ট্রেন দুর্ঘটনা রোধে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০১৪, ২১:১৭
আরামদায়ক ভ্রমণ, সহজলভ্যতা এবং নিরাপদ যাতায়াতের জন্য ট্রেন সমগ্র বিশ্বেই জনপ্রিয় পরিবহন ব্যবস্থা হিসাবে বিবেচিত। বাংলাদেশেও সুদীর্ঘকাল ধরিয়া রেল যোগাযোগ প্রচলিত রহিয়াছে। কিন্তু মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে একাধিক ট্রেন দুর্ঘটনার সংবাদে শঙ্কিত না হইয়া পারা যায় না। গত দুই বছরেরও কম সময়ে ১২৫ জন যাত্রী ট্রেন দুর্ঘটনার শিকার হইয়া মারা গিয়াছে, আহতের সংখ্যা কয়েকশত। ট্রেন দুর্ঘটনার সংখ্যা অন্যান্য পরিবহনের তুলনায় কম হইলেও পর্যায়ক্রমিকভাবে ইহা বাড়িয়া যাইতেছে যাহা বেশ উদ্বেগের কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। উন্নত দেশেও ট্রেন দুর্ঘটনা দুর্লভদৃষ্ট নহে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই দুর্ঘটনার হার উন্নত দেশের তুলনায় ১০.৩৬ গুণ বেশি, যাহা হতাশাব্যঞ্জকও বটে। মূলত ঝুঁকিপূর্ণ রেললাইন, যান্ত্রিক ত্রুটি, চালকের অসতর্কতা, ভুল সিগন্যাল, অরক্ষিত রেলক্রসিং এবং কর্তব্যরতদের দায়িত্বহীনতার কারণেই ট্রেন দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটিয়া থাকে। বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থায় ট্রেনের প্রচলন ১৮৬২ সালে। বর্তমানে রেলপথের দৈর্ঘ্য ২৭৭৭ কিলোমিটার প্রায়। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে রেল যোগাযোগ বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিয়া আসিতেছে। ইহার সমূহ উন্নয়ন হইলে দেশের জিডিপিতে গড়ে অতিরিক্ত ২.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আনয়ন করিতে সক্ষম বলিয়া মতামত দিয়াছেন বিশ্লেষকগণ। অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও যোগাযোগের বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দিয়াই ২০১১ সালের ডিসেম্বরে রেল ব্যবস্থার উন্নয়নকল্পে আলাদা একটি মন্ত্রণালয় গঠিত হইয়াছে যাহা সাধুবাদ পাইবার যোগ্য। কিন্তু উদ্যোগ যতই লওয়া হউক বিদ্যমান ত্রুটির ব্যাপারে উদাসীনতা বা দায়িত্বহীনতা থাকিলে তাহাতে কোনভাবেই প্রত্যাশিত ফল লাভ করা সম্ভব নহে। সাধারণত ট্রেন দুর্ঘটনায় চালকের অসতর্কতার চাইতেও বেশি দায়ী হইল যান্ত্রিক ত্রুটি বা ভুল সিগন্যাল। কিন্তু কোনভাবেই এই সকল ভুলের পুনরাবৃত্তি রোধ করা যাইতেছে না। দুর্ঘটনা ঘটিবার পর তদন্ত প্রতিবেদন এবং ব্যবস্থা স্বরূপ কর্তব্যরতদের সাময়িক বরখাস্ত করিবার খবর শোনা যায়, কিন্তু তাহার বাস্তবায়ন ঠিক কতটুকু সম্ভব হয় তাহা জানিবার সুযোগও অপ্রতুল। কিন্তু দুর্ঘটনা রোধে এহেন গতানুগতিক ব্যবস্থা যে বারংবার ব্যর্থতায় মুখ থুবড়াইয়া পড়িতেছে তাহা বোধকরি যে কেহই বুঝিতে সক্ষম। মূলত অব্যবস্থাপনার ফলেই এই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে যাহার মূলে রহিয়াছে দায়িত্বে অবহেলা ও দুর্নীতি। দায়িত্বশীল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ দুর্নীতিপরায়ণ হইলে অধস্তন কর্তব্যরতরাও দায়িত্বে অবহেলা ও নিয়মবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের সুযোগ পাইয়া থাকে। প্রতিবছর ৪ কোটি যাত্রী রেল সেবা গ্রহণ করিয়া থাকে যাহার প্রায় ৩৭.৫ শতাংশ আয় আন্তঃনগর রেল হইতে। কিন্তু দেখা গিয়াছে, এই ক্ষেত্রে দুর্নীতির হার শতকরা ৭৫ ভাগ যাহা কোনমতেই প্রত্যাশিত নহে। সরকারকে প্রতিবছর গড়ে ৫৭৫ কোটি টাকা লোকসান গুনিতে হয়। অথচ যথাযথভাবে এই খাতটি পরিচালনা নিশ্চিত করা হইলে যেমন কমিয়া আসিত লোকসান তেমনি জনসেবার্থে প্রদত্ত ভর্তুকির পরিমাণও হ্রাস করা সম্ভব হইত। সুতরাং এই রকম সকল ক্ষেত্রে যে অব্যবস্থাপনা রহিয়াছে তাহা অতিসত্বর দূর করিতে দ্রুতই উদ্যোগ গ্রহণ করিতে হইবে। কর্মরতদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান করা হইলে সিগন্যাল ভুলের কারণে ঘটা দুর্ঘটনার সংখ্যা কমিয়া আসিবে অনেকাংশে। কাজেই এই ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ লইবার ক্ষেত্রে কালক্ষেপণ কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নহে। তদন্ত প্রতিবেদনে দায়িত্বে অবহেলা ও দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হইলে কঠোর শাস্তি বিধান করিতে হইবে যাহা পরবর্তীতে কোনপ্রকার অনিয়ম ঘটাইবার ক্ষেত্রে অনুত্সাহের সৃষ্টি করিবে বলিয়া আমরা মনে করি। কাজেই সম্ভাবনাময় এই পরিবহন খাতটিকে আগাইয়া নিতে হইলে দুর্ঘটনা রোধ এবং সকল প্রকার অব্যবস্থাপনা প্রতিরোধ করা অতীব জরুরি।