সাম্প্রতিক

সাংস্কৃতিক পর্যটন এবং বাংলার নববর্ষ উদযাপন

আপডেট : ১৮ এপ্রিল ২০১৪, ২১:১৭
মানুষের অতৃপ্ত মনের সাধ, অজানাকে জানবার অদম্য আগ্রহ এবং বিনোদনের সমস্ত উপকরণ নিয়েই আজকে গড়ে উঠেছে পর্যটন নামক শিল্প। পর্যটন এখন শুধু ব্যক্তিগত আনন্দের খোরাক নয়, এটি এখন শিল্প। আর সংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতির সামাজিক গোষ্ঠীর চিন্তা, কর্ম এবং আচরণ ও বিশ্বাসের প্রকাশ। মানুষের চিন্তা ও বিশ্বাস তার আত্মিক বোধকে কেন্দ্র করে রূপলাভ করে। মানুষের বস্তুগত, বুদ্ধিগত এবং আবেগগত চিন্তার প্রকাশকেও সংস্কৃতি বলা যায়। সংস্কৃতির সঙ্গে জীবনের নিগূঢ় সম্পর্ক আছে। প্রতিদিন মানুষ যে জীবন যাপন করছে সে জীবন- যাপনের কর্মপ্রবাহই সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। দেশের পরিবেশ ও সংস্কৃতির সাথে সঙ্গতি রেখেই পর্যটন শিল্প বিকশিত হচ্ছে। নদীর দেশ বাংলাদেশ, গানের দেশ বাংলাদেশ। নদী আর গান বাংলার মানুষের প্রাণ। বাংলাদেশের ঐতিহ্য এ দেশের লোকসংগীত, পল্লীসংগীত। বিশ্বের যেকোন দেশের তুলনায় আমাদের লোকসংগীত বেশ সমৃদ্ধ। এসব লোকসংগীত নিয়ে ‘সংগীত পর্যটন’ বিকাশে যথাযথ উদ্যোগ নিলে দ্রুত বাংলাদেশ বিশ্বের সংগীত পর্যটনে জায়গা করে নিতে পারে। লোকসংগীত প্রাণের ছোঁয়া। সংগীত পর্যটন হচ্ছে কোন দেশের শহর/নগর কিংবা গ্রামীণ পরিবেশে পর্যটকদের উপস্থিতিতে নানা ঘরানার সংগীত ধারা/সংগীত উত্সবের প্রদর্শন। সেটা কালচারাল বা সাংস্কৃতিক পর্যটনের অংশ হিসেবে বিবেচ্য এবং যা স্থানীয় পর্যটনকে আরও সমৃদ্ধ করে থাকে। সংগীত পর্যটনে পর্যটকরা যেমন- সংগীতের নানান ধারা বা সংগীত উত্সব উপভোগ করেন আবার অনুসন্ধানী পর্যটকরা গবেষণার বিষয় হিসেবেও এটাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে থাকেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রয়েছে সংগীত পর্যটন এবং তা প্রতিনিয়তই বেড়ে চলেছে। ইংল্যান্ডের আঞ্চলিক শহর গ্লাসটোনবেরি সংগীত পর্যটনের জন্য বিশ্ববিখ্যাত। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পর্যটন মডেল মালয়েশিয়াসহ চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া তাদের গুটিকয়েক সংগীতের ব্যাপক প্রচারণা চালিয়ে বিপুল সংখ্যক পর্যটক আকৃষ্ট করে। ভারত, নেপাল, ভুটানসহ আফ্রিকার অনেক দেশ সংগীত পর্যটনে অনেকটাই এগিয়ে আছে। সেখানে অত্যন্ত সমৃদ্ধ সংগীত সংস্কৃতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে পরিচিত হলেও সংগীতকে পর্যটন পণ্য হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচয় করিয়ে দিতে এখনো অনেকটাই পিছিয়ে। ক্লাসিক্যাল সংগীতের পাশাপাশি আমাদের একদিকে যেমন রয়েছে বাউলসহ লোকজ সংগীতের বিশাল ভান্ডার অন্যদিকে রয়েছে প্রায় ৪৫টি আদিবাসী নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব ধারার সংগীত, সংগীতের তালে তালে নৃত্যধারা ও নানারকম বাদ্যযন্ত্র। সংগীত পর্যটনের পণ্য হিসেবে এগুলোর আবেদন অসাধারণ। আমাদের বাউল সম্রাট লালনের গান আজ বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। দেশে-বিদেশে লালন সংগীত পরিবেশন ও লালন সংগীত চর্চার জন্য লালন সম্রাজ্ঞী ফরিদা পারভীন সমপ্রতি জাপানের ফুকুওকা এওয়ার্ড লাভ করেছেন। বর্তমানে লালনের গান ও লালনের দর্শন নিয়ে জাপান, জার্মান, ফ্রান্সসহ উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে গবেষণা হচ্ছে এবং বিশ্বে দিনদিন লালন সংগীতের প্রসার ঘটছে। সংগীত পর্যটনে এত বড় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দেশের পক্ষ থেকে লালনের গান ও দর্শনকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরার জন্য খুব একটা প্রচার-প্রচারণা লক্ষ্য করা যায়নি। বাংলার নববর্ষ আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের আর এক নতুন দিগন্ত। বাংলার প্রাণের স্পন্দনে মিশে আছে এ উত্সবটি। বছরের প্রথম দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে উত্সবের শেষ নেই। দেশের সর্বত্র আনন্দ আয়োজনে ব্যতিব্যস্ত আপামর জনসাধারণ। লক্ষ লোকের প্রাণের সমাগম ঘটে প্রতিটি স্পটে। নৃত্যে, আনন্দে এ মিলন মেলা হয়ে উঠে সার্বজনীন এবং সর্বস্বীকৃত। এই মেলা উত্সব অসামপ্রদায়িক। যেখানে ভিন ভাষাভাষি, ভিন প্রজাতি, ভিন গোষ্ঠীর মানুষ একই সূত্রে গাঁথা থাকে। শিশু-কিশোর, যুবা-বৃদ্ধ, বৃদ্ধার কাছে এই মেলার আবেদন চিরন্তনী। দেশে পর্যটন শিল্পের পূর্ণাঙ্গ বিকাশ ঘটাতে এসব উত্সবমুখর অনুষ্ঠান ও দিবসকে কাজে লাগানো যেতে পারে। এগুলো যথাযথ ব্র্যান্ডিং করে বিশ্বে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো যেতে পারে। এতে যেমন দেশ পরিচিত হতে পারে বহির্বিশ্বে, অন্যদিকে দেশের ঐতিহ্য সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অর্জন করা যেতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা। তাহলে একদিকে যেমন আমাদের অর্থনীতি শক্তিশালী হবে, অন্যদিকে নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বিশ্বায়নের সাংস্কৃতিক বলয়ে চ্যালেঞ্জের মুখে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজন সরকারের সার্বিক পরিচর্যা, দৃষ্টিভঙ্গির সংরক্ষণ এবং কার্যকর উদ্যোগ। লেখক : সহকারী অধ্যাপক ট্যুরিজম এন্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন