভুল চিকিত্সা ও অবহেলার দায়ে চিকিত্সকদের শাস্তি পাইতে হইয়াছে এইরকম খবরও জনমহলে বিরল নহে। ফলত, চিকিত্সাকেন্দ্র লইয়া সর্বব্যাপী এক অবিশ্বাস ও অনাস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হইয়াছে। হাসপাতালে পৌঁছাইতে পারিলে সর্বোচ্চ চিকিত্সা সেবা পাওয়া যাইবে-এইরকম আস্থার পরিবেশ এই দেশে বিরল। তবে যে কারণেই হউক না কেন চিকিত্সকদের ওপর হামলা যেমন মানিয়া লওয়া যায় না, তদ্রূপ অপ্রতুল চিকিত্সা সুবিধার এই দেশে হাসপাতাল অচল করিয়া রোগীদের জীবন-মরণের মাঝখানে ফেলিয়া রাখাও কাম্য হইতে পারে না। চিকিত্সকদের যৌক্তিক দাবি-দাওয়া ও নিরাপত্তার প্রতি যেমন সরকারকে আন্তরিক হইতে হইবে, তদ্রূপ হাসপাতালগুলিতে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করিতে হইবে যাহাতে রোগী ও তাহাদের স্বজনেরা সর্বোচ্চ সেবা পাইবার ব্যাপারেও আস্থাশীল হইতে পারেন।
